‘অটিজম’শব্দটি গত কয়েক বছরে গণমাধ্যমের সহায়তায় এবং সরকারের আনুকূল্যে বেশ অনেকবার উচ্চারিত হয়েছে। বিষয়টি আগে যেমন কেবল ‘অটিস্টিক’বাচ্চার বাবা-মায়েদের নিজেদের ছোট ছোট কয়েকটি উদ্যেগের মধ্যে সীমিত ছিল, এখন সরকারও কিছু কাজ শুরু করেছেন, যদিও চাহিদার সংখ্যা এবং গুনগত মানের বিচার বেসরকারী সামগ্রীক সেবার প্রাপ্যতা নিতান্তই অপ্রতুল। লক্ষ্য করবার বিষয় ‘অটিজম’ শব্দটি বলবার সাথে সাথে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে আমরা বলে থাকি ‘অটিষ্টিক শিশু’ এই শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হয়, শারীরিক বিকাশ প্রায় আর দশটা মানুষের মতোই কেবল মানসিক বিকাশ ওদের নিজেদের মতো করে ওরা সাজিয়ে নেয়, আমাদের ‘স্বাভাবিক’ মানুষের চোখে তা ‘স্বাভাবিক’ নয়। এই বেড়ে ওঠা ‘অটিষ্টিক’ মানুষগুলোকে আমরা কোথায় দেখতে পাই? কোথাও না-না পার্কে, না সামাজিক অনুষ্ঠানে, না পাবলিক ফাংশনে, না রাস্তায়, না হাসপাতালে। কোথায় যায় এরা? যদি ওরা অটিষ্টিক শিশুটিকে নিয়ে লড়াকু বাব-মা সমস্ত সামাজিক যোগাযোগে, প্রকাশ্যে বের হবার সাহস দেখান, সেই ‘অটিষ্টিক’ সন্তানটি যখন শারীরীকভাবে পরিণত হয়ে ওঠে তখন ক্রমশ একেবারেই চারদেয়ালে নিজের ঘরের বৃত্তে মানুষটি আটকে যায়। ‘অটিষ্টিক’ শিশুটিকে তার ‘খামখেয়ালীপনা’ আচরনের জন্য ক্ষমা করে দিতে শিখছি আমরা, মনে করছি এটা আমাদের ঔদার্যের অংশ। ছোট শিশুর কাছে যে প্রত্যাশা থাকে, বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় তার কাছ থেকেই প্রত্যাশার ধরণ বদলে যায়। পাঠক জিজ্ঞাসা করতে পারেন-একই বাবা-মা কীভাবে সাহস হারিয়ে ফেলেন? হ্যাঁ সেই একই বাবা-মা সময়ের সাথে সাথে বুঝে যান তার পরিনত সন্তানটির আচরণ এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়, ঔদার্যের সীমায় আর কুলাচ্ছে না। কেন? করণ বয়সের সাথে সাথে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতে ‘অটিষ্টিক’ বাচ্চাদেরও জানা-শোনা, বোঝাবুঝির জায়গাটি বিস্তৃত হয়, সে বুঝতে পারে সে ‘আলাদা’। বাবা-মা ভাই-বোনের যেমন নিজেদের কাজ আছে, যোগাযোগের অর্থপূর্ণ দক্ষতা আছে, একটা জীবন আছে - তার কাজ নেই, যোগাযোগ করবার বন্ধুত্ব করবার দক্ষতা নেই, তার কোন অর্থপূর্ণ জীবন নেই। ওদের জীবন কাটছে সময় পার করাবার জন্য। ওরা বুঝে যায়, হতাশ হতে থকে, ক্রোধ জমতে থাকে, সেই ক্রোধের প্রকাশ ওদেরকে স্বাভাবিক জীবন-যাপন থেকে আরও দূরে সরিয়ে নেয়। সে ‘কাজ’ করা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়, কী কাজ! বিশেষ স্কুলের দৈনন্দিনতার পুনরাবৃত্তিক অর্থহীন কাজ, সামাজিক অনুষ্ঠানে (ওর কাছে হয়ে ওঠা) অর্থহীন আলাপচারিতা, পাবলিক জায়গায় যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় (যেমন মার্কেট, পার্ক, পাবলিক বাস) কারণ ‘স্বাভাবিক’ মানুষের ওকে ভয় পেতে শুরু করে। কেন ভয় পায়? কারণ আমরা ‘স্বাভাবিক’ মানুষগুলো ওদের কোথাও দেখিনা, না দেখতে দেখতে ওদের কথা আমরা ভুলে যাই, হঠাৎ সামনে এসে পড়লে বুঝে উঠতে পারি না ওর সাথে আচরণ কী হবে? ‘অটিষ্টিক’ মানুষগুলোর সাথে সাথে তাদের বাবা-মায়েরা ধীরে ধীরে নিজেদরেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। গুটিয়ে না হয় গেলাম, তারপরও কী ঘরের ভেতরে পরিবারের একজন মানুষ নিজেদের মতো করে ভাল থাকে? স্বাভাবিক নিয়মে বাবা-মাকে ঘরের বাইরে কাজ করতে হয়, অধিকাংশ মা-কেই বাইরের কাজ-কর্ম ছেড়ে একেবারে ঘরে থাকতে হয় সন্তানের খেয়াল রাখবার জন্য, তাদের আরো সন্তান থাকলে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হয়, সামাজিকতা এই পরিবারটিকেও ক্ষমা করে না। ১২/১৩ বয়স হলেই ‘অটিষ্টিক’ বাচ্চারা হঠ্যাৎ করেই ভিন্ন আচরণ করতে থাকে (আর দশটা ‘স্বাবাবিক বাচ্চার জন্য যা সত্যি), সেও জীবনের অর্থ খুঁজতে থাকে, কাজ করবার প্রেরণা/মটিভেশন খুঁজতে থাকে। একজন ‘স্বাভাবিক’ বাচ্চাকে বোঝানো যায় পরিশ্রম কর, লেখাপড়া কর, ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে, ভাল চাকরি পাবে, ভাল চাকরি মনে ‘ভাল জীবন’। একজন ‘অটিষ্টিক’ বাচ্চার জন্য ‘মটিভেশন’ কি? তার বাবা-মায়ের জন্য ‘মটিভেশন’ কি?
একসময় বাবা-মা বৃদ্ধ হন, সবকিছু দেখাশোনা করবার মতো শারীরিক সক্ষমতা কমে যায় বরং তাদের জন্য সেবার প্রয়োজন হয়। বাবা-মায়ের সেবার কথা না হয় ভুলেই গেলাম, যে সন্তানটিকে তার এতদিন আগলে রেখেছেন, সামলে রেখেছেন, তাকে আজ কে দেখাশুনা করবে? বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর এই ‘অটিষ্টিক’ মানুষটির দায়িত্ব কে নেবে? ‘রেখে যাওয়া সম্পত্তি’ এর কোন উত্তর নয়। যেহেতু অধিকাংশ অটিষ্টিক মানুষ তার নিজের দৈনন্দিন রুটিন কাজগুলোর বাহিরে (গোসল করা, খাওয়া, বাথরুমে যাওয়া) আর কোন কিছুর দায়িত্ব নিতে সক্ষম নন, তার জন্য ‘সম্পত্তি রেখে’ যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতা যেমন আছে, ঠিক তিমনিভাবে মানুষটির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও মারাত্মক অনিশ্চিয়তা/জটিলতা তৈরী হয়। ধরে নিলাম, বাবা-মা তাদের সম্পত্তি/একটা অংশ তার ‘অটিষ্টিক’ সন্তানের নামে কোন ট্রাষ্টির কাছে দায়িত্ব দিয়ে গেল? বিশ্বাসযোগ্য ট্রাষ্ট সদস্য কি পাওয়া সহজ? ধরে নিলাম ট্রাষ্টির উপর দায়িত্ব পালিত হবে। এই ট্রাষ্টি কী করবে? মানুষটির দেখাশোনা? কীভাবে? নিজেদের ভাই-বোন কি দায়িত্ব নেবে? কেন নেবে? কীভাবে নেবে? ‘স্বাভাবিক’ ভাই-বোন (যদি থাকে, অনেকেরই নেই) গুলো নিজেদের ‘স্বাভাবিক’ জীবন রেখে কেন এই দায়িত্ব নেবে? বাবা-মাকে দায়িত্ব নিতে হয়, ভাই-বোন বা অন্য কোন নিকট জনের সেই দায় নেই।
তাহলে কোথায় যাবে এই বেড়ে ওঠা ‘অটিষ্টিক’ মানুষগুলো? এখনো পর্যন্ত সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে কোন সেবা কার্যক্রমই এদের আজীবন দেখভালের ব্যবস্থা শুধু নয়, চিন্তাই করেনি। সরকার কয়েকটি বিশেষ স্কুলে/প্রতিষ্ঠানকে কিছু খাস জমি দিয়েছেন, আমরা এই উদ্যোগকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই। আমরা আশা করছি এই জমিগুলোতে এই অটিষ্টিক মানুষদের কার্যক্রম এবং থাকার ব্যবস্থা হবে। আমারা আশা করছি, এই খাস জমিগুলো (যেকোন সময়ের) সরকারী প্রভাবশালী মাস্তানের হতে চলে যাবে না। আমরা আশা করছি ভবিষ্যতে কোন এক সময় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘অর্টিষ্টিক’ সন্তানেরা আমাদের অবর্তমানে ভালো থাকবে। বিশেষ স্কুলগুলো যেমন কখনো কখনো বলে দেয় ‘আপনার বাচ্চাকে আর স্কুলে রাখা যাবে না, ওর দায়িত্ব নেয়া যাবে না, এমনটি এখানে হবে না। এখানে ওদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ওরা পাবে, খাবার পাবে, নিরাপত্তা পাবে, না হয় ওদের মন ভাল রাখবার জন্য বাবা-মা যতো বিভিন্ন আয়োজন করেন তার সব থাকবে না, কিন্তু নূন্যতম মর্যাদার জায়গাটা থাকবে। খুব কি বেশী চাওয়া হল ?
ভবিষ্যতের সমস্ত ভাবনাটাই এখনো পর্যন্ত প্রায় ‘এ্যবসট্রাকট’ কিন্তু সন্তানটি ‘বাস্তবতা’, তার সার্বক্ষণিক এবং আজীবন ব্যবস্থাপনার দাযিত্বটিও বিকল্পহীনভাবে প্রয়োজন। এই ভাবনাগুলো থেকেই কয়েকজন বাবা-মা বেশ কিছুদিন থেকেই সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে (২০০৫/৬ সালেও সরকারী উদ্যোগ অনুপস্থিত ছিল) ঢাকার বেশ বাইরে একটা জমি কিনেছেন্ ঢাকায় জমি কেনা সাধ্যে কুলায়নি। ঢাকার কথা বলছি কেন? কারণ সেবা খাতের অধিকাংশ সুবিধা ঢাকায়। এই বাবা মায়েরা স্বপ্ন দেখেছেন এই জমিতে তৈরী হবে তার সন্তানের জন্য বাসস্থান, করার জায়গা তৈরী হল ‘অটিজম ফাউন্ডেশন’ বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারী উদ্যোগ যারা নিজেদের অর্থে এবং উদ্যোগে অটিষ্টির সন্তানটির পুর্ণবাসনের জন্য আবাসন এবং ব্যবস্থাপনায় কাজটি শুরু করেছে। যেখানে ১০০টি অটিষ্টিক মানুষের এখনো পর্যন্ত মুধুমাত্র জমিটাই কেনা হয়েছে, পুনর্বাসনের প্রাথমিক চিন্তা আছে। সংখ্যাটি নিতান্তই কম হল ? হল না বলে অটিজম ফাউন্ডেশন এর সথে সম্পৃক্ত বাবা-মায়ের মনে করছেন । তারপরও পথ চলা শুরু হোক, শুরু না হলে ঘাটতি বোঝা যাবে না, তা দূর করার চেষ্টাও থাকবে না । ব্যবস্থাপনার একটা মডেল যদি দাঁড় করনো যায়, আমরা নিশ্চিত যে সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে আরো অনেক এরকম আবাসন (ব্যবস্থাপনা সহ) গড়ে উঠবে, কারণ প্রয়োজন যে অনর্গল।
জমি কেনার বাইরে সকল প্রশ্নই প্রায় অমীমাংসিত , এমনকি আমরা অটিষ্টিক সন্তানের বাবা-মায়েরা ওদেরকে নিয়ে কী ধরনের স্বপ্ন দেখবো, কী ধরনের সেবা ঐ ধরনের ব্যবস্থাপনা থেকে চাইবো তাও প্রায় বিমূর্ত। শুধু এটুকু চাওয়ার কথা জানি আমার সন্তানটা ভাল থাক, নিরাপদে থাক। কি করলে ওর ভাল হবে একেকটি অটিষ্টিক মানুষের অক্ষমতার ঘাটতি, প্রয়োজন একেকরকম ? সবার প্রয়োজনের সন্নিবেশ কি ঘটানো সম্ভব? হলেও কতটা? কে/কারা নেবে এর দায়িত্ব? আমরা যখন থাকবো না আমার রেখে যাওয়া সম্পত্তি ওর পেছনে ওর কল্যানে লাগবেকি? লাগলেও কীভাবে ? ওর প্রয়োজনের অগ্রাধিকার কি দেয়া হবে? কে দেবে ? ওর জন্য যদি ব্যাপক কোন স্বাস্থ্য খরচ করতে হয়, রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে হয়তোবা তা কুলাবে, তাহলেও কি ও সেই সেবা পাবে? লাভ খরচের খাতায় ওরা কোন ‘লাভ’ আমাদের জন্য আনবে না । তাও কি ওদের জন্য আমরা সর্বস্বটুকু উজাড় করে দেব? অনুচ্চারিত কত প্রশ্ন, অমীমাংসিত কত উত্তর, নীরবে গোপনে অনেক যত্নে রাখা কত স্বপ্ন । আমরা বিশ্বাস করি, এখনই শুরু করতে হবে কাজ, এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। আমরা অটিষ্টিক সন্তানের বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে চাই, সমাজ-সরকারের দোহাই দিয়ে দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চাইনা। আমাদের স্বপ্নটা নিয়ে অনেকদূর আমাদের কে যেতে হবে সকলের সমর্থন ছাড়া স্বপ্ন যাত্রাটি সফল হবে না।
সৌজন্যেঃ অটিজমফাউন্ডেশন

