উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছিলেন প্রসব বেদনায় কাতর অন্তঃসত্ত্বা সুমাইয়া বেগম। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে ভর্তি না করে স্থানীয় ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের জাফরাবাদ গ্রামের এই অন্তঃসত্ত্বা নারীর স্বজনদের শত অনুরোধও ওই চিকিৎসকের মন গলাতে পারেনি। এক পর্যায়ে হাসপাতাল চত্বরেই ছেলেসন্তান প্রসব করেন সুমাইয়া। অথচ এই হাসপাতালে জরুরি প্রসূতিসেবা চালু আছে।
গত বছর সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর ইউনিয়নের পুরানচামড়া গ্রামে আবদুল জব্বারের স্ত্রী সোমা আক্তার দুটি কন্যাসন্তান জন্ম দিয়ে প্রসব জটিলতায় মারা যান। এলাকার এক হাতুড়ে পল্লী চিকিৎসক দিয়ে তাঁর প্রসব করানো হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রসবের পর তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটলে চিকিৎসক পালিয়ে যান। আর দুই সন্তান প্রসবের আধঘণ্টা পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে হতভাগা সোমা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বলা হয়ে থাকে, দেশে স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে প্রসূতিসেবা গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রসবকালে মা ও সন্তানের মৃত্যুর হার কমে এসেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। এক পরিসংখ্যানে দাবি করা হয়েছে, দেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমে এসেছে ৪০ শতাংশ। গর্ভকালীন জটিলতা এবং প্রসবকালীন ঝুঁকির কারণে আগের মতো মহামারী আকারে মা ও শিশুর জীবনহানি ঘটে না। জাতিসংঘও এই সাফল্যের স্বীকৃতি দিয়েছে।
জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিলেও কিশোরগঞ্জে সরকারিভাবে দেওয়া প্রসূতিসেবা সম্পর্কে হতাশা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। নিরাপদ মাতৃত্বের ক্ষেত্রে কোনো সাফল্য থেকে থাকলে তা হয়েছে মানুষের সচেতনতার কারণে। উচ্চমূল্যে এই সেবা ক্লিনিকগুলো থেকে কিনে নিচ্ছেন তাঁরা। সরকারি প্রসূতিসেবার ভূমিকা এ ক্ষেত্রে খুবই নগণ্য। উপজেলাগুলোতে এই সমস্যা আরো ভয়াবহ। সেখানে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসচ্ছল প্রসূতিরা গ্রাম্য হাতুড়ে চিকিৎসক ও প্রশিক্ষণবিহীন দাইদের দ্বারস্থ হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবসেবা নিচ্ছেন।
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালে কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রসবকালীন জটিলতায় বা প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ৮৯টি মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ২০১০ সালে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান ৮৮ জন মা।
তবে গর্ভবতী মা ও নবজাতকদের নিয়ে কিশোরগঞ্জে কাজ করে এমন একটি বেসরকারি সংস্থা মাতৃমৃত্যুর এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জানায়, সংখ্যাটি আরো অনেক বেশি হবে।
জানা গেছে, মা ও শিশুর মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কিশোরগঞ্জ সদর, করিমগঞ্জ, নিকলী, মিঠামইন ও ভৈরবে জরুরি প্রসূতিসেবা (ইওসি কর্মসূচি) চালু হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল এবং ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়া বাকি তিনটি হাসপাতালে এই সেবা কাগজপত্রে বহাল থাকলেও বাস্তবে বন্ধ আছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্লিনিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চিকিৎসকদের একটি শক্তিশালী চক্র কৌশলে এই সেবা চালু করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রাখেন। তাই কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা সত্ত্বেও তা চালু করা যাচ্ছে না।
করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক অস্ত্রোপচার কক্ষ এবং প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও গত চার বছর ধরে করিমগঞ্জ হাসপাতালের প্রসূতিসেবা কার্যক্রম ও সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। সূত্র জানায়, অবচেতনবিদ ও শল্যচিকিৎসকসহ লোকবলের অভাবে ইওসি কার্যক্রমের সুফল পাচ্ছে না এলাকাবাসী। ফলে তাদের ভিড় করতে হচ্ছে ক্লিনিক বা জেলা হাসপাতালে। কিংবা দ্বারস্থ হতে হচ্ছে হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয় করে প্রসূতি বিভাগে আধুনিক একটি অস্ত্রোপচার কক্ষ ও যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসকের অভাবে বর্তমানে প্রসূতি চিকিৎসা পুরোপুরি বন্ধ। এতে কোটি টাকায় নির্মিত অস্ত্রোপচার কক্ষ ও যন্ত্রপাতি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য প্রশাসক ডা. এহসানুল হক জানান, ২০০৮ সালে তাঁর হাসপাতালেও অনেক ব্যয় করে অস্ত্রোপচার কক্ষ নির্মাণের পর চালু হয়েছিল জরুরি প্রসূতিসেবা। মাত্র পাঁচটি অস্ত্রোপচারের পরই এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গত তিন বছর ধরে যন্ত্রপাতিগুলো চালু না থাকায় তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, এগুলো হয়তো এতদিনে নষ্ট হয়ে গেছে।
মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার মো. হাফিজুর রহমান জানান, হাসপাতাল থেকে হাওরের মানুষকে প্রসূতিসেবা দিতে কোটি টাকা ব্যয় করে অস্ত্রোপচার কক্ষ স্থাপন এবং যন্ত্রপাতি বসানোসহ সব কাজ সম্পন্ন করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চার-পাঁচ বছর হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত বাস্তবে চালু হয়নি জরুরি প্রসূতিসেবা। তিনি আরো জানান, বর্তমানে একটি কক্ষে সব যন্ত্রপাতি তালাবদ্ধ অবস্থায় আছে।
হাসপাতাল সূত্রগুলো জানায়, প্রসূতিসেবার জন্য যে বরাদ্দ এবং ওষুধপত্র আসে, তা নিয়ে যাওয়া হয় জেলা হাসপাতালের জন্য।
করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য প্রশাসক আবদুল হামিদ জরুরি প্রসূতিসেবা কার্যক্রম সম্পর্কে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, 'শল্যবিদসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেওয়ার জন্য চিঠি লিখতে লিখতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। জনবল পেলে প্রসূতি চিকিৎসা ও সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার আবার চালু করা যাবে।'
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন সারোয়ার তিনটি উপজেলায় জরুরি প্রসূতিসেবা (ইওসি) কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, 'সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য অবচেতনবিদ ও শল্যবিদ (সার্জন) প্রয়োজন হয়। মাঝেমধ্যে জনবল দেওয়া হলেও কেউ ওইসব এলাকায় থাকতে চান না। কয়েক মাস থাকার পর তাঁরা লবিং করে অন্যত্র বদলি হয়ে চলে যান। সবকিছু থাকা সত্ত্বেও শুধু লোকবলের অভাবে জরুরি প্রসূতিসেবা দেওয়া যাচ্ছে না। এটা আমাদের ব্যর্থতা। তবে আমি হতাশ নই, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।'
Source: The Daily Kaler Kantho

