আজ ৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দিবস। এই দিনে সারা বিশ্বের ১১৮টি দেশের মতো বাংলাদেশেও অনাড়ম্বরভাবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক, ছাত্রছাত্রীরা এই দিবসটি পালন করে থাকেন। বিশ্ব ফিজিওথেরাপি সংস্থার (ডব্লিওসিপিটি) অত্যন্ত আস্থাভাজন সদস্য বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) এই দিনটিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতিকে বিশেষভাবে জাগ্রত করে।
অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, সারা বিশ্বে জাতীয়ভাবে এই দিবসটি পালিত হলেও বাংলাদেশ সরকারের এই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই এবং উল্টাদিকে বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের অধিকার বঞ্চিত করে তাদের নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে যা বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনার।
মহান স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু নিজের উদ্যোগে যুদ্ধাহত গর্বিত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষায়িত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকসহ অন্যান্য চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন এবং তারা বাংলাদেশের স্থপতির ডাকে আন্তরিকভাবে সাড়া দেন।
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার অধিকতর গুরুত্ব অনুধাবন করে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে তৎকালীন আরআইএইচডি (বর্তমানে- নিটোর) তে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদে (এমবিবিএস ও বিডিএস একই অনুষদে অধিভুক্ত) স্নাতক ডিগ্রি চালু করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার এই মহান কোর্স বন্ধ করে দেয়া দেয়।
পরবর্তীতে সরকার ১৯৮৩ ও ১৯৮৫ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের জন্য কিছুসংখক প্রথম শ্রেণীর পদ সৃষ্টি করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পুনরায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের নিয়ে ভাবতে শুরু করে এবং এই কোর্স আবার চালু হয়। ১৯৯৮ সালে ‘বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি’র জমি বরাদ্দ ও অর্থের অনুমোদন দেয় এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এই চিকিৎসা পেশার উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়।
পরবর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে ‘বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি’র জমির বরাদ্দ বাতিল করে এবং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের দাবীর আজও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি । গত ১০ জুন, ২০০৯ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিওথেরাপির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন কিন্তু এখনো এর কোনো কাজ শুরু হয়নি এবং প্রত্যেক বাজেটে ওই কলেজের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দের পরও কেন কাজ শুরু হয় না তা আজ জাতির কাছে প্রশ্ন।
সারা বিশ্বে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেশার ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি (বিপিটি) কোর্সের মতো বাংলাদেশেও এই কোর্স চালু আছে। বিপিটি শেষ করার পর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরান ১৩টি বিশেষায়িত বিষয়ের ওপর মার্স্টাস অব ফিজিওথেরাপি (এমপিটি)/ এ ফিল / পি ইচডি / পোস্ট ডক্টোরাল /ফেলোশিপ ইত্যাদি কোর্স করে থাকেন। যেমন- অর্থোপেডিক বা মাসকুলোস্ক্যালিটাল ফিজিওথেরাপি, নিউরোলজিক্যাল ফিজিওথেরাপি, পেডিয়েট্রিক ফিজিওথেরাপি, কার্ডিও পালমোনারি ফিজিওথেরাপি, স্পোর্টস ফিজিওথেরাপি, গাইনোকলজিক্যাল ও উইম্যান হেলথ ফিজিওথেরাপি, ফিজিওথেরাপি ফর মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড সাইকিয়েট্রি, ফিজিওথেরাপি ফর জেরিয়েট্রিক হেলথ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন, ফিজিওথেরাপি ফর ডায়াবেটিক রিহ্যাবিলিটেশন, ফিজিওথেরাপি ফর ক্যান্সার রিহ্যাবিলিটেশন, ফিজিওথেরাপি ফর ডিজঅ্যাবিলিটি রিহ্যাবিলিটেশন, ফিজিওথেরাপি ফর পেইন রিহ্যাবিলিটেশন, ফিজিওথেরাপি ইন রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেল্থ স্টাডিজ।
উন্নত বিশ্বে ডক্টর অব মেডিসিন, ডক্টর অব সার্জারি ইত্যাদির মতো ডক্টর অব ফিজিওথেরাপি (ডিপিটি) কোর্স চালু আছে কারণ সেসব দেশে চিকিৎসার ওপর এমবিবিএস / বিডিএস / বিপিটি এ ধরনের ব্যাচেলর ডিগ্রি নেই। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেশার স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়নি।
বিশ্বায়নের বিশ্বে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেশার বর্তমান অবস্থান মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরা “Autonomous Health Professional, Specialized & Independent Practitioner” হিসাবে বিবেচিত হবেন (বিশ্ব ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সংস্থা- ডব্লিওসিপিটি ১৯৯৪ইং; যুক্তরাষ্ট্র-২০০১ইং; যুক্তরাজ্য-১৯৯১ইং; ভারত-১৯৯৮ইং)। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরা তাদের নামের প্রথমে ডাক্তার / চিকিৎসক লিখতে পারবেন তবে নামের শেষে পিটি (ফিজিওথেরাপিস্ট) লিখতে হবে (মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট, ভারত-২০০১ইং)।
বাংলাদেশে স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ বা শুধু ডাক্তারের চেম্বারে পাঁচ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা (দন্ত চিকিৎসা সহকারী) থাকলেও বিএমডিসি তাদের নিবন্ধন দেয় কিন্তু ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরা এমবিবিএস ও বিডিএসের সঙ্গে একই অনুষদের বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি থাকার পরও বিএমডিসি-র রেজিস্ট্রেশন পায় না ও তাদের নানাভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। বিএমডিসি-র ২০০৮ আইন অনুসারে বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপির কোর্স খুলতে হলে তাদের অনুমতি লাগবে কিন্তু পাস করা পেশাজীবীদের তারা রেজিস্ট্রেশন দেয় না, এটা কি ধরনের আইন।
সারা বিশ্বে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরা একাডেমিক ও ক্লিনিক্যাল বিষয়ে সব পর্যায়ের সরকারি/বেসরকারি/সায়ত্তশাসিত হাসপাতাল ও ক্লিনিক, সব পর্যায়ের স্পোর্টস টিম, ডিজঅ্যাবিলিটি রিহ্যাব সেন্টার, স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান/মেডিকেল বা হেলথ সায়েন্স কলেজ / বিশ্ববিদ্যালয়, মেন্টাল হেলথ সেন্টার, ইন্ডাস্ট্রিয়াল হেলথ সেন্টার, ওল্ড হোম ফর জেরিয়েট্রিক হেলথ ইত্যাদিতে স্বাধীনভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছে কিন্তু বাংলাদেশে সরকারিভাবে নতুন পদ সৃষ্টি তো দূরের কথা উল্টা শূন্যপদগুলোতে নিয়োগ না দিয়ে তা অন্য চিকিৎসা পেশাজীবীদের কাছ থেকে দখলমুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের পেশাগত রেজিস্ট্রেশন না থাকায় সুযোগ সন্ধানী নামধারী (ফিজিওথেরাপি ডিগ্রি ছাড়া) ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের মাধ্যমে শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা ও বাণিজ্য হয়, এ থেকে জনসাধারণকে রক্ষা ও সুচিকিৎসা প্রতিষ্ঠায় ফিজিওথেরাপিকে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) অন্তর্ভুক্ত বা স্বতন্ত্র ফিজিওথেরাপি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য এবং এ থেকে সরকার অনেক রাজস্ব পেতে পারে ও এই চিকিৎসকদের বিদেশে দক্ষ জনশক্তি হিসাবে রফতানি করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে (অন্যান্য পেশার চেয়ে এই পেশাজীবীদের বিদেশে চাহিদা অনেক বেশি) ।
বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি এসোসিয়েশন (বিপিএ)এর জুন, ২০১৩ইং-এর তথ্যমতে মোট গ্রাজুয়েট ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের সংখ্যা ১৭৮০ জন, ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট ১৫০০ জন । বিপিএ’র ২০১৩ইং-এর তথ্যমতে মোট ১৭৮০ জন গ্রাজুয়েট ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের মধ্যে প্রায় ৬২২ জন বিদেশে পাড়ি জমান তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিজিওথেরাপি একটি স্বতন্ত্র মহান চিকিৎসা পেশা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে এই পেশাজীবীদের নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা, তাদের সঠিক মর্যাদা ও স্বীকৃতি না দেয়া বা মূল্যায়ন না করা কখনই ভালো দিক নয় বরং তা জাতির শিক্ষিত ও যোগ্য সন্তানদের অপমান করার শামিল । যে দেশে চাকরি একটি সোনার হরিণের সমতুল্য সেই দেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরা শুধু প্রাইভেট প্রাকটিস করে প্রথম শ্রেণীর জীবিকা নির্বাহ করে থাকে অথচ তাদের হেয়প্রতিপন্ন করে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বাধ্য করা সমীচীন নয়। সুতরাং ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও কর্তাদের এই বিষয়ে উদাসিনতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই । অন্যথায় জাতির এই যোগ্য সন্তানরা দেশ থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটি বিশেষায়িত অধ্যায় বিলুপ্ত হবে, তাতে হয়ত সেসব স্বার্থান্বেষী মহলের কিছু সাময়িক লাভ হবে কিন্তু সাধারণ মানুষ এই মহান চিকিৎসাসেবা থেকে চিরদিনের জন্য বিমুখ হবে। এটা কি কোনো সভ্য জাতির চাওয়া হতে পারে ।
ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও কর্তাদের জ্ঞাতার্থে নিম্নোত্ত তথ্যগুলো উপস্থাপন করছি যা আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকল্পে সহযোগিতা করবে এবং বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক:
ক. বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল (বিপিএ-২০১২ইং)। এই মহান পেশার পেশাজীবীদের সঠিক মর্যাদা (প্রথম শ্রেণী) বিবেচনা করে স্বাস্থ্যনীতিতে পূনঅর্ন্তভুক্তিকরণ ।
খ. অপচিকিৎসা রক্ষার্থে ও সুচিকিৎসা প্রতিষ্ঠায় ফিজিওথেরাপিকে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) অন্তর্ভুক্তি বা স্বতন্ত্র ফিজিওথেরাপি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠাকরণ ও ওই কাউন্সিলে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্তকরণ।
গ. বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রয়োজনে অর্থস্বল্পতার ক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া করে কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।
ঘ. ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের শূন্যপদে নিয়োগ ও প্রস্তাবনা অনুযায়ী সব উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নতুন পদ সৃষ্টি ।
এই মহান চিকিৎসা পেশাকে আন্তর্জাতিক আঙ্গিকে জাতীয় স্বাস্থ্য কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করাসহ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার জন্য গণমানুষের এই দাবি উপেক্ষিত হোক এটা কোনো সভ্য সমাজ বা জাতির কাম্য হতে পারে না।
বিশ্ব ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দিবসের এই দিনে আমরা সংশ্লিষ্ট মহলকে আহ্বান করব দয়া করে বাংলাদেশের মানুষকে এই মহান চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করবেন না। হয়তো একদিন আপনি-আমি বা আমাদের পরিবারের সদ্যদেরও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের সহযোগিতা লাগতে পারে, সেদিন যাতে তারা আমাদের ধিক্কার না দেয়।
সূত্র -natunbarta.com

