
ধর্ষণের প্রতিবাদে নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভরত নারীরা
মেয়েটি বলেছিল, ‘লড়াই না করে কোনোমতেই হারবে না।’
কথাটা রেখেছে সে। শরীর-মনে ভয়ংকর আঘাত নিয়েও টানা ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেছে। চেয়ে গেছে ধর্ষকদের বিচার। দিয়ে গেছে তাদের বিবরণ। তবে শেষ পর্যন্ত জীবন নয়, মৃত্যুই তাকে আপন করে নিল। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গণধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার ২৩ বছরের মেয়েটি গতকাল শনিবার ভোররাতে মারা গেছে।
সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শান্তিতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে সে। মৃত্যুর সময় আপনজন, ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তা ও চিকিৎসকেরা তার পাশেই ছিলেন। মেয়েটি চলে গেল। কিন্তু পুরো মানবসভ্যতার ওপর যেন লেপে দিয়ে গেল লজ্জা, অপমান আর পরাজয়ের গ্লানি।
১৬ ডিসেম্বর রাত নয়টার দিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্রী ওই মেয়েটি তার প্রকৌশলী বন্ধুর সঙ্গে সিনেমা দেখে বাসে চড়ে বাড়ি ফিরছিল। চলন্ত বাসেই মাতাল চালক ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা তাকে ধর্ষণ করে। এতেও শেষ হয়নি। লালসা চরিতার্থের পর মেয়েটির যৌনাঙ্গে রড ঢুকিয়ে তাকে ও নরপশুদের হামলায় আহত তার বন্ধুকে চলন্ত বাস থেকে ছুড়ে ফেলে দেয় তারা।
পত্রপত্রিকায় খবরটি পড়ার পর থেকে এসব দেখতে দেখতে গা সয়ে যাওয়া মনোভাব নিয়ে ভেবেছিলাম, ওহ্! আরেকটা মেয়ে? যাক গে, কী আর হবে? কিন্তু তারপর দেখলাম, ফুঁসে উঠছে ভারত। দেখতে দেখতে মেয়েটির ওপর নির্মমতার প্রতিবাদে, ভারতীয় পুলিশের দায়িত্বহীনতার প্রতিবাদে, প্রচলিত সমাজে বিরাজমান নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলের দাবিতে, বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়তে থাকে ভারতের দিল্লি থেকে লক্ষৌ। দিনে দিনে তীব্র হয় প্রতিবাদের ভাষা। বিক্ষোভকারীদের হামলায় আহত এক পুলিশ কর্মকর্তা মারা যান। জনগণকে শান্ত হতে দেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে আবেগঘন ভাষণ দেন। এমনকি ধর্ষিতার বাবাকে দিয়েও ক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু কাজ হয়নি।
দিল্লিসহ ভারতের রাজপথগুলোয় নারী ও স্কুলগামী শিশুসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে থাকে। গ্রেপ্তার হয় ছয় ধর্ষক। যে কারাগারে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানেও গণপিটুনির শিকার হয় তারা। বিক্ষোভের মুখে ভারতীয় সরকার দেশটির নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এরই মধ্যে দেশটির রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ছেলে অভিজিৎ মুখার্জি মন্তব্য করেন, ‘লিপস্টিক লাগানো আন্দোলনকারীদের নাকি তার আন্দোলনকারী বলেই মনে হয় না’! এই যখন হয় দেশের কর্ণধারের পুত্রের ভাষা, তখন লড়াকু মেয়েটির মুত্যু মানবতার লজ্জা ছাড়া আর কীই-বা হতে পারে।
অভিধান ঘেঁটে দেখা গেল ‘ধর্ষণ’ কথাটার অর্থ: পেশিশক্তির ব্যবহার করে কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে যৌনকর্মে বাধ্য করাকে ‘ধর্ষণ’ বলে। মূলত পুরুষই ধর্ষণ করে থাকে। মার্কিন ব্যুরো অব জাস্টিস স্ট্যাটিসটিকস (১৯৯৯) থেকে জানা গেছে, দেশটির ৯৯ শতাংশ ধর্ষকই পুরুষ। আর ধর্ষণের শিকার মানুষের মধ্যে ৯১ শতাংশ হলো নারী এবং ৯ শতাংশ হলো পুরুষ।
নানাভাবে ও নানা প্রক্রিয়ায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে বিশ্বে। যেমন: গ্যাং রেপ, ওয়ার রেপ, ডেট রেপ ইত্যাদি। যা-ই হোক, মানুষের সম্পত্তি বোধের জন্মলগ্ন থেকেই এই ধর্ষণের মতো অপরাধেরও জন্ম। একসময় এটা অপরাধ বলেও গণ্য হতো না। যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষ পরাজিত পক্ষের নারীদের নিজেদের সম্পত্তি জ্ঞান করে তাদের বলাৎকার করত। রাজা-বাদশাদের থাকত শত শত উপপত্নী। রাজারা কখনোই এসব নারীর মতামতের তোয়াক্কা না করেই তাঁদের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হতেন। এগুলো অপরাধ বলে ভাবার সাহসই কারও ছিল না। প্রথম রোমে ধর্ষণকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। তখন ধর্ষণের শিকার নারী বা তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান ছিল প্রথম ধর্ষণের বিরুদ্ধে করা আইনে। সেই প্রথম ধর্ষণকে একজন মানুষের ক্ষতি হিসেবে দেখার চোখ তৈরি হলো সভ্যতার।
কিন্তু এরপর হাজার বছর পার হলেও, বিজ্ঞান, সভ্যতা অনেক সমৃদ্ধ হলেও ধর্ষণের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির খুব একটা বদল হয়নি। এখনো যে ধর্ষিত হয়, সে খুব কমই বিচার পায়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষটিই সমাজের চোখে হেয় হয়ে সামাজিক সংকটে পড়ে। বিচারের দ্বারস্থ হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাকেই প্রমাণ করতে হয় তার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ।
দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাটি এখন শুধু ভারতের জন্য নয়, সারা পৃথিবীর মানবজাতির জন্য একটি ধাক্কা। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে যে মেয়েটি বিচারের দাবি করে গেল, সে শুধু নিজের বিচার দাবি করেনি। সভ্যতাকে বুঝতে হবে, সে পুরো মানবজাতির অর্ধেক নারীর ওপর চলমান পুরুষের যাবতীয় নৃশংসতার বিচার চেয়ে গেল। মেয়েটির ওপর ঘটা নৃশংসতার প্রতিবাদে যে নারী, শিশু বা পুরুষ রাস্তায় নেমে এল, তারা দাবি জানাল সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের।
content aggregation:healthPrior21
source:prothom-alo
http://www.24livenewspaper.com/site/index.php?url=www.prothom-alo.com

