অনেকে মনে করে থাকেন যে হুপিং কফ (Whooping Cough) হচ্ছে বাল্য বা শৈশবকালের রোগ। কিন্তুএটা আসলে
যে কোনো বয়সে মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। হুপিং কফ পারটুসিস (Pertussis) নামেও পরিচিত যার কারণে কফ
নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়- ফলে স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নেয়া যথেষ্ট দুরূহ হয়ে পড়ে। এই রোগটি প্রাণঘাতী, বিশেষ
করে নবজাতকদের জন্য। ভ্যাক্সিনের (Vaccine) মাধ্যমে হুপিং কফ বা পারটুসিসকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পারটুসিস আক্রান্তের সংখ্যা কমিয়ে আনার জন্য ১৯৪০ সাল থেকে সারা আমেরিকাতে ব্যাপকভাবে ভ্যাক্সিন
দেয়া শুরুকরা হয় এবং আক্রান্তের সংখ্যা বছরে প্রায় দুই লাখ থেকে রেকর্ড কম সংখ্যক ১৯৭৬ সালে এক
হাজারে নেমে আসে। যদিও ইদানীং এই রোগটির পুনঃআবির্ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। গত বছর আমেরিকাতে
পারটুসিস আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় একচল্লিশ হাজার ছাড়িয়ে যায়- যা কিনা গত ৫০ বছরের মধ্যে ছিল সবচেয়ে
বেশি। হুপিং কফ বা পারটুসিস হচ্ছে ব্যাকটেরিয়াঘটিত ও বায়ুবাহিত অত্যন্ত সংক্রামক রোগ যা ফুসফুসে
আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি যখন কাশি বা হাঁচি দেয়, ব্যাকটেরিয়া তখন বাতাসের মাধ্যমে অতি সহজেই
একজনের নিকট থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
পারটুসিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সনাক্ত করা বেশ কঠিন। লক্ষণগুলো সাধারণত শুরুই হয় আক্রান্ত হওয়ার
প্রায় সপ্তাহ খানেক পর। বোঝা যায়, বিশেষ করে হাঁচি ফেলার সময় বা নাক দিয়ে যখন স-শব্দে নিঃশ্বাস নেয়া শুরু
হয়। অনেক সময়ই পারটুসিসের লক্ষণগুলোকে এলার্জি বা মাইলড কোল্ডের সঙ্গে ভুল করে মিলিয়ে ফেলাও হয়।
পারটুসিসের এই প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিকের সাহায্য নিলে লক্ষণগুলো যেমন কমিয়ে ফেলা সম্ভব হয়,
তেমনি এই রোগটি আর যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেটিও নিয়ন্ত্রিত হয়।
কফিংয়ের এই ধাপগুলো স্থায়ী হতে পারে প্রায় দশ সপ্তাহ বা তারও অধিক। এই রোগটি সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত
হয় প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষ করে যখন ঠাণ্ডার মতো অনুভূত হয় এবং এই সংক্রমণ চলতে থকে কফিংয়ের
ধাপগুলো শুরুর পর থেকে আরও কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ধরে। হুপিং কফ বাড়ন্ত শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি
ক্ষতিকারক।
পারটুসিস এড়ানোর জন্য ভ্যাক্সিনই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি। মূল ভ্যাক্সিন তৈরি করা হয়েছিল সম্পূর্ণ
ইনএকটিভেটেড পারটুসিস ব্যাকটেরিয়া (Whole Inactivated Pertussis Bacteria) থেকে। এই ধরনের হোলসেল
ভ্যাক্সিন- মৃত্যুএবং আক্রান্ত রোধে খুবই কার্যকরী বটে, তবে এদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক বেশি। তাই
প্রায় তিন দশক আগে ড. ক্যাথরিন ও অন্য কিছুগবেষক (এন. আই. এইচ. ফান্ডেড) এসেলুলার (Acellular)
পারটুসিস ভ্যাক্সিন নিয়ে গবেষণা শুরুকরেন এবং তা তাঁরা প্রাথমিক পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও দেখেন। নতুন এই এসেলুলার ভ্যাক্সিনগুলো কার্যকরী এবং ওরিজিনাল হোলসেল
ভ্যাক্সিনের চেয়ে খুবই কম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াশীল। তাই ১৯৯৭ সাল থেকে আমেরিকাতে ব্যবহারিত সকল
পারটুসিস ভ্যাক্সিনই হচ্ছে এসেলুলার। আমেরিকাতে দুই মাস থেকে ছয় (৬) বছর বয়সের মধ্যে বাচ্চারা পাঁচটি
পারটুসিস ভ্যাক্সিন নিয়ে থাকে (ফাইভ শটস)। এটা এখানে বাচ্চাদের রুটিন কেয়ারের মধ্যে পড়ে। এসেলুলার
পারটুসিস ভ্যাক্সিনকে ডিপথেরিয়া ও টিটেনাস ভ্যাক্সিনের সঙ্গে মেশানো হয় যাকে বলে DTP (ডিপথেরিয়া,
টিটেনাস, এসেলুলার পারটুসিস)। এছাড়াও ১১ থেকে ১২ বছর বয়সের বাচ্চাদেরকে (pre-teen) একটা বুস্তার শট
দেয়া হয় যাকে বলে Tdap। এটা মূলত তাদেরকে এই রোগের আক্রমণ থেকে আরও সুরক্ষা করে।
ভ্যাক্সিন নেবার আগেই নবজাতকরা যাতে এই রোগে আক্রান্ত হতে না পারে, সে জন্য গর্ভবতী মা-দেরকে তাদের
pregnancy'র শেষার্ধ চলাকালীন সময় থেকে Tdap ভ্যাক্সিন নেয়ার জন্য এখন সিডিসি (Center for Disease
Control and Prevention) থেকে সুপারিশ করা হয়ে থাকে।
আপনার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে যে আপনার ভ্যাক্সিনেশনগুলো আপ-টু-ডেট করা আছে
কিনা। প্রথমে আপনি নিজেকে সুরক্ষা করুন এবং তারপর আপনার চারপাশে যারা আছেন তাদেরকেও পারটুসিসের
সংক্রমণ থেকে রক্ষা করুন।
সূত্র – দৈনিক ইত্তেফাক

