মঈনুল আলম
প্রদীপের শিখা যত উজ্জ্ব্ল হয়, তার নিচে অন্ধকার যে ততই ঘনীভূত হয়, তা-ই প্রমাণ করল বাংলাদেশের শক্তিধর প্রতিবেশী ভারত, যাকে বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক মহল তাদের আদর্শ ও ত্রাতারূপে দেখে ভক্তিতে গদগদ হয়ে ওঠে। গত দুই দশকে ভারত বিশ্বে একটি অর্থনৈতিক শক্তিরূপে লণীয়ভাবে বিকাশমান হয়ে তার শিখা উজ্জ্বল করলেও তার নিচের অন্ধকারে ভারতে নারীদের ওপর নির্যাতন ও যৌন অপরাধের হারও ক্রমাগতভাবে বাড়ছে এবং বীভৎসতর হচ্ছে।
আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানচেট-এর জরিপে প্রকাশ, গত তিন দশকে ভারতে এক কোটি ২০ লাখেরও বেশি রমণীর গর্ভে কন্যাসন্তান এসেছে দেখে গর্ভপাত করিয়ে তাদের গর্ভের কন্যাসন্তান নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। জরিপে দেখেছে, এর কারণ গর্ভধারিণীর স্বামী ও পরিবার বিয়েতে যৌতুক দেয়ার ভয়ে কন্যাসন্তানের জন্ম চান না এবং পুত্রসন্তানের জন্মই চান।
যদিও কংগ্রেসসহ ভারতের চারটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে শক্তিশালী নারীরা পরিচালনা করছেন, তবুও ভারতে নারীদের ওপর অত্যাচার ও অবিচার দমন করার ব্যাপারটি উপেতিই রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের জরিপে নারীদের জন্য বিপজ্জনক দেশগুলোর তালিকায় ভারত চতুর্থ স্থানে উঠেছে। নারীদের জন্য সর্বাধিক বিপজ্জনক দেশ হিসেবে শীর্ষে রয়েছে আফগানিস্তান, দ্বিতীয় স্থানে কঙ্গো, তৃতীয় স্থানে পাকিস্তান, তার পরেই ভারতের অবস্থান! এমনকি অনুন্নত দেশ বলে পরিচিত আফ্রিকার সোমালিয়ায় নারীরা ভারতের নারীদের চেয়ে অনেক ভালো পরিবেশে বাস করে।
১৬ ডিসেম্বর রোববার ভারতের রাজধানী দিল্লির দণি দিল্লি এলাকায় একটি স্কুল বাসের ড্রাইভার ও তার পাঁচ সাথী রাত সাড়ে ৯টায় ২৩ বছর বয়সী এক ইন্টার্নি ডাক্তার ছাত্রী ও তার যুবক সঙ্গীকে তাদের বাসকে যাত্রীবাহী বাস বলে উঠিয়ে নিয়ে এক ঘণ্টা ধরে চলন্ত বাসে যে বীভৎসভাবে ছাত্রীটিকে গণধর্ষণ করে এবং লোহার পাইপ দিয়ে অকল্পনীয় পন্থায় যৌন নির্যাতন করার পর উলঙ্গ অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে যায়, তা সারা বিশ্বের মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। এরই ‘ফলোআপ’ (অনুবর্তন) প্রতিবেদনগুলোতে পাশ্চাত্যের মিডিয়া ভারতের অভ্যন্তরে নারীদের অবস্থান যে কত অসহায় এবং নারীদের ওপর নির্যাতন ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়তে বাড়তে কী ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।
এসব প্রতিবেদন বিশ্বের প্রধান প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে প্রথম পৃষ্ঠার শীর্ষ সংবাদ হয়ে পরিবেশিত হচ্ছে। কানাডার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক সংবাদপত্র টরন্টো স্টার ২০ ডিসেম্বর সংখ্যায় ভারতে নারীদের ভয়াবহ অবস্থার ওপর তাদের তদন্তভিত্তিক প্রতিবেদন ‘ভারতীয় নারীরা হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সংস্কৃতির প্রতিরোধে উঠে দাঁড়াচ্ছে’ (ইন্ডিয়ান উওমেন রাইজিং আপ এগেইন্স্ট কালচার অব ভায়োলেন্স) শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠার ‘ফার্স্ট লিড নিউজ’ (শীর্ষ সংবাদ) করে প্রকাশ করেছে। এ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যাদি ভারতের উজ্জ্বল শিখার নিচে যে কী কদর্য অন্ধকার বিরাজ করছে, তা-ই প্রকট করেছে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো অব ইন্ডিয়ার জরিপে বলা হয়েছে ভারতে নারীদের ওপর অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১০ সালে নারীদের ওপর মোট যত অপরাধ হয়েছে, ২০১১ সালে তা ৭.১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১২ সালের পরিসংখ্যান এখনো পাওয়া যায়নি। ৫ ডিসেম্বর হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকা প্রকাশ করে যে রাজধানী দিল্লিতে এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৫৮০টি নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। যেহেতু অনেক ধর্ষিতা নারী লোকলজ্জা এবং সমাজে কলঙ্কিত হওয়ার ভয়ে ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট করে না, ধরে নেয়া যায় ধর্ষণের ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা ৫৮০ হতে অনেক বেশি হবে। গত বছর (২০১১) একই সময়ে ৪৮২টি ধর্ষণের ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছিল। এতে বোঝা যায়, রাজধানী দিল্লিতে এ বছর ধর্ষণের ঘটনা গত বছর থেকে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে! নয়াদিল্লিতে স্থানীয় পুলিশ সাংবাদিকদের বলেছে, এই রাজধানী নগরীতে প্রতি ১৮ ঘণ্টায় একজন নারী ধর্ষিত হচ্ছেন এবং প্রতি ১৪ ঘণ্টায় একজন নারী যৌন হয়রানির শিকার হন।
ইউনিসেফের ২০১২ সালের রিপোর্টে প্রকাশ, ভারতে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ৫৭ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কা নারীদের ৫৩ শতাংশ কোনো কোনো সময় স্বামী স্ত্রীকে প্রহার করাকে গ্রহণীয় মনে করে। শিা, বিজ্ঞান ও কারিগরিতে অনেক এগিয়ে গেলেও ভারত এখনো একটি পুরুষশাসিত সমাজ হয়ে রয়েছে, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বাস করা হয় যে নারীরা পুরুষের সমক নন। ভারতে শিল্পায়নের পাশাপাশি নারীরা ক্রমবর্ধমান হারে গৃহের বাইরে আসা এবং শিল্পকারখানায় কাজ করায় নারীদের ওপর অপরাধের হারও বাড়ছে।
মুম্বাইয়ের আইনবিদ ও নারী অধিকার আন্দোলনের নেত্রী কামায়নি বালি মহাবল বলেন, ভারতে কন্যাসন্তান গর্ভে থাকার সময় থেকে জন্মগ্রহণ এবং অতঃপর জীবনের প্রতিটি ধাপে অসম আচরণের শিকার হয়। তিনি বলেন, নারীভ্রƒণকে যদি গর্ভপাত করিয়ে শেষ করে দেয়া না হয়ে থাকে, জন্মের পর থেকে সে কঠিন সংগ্রামে পড়ে, তার শিালাভের জন্য তাকে সংগ্রাম করতে হয় এবং জীবনের প্রতি পদে ইভটিজিং, গায়ে হাত দেয়া এবং জনসমে নানাবিধ যৌন আচরণ ও ধর্ষণ এবং যৌননিগ্রহের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করে চলতে হয়। নারী যদি ভুল পুরুষের প্রেমে পড়ে অনেক সময় তাকে প্রাণ হারাতে হয়; সে যদি বিবাহিতা হয় অনেক সময় যৌতুকের দাবি পূরণ না হলে তাকে প্রাণ দিতে হয়।
দিল্লি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উমা চক্রবর্তীÑ যিনি ভারতে নারীদের প্রতি বৈষম্যের ওপর লেখালেখি করছেনÑ তিনি পুরুষদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসহনশীলতাকে নারীদের প্রতি অন্যায় ও অবিচার বৃদ্ধির কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, পুরুষদের অধিকতরভাবে লিঙ্গবৈষম্যের ধারণা থেকে মুক্ত হতে হবে। তিনি বলেন, জন্ম থেকে ছেলেদের মনে বিশ্বাস জন্মানো হয় যে, তারা মেয়েদের অপো উঁচু ধাপের। তিনি বলেন, কোনো পরিবারে যদি একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্ম নেয়, তাদের দু’জনকে সমানভাবে বেড়ে উঠতে দেয়া হয় না। এমনকি শহরাঞ্চলেও একই অবস্থা। এটা বদলাতে হবে।
দিল্লির খ্যাতনামা লেখিকা ও নারী অধিকার আন্দোলন নেত্রী উর্বশী বুটালিয়া ভারতের নারীদের এই দুঃসহ পরিবেশে বাস করা সত্ত্বেও আশার আলো দেখতে পান। তিনি বলেন, নারীরা এখন ক্রমবর্ধমানভাবে বেরিয়ে আসছেন এবং তাদের ওপর নির্যাতন ও অপরাধের ঘটনা রিপোর্ট করছেন। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই ধর্ষণ, যৌননির্যাতন এবং যৌতুক দাবির ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। আমি এটাকে নারীদের ক্রমাগতভাবে শক্তি অর্জনের লণ বলে মনে করি। দুই দশক আগে নারীরা এসব ধরনের ঘটনার রিপোর্ট করত না। এখন নারীরা নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে এবং তারা নিজেদের রায় নিজেরাই দাঁড়াতে শিখছে।’
content aggregation:healthPrior21
source:dailynayadiganta
http://www.24livenewspaper.com/site/index.php?url=www.dailynayadiganta.com

