স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে তারা
২৭ অক্টোবর, ১৩
Viewed#: 93
রাজধানীর কমলাপুর বস্তির বাসিন্দা কুলসুম আক্তারের বয়স ১৬ বছর। এই বয়সেই সে দুটি সন্তানের মা। এদের মধ্যে বড়টি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এবং ছোটটি চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। কুলসুম নিজেও ভুগছে অপুষ্টিতে। রোগা লিকলিকে শরীর নিয়ে দুটি শিশুর কোনোটিকেই ঠিকমতো সামলাতে পারছে না সে। কথা হয় কুলসুমের সঙ্গে। সে জানায়, ১২ বছর বয়সে তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে হয় তার। বছর না ঘুরতেই বড় সন্তানের জন্ম। এর এক বছর পরই দ্বিতীয় সন্তান হয়। বয়স কম হওয়ায় সে নিজেও বুঝতে পারে না কীভাবে সে বাচ্চাদের লালন-পালন করবে। তার ওপর সে নিজেই অসুস্থ। কুলসুমের ভাষায়, ‘মাথাটা সব সময় ঘুরে। ডাক্তরের কাছে গেছিলাম। তাইনে কইছেন শইলে রক্ত নাই। ভালা ভালা খাওয়া খাইতে। গরিব মানুষ ভালা খাওয়া পাইমু কই? কিছুই ভালা লাগে না। বাইচ্চা ঠিকমতো দেখবার পারি না, হের লাইগ্যা স্বামী আমারে মাইরধইর করে।’
কুলসুমের মতো এ দেশে বহু কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি-২০১১ অনুসারে, বাংলাদেশে প্রতি তিনজনে দুজন মেয়েরই বাল্যবিবাহ হয়। কিন্তু কন্যাশিশুরা এ বয়সে যৌনমিলন কিংবা সংসার করার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হয় না। বরং অল্প বয়সে বিয়ে তাদের চাপে ফেলে দেয়, সংসারে শুরু হয় নানা সমস্যা, শিশুটি হারিয়ে ফেলে তার স্বাভাবিক জীবন।
ইউনিসেফের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর বয়সের আগে। এর মধ্যে ১৫ থেকে ১৯ বছরেই অন্তঃসত্ত্বা কিংবা মা হয় তিন-চতুর্থাংশ কন্যাশিশু। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব বলছে, ২০ বছর বা এর বেশি বয়সের নারীদের তুলনায় ১৮ বছরের নিচের প্রসূতিদের মৃত্যুর আশঙ্কা প্রায় দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি এবং মায়েরা ৫০ শতাংশ মৃত শিশুর জন্ম দেয়।
অল্প বয়সে বিয়ের ফলে একটি শিশু তার সোনালি শৈশব, দুরন্ত কৈশোরের দেখা পায় না। অনেক সময় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়, নিজের মনের কোণে উঁকি দেওয়া স্বপ্ন পূরণ হয় না। এমনকি তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে না এবং অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে পড়ে।
বাল্যবিবাহের শিকার একটি কন্যাশিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হলে প্রথমেই যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, তা হলো শারীরিক সমস্যা। কোনো কন্যাশিশু যদি গর্ভধারণ করে, তাহলে মা ও শিশু উভয়েরই মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ছাড়া এসব মা ও শিশু অপুষ্টিতে ভোগে এবং কম ওজনের সন্তান প্রসব করার হার এদের তুলনামূলকভাবে বেশি।
এ বিষয়ে কথা হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের চিকিৎসক গুলশান আরার সঙ্গে। তিনি বলেন, অল্প বয়সে সন্তান ধারণ করলে মা ও সন্তান উভয়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। যেহেতু এ সময় কিশোরীদের শরীর পূর্ণাঙ্গভাবে গঠিত হয় না, ফলে তা সন্তান ধারণের জন্যও উপযুক্ত হয় না। এর ফলে গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর নানা জটিলতা দেখা যায়। গর্ভপাত, গর্ভজনিত খিঁচুনি, রক্তশূন্যতা, ফিস্টুলা, রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা, বাধাগ্রস্ত প্রসব ইত্যাদি নানা সমস্যা দেখা দেয়।
গুলশান আরা আরও বলেন, এসব মা ও শিশু উভয়েরই অপুষ্টি ও রক্তশূন্যতায় ভোগার হার বেশি। তা ছাড়া এসব মা শিশু পরিচর্যার মতো যথেষ্ট পরিণত হয় না, ফলস্বরূপ তাদের বাচ্চাদের অসুখবিসুখ লেগেই থাকে। কম বয়সী মায়েরা তুলনামূলক কম ওজনের সন্তান জন্ম দেয়। শিশুটির খর্বাকায়, শারীরিক বিকলাঙ্গ ও মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভয়ের কথা, বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েরা খুব কম বয়সে যৌন সম্পর্ক শুরু করে, যার একটি ভয়াবহ ফল জরায়ুমুখের ক্যানসার। যৌনাঙ্গের ভেতরের কোষ নাজুক অবস্থায় থাকে বলে স্বামীর সঙ্গে দৈহিকভাবে মিলিত হওয়ার কারণে সংক্রমণ হতে থাকে এবং একসময় জরায়ু বাইরে চলে আসে।
অল্প বয়সে বিয়ের ফলে কন্যাশিশুটি শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। এই কিশোরীরা অধিক মাত্রায় নির্যাতনের শিকার হয় এবং মানসিক সমস্যায় বেশি ভোগে। এ ছাড়া তাদের সামাজিক অবস্থানও থাকে নড়বড়ে। এ বিষয়ে জেড এইচ সিকদার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, কম বয়সে বিয়ে হলে শুরুতেই যে সমস্যাটি হয়, তা হলো যৌন মিলনের ভয়। এ জন্য বেশির ভাগ সময় তারা স্বামী থেকে দূরে দূরে থাকে বা স্বামীকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। এর প্রকৃত কারণটি না জানায় স্বামী হয়তো ভুল বোঝেন, এ থেকে নানা পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়েও অনেক ক্ষেত্রে এসব নারী স্বাভাবিক যৌন আচরণ করতে পারে না। তাদের মধ্যে পুরুষদের এড়িয়ে চলার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। আর তাদের বিষণ্নতার হার খুব বেশি।
জাহাঙ্গীর হোসাইন আরও বলেন, পরিবার বা সংসার পরিচালনায় এরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। মেজাজ খিটখিটে হয়, অনেক সময় কথা বলা বন্ধ করে দেয় আবার কখনো চিৎকার-চেঁচামেচি করে। এ ছাড়া কম বয়সী মেয়েদের ওপর পারিবারিক নির্যাতনের হার বেশি। এককথায়, বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েদের কখনো সম্পূর্ণভাবে মানসিক বিকাশ হয় না।
বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক সমস্যা এবং এর জন্য অভিভাবকের অসচেতনতাকে দায়ী করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক নেহাল করিম প্রথম আলোকে বলেন, এসব পরিবারে দাম্পত্য কলহ লেগেই থাকে। এ ছাড়া এতে বহুবিবাহের হার বৃদ্ধি পায়।
সূত্র - প্রথম আলো