বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও ফন্টেরার দুধ নিয়া তোলপাড় শুরু হইয়াছে। ফন্টেরা হইতেছে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ গুঁড়া দুধ উত্পাদনকারী নিউজিল্যান্ডের একটি কোম্পানি। বাংলাদেশে আমদানি করা দুধের যত চালান আসে, তাহার ৮০ শতাংশই এই কোম্পানির। এই দৃষ্টিকোণ হইতে এই কোম্পানির গুঁড়া দুধের দূষণের বিষয়টি আমাদের জন্যও উদ্বেগজনক। গত মে মাসে চীনে এই কোম্পানির দুধে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ধরা পড়ে। ইহার পর চীনের পাশাপাশি রাশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে ফন্টেরার দুধ আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়। অবশ্য ফন্টেরা কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে তাহাদের দুধ উত্পাদন প্ল্যান্টে অনাকাঙ্ক্ষিত ত্রুটির কারণে ক্ষমা প্রার্থনা করিয়াছে। ঐ কোম্পানির দুধ খোদ নিউজিল্যান্ডে বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান নিউজিল্যান্ড মিল্ক প্রোডাক্টস কোম্পানির পরিচালক গ্যারি রোমানো পদত্যাগ করিয়াছেন। অর্থাত্ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়াছে। এখন দেখা দরকার আমরা ফন্টেরার যেসব দুধ আমদানি করিয়াছি বা আমদানির প্রক্রিয়ায় আছে, তাহাতে কোন দূষণ আছে কিনা। বাংলাদেশের একাধিক কোম্পানি সেই দুধ প্যাকেটজাত করিয়া বিক্রি করে। তাই এই ব্যাপারে কালক্ষেপণ না করিয়া জনস্বার্থের খাতিরে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আশার কথা হইল, ফন্টেরা হইতে আমদানি করা সর্বশেষ চালানের প্রায় ৬০০ টন দুধ পরীক্ষার নির্দেশ দিয়াছে আমাদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত বৃহস্পতিবার হইতে বিএসটিআই চট্টগ্রাম বন্দরে নমুনা সংগ্রহ করিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু করিয়াছে। এখন ইহার আগে আমদানি করা ও প্যাকেটজাত হইয়া বাজারে আসা সেই কোম্পানির গুঁড়াদুধও পরীক্ষার দাবি উঠিয়াছে। এই দাবি অযৌক্তিক নহে। এসব পরীক্ষার ফল শীঘ্রই জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। যদি তাহাতে ক্ষতিকর কোন উপাদান পাওয়া যায়, তাহা হইলে নির্দিষ্ট সময়ের পণ্য বাজার হইতে উত্তোলন করিয়া সংশ্লিষ্ট বিদেশী কোম্পানির নিকট সরকারের পক্ষ হইতে ক্ষতিপূরণ দাবি করা প্রয়োজন। শুধু তাহাই নহে, এই প্রেক্ষিতে গ্রাহকদেরও সচেতন করা বাঞ্ছনীয় যাহাতে তাহারা গৃহে রাখা ঐ সব দুধ ক্ষণিক সময়ের জন্য হইলেও বর্জন করিতে পারে। আমরা জানি, দুধ একটি অতি পচনশীল দ্রব্য। ইহাকে গুঁড়া দুধে রূপান্তরের সময় বিশেষভাবে প্রক্রিয়াজাত করিতে হয়। সে সময় অসতর্কতার দরুন দুধ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হইতে পারে। এই দূষণ অনেক সময় পঙ্গুত্বের কারণও হইতে পারে। তবে নিউজিল্যান্ডের প্রাইমারি ইন্ডাস্ট্রি মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হইয়াছে যে, ফন্টেরার গুঁড়া দুধে যে ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গিয়াছে তাহা মানবদেহের পঙ্গুত্ব সৃষ্টিকারী (বটুলিজম) ব্যাকটেরিয়া নয়। তাহার পরও বলা যায়, সতর্কতার মার নাই। যেহেতু অধিকাংশ গুঁড়াদুধ শিশুখাদ্য হিসাবে ব্যবহূত হয়, তাই জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সুরক্ষায় এইসব দুধ পরীক্ষা ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোন অবকাশ নাই।
নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার একর জমি পতিত রহিয়াছে। এইজন্য সেই সব দেশে গোচারণের সুবিধা থাকায় ডেইরি ফার্ম বিকশিত হইয়াছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের জনবহুল ও ক্ষুদ্রাকার আয়তনের দেশে দিন দিন গোচারণের ভূমি কমিয়া যাইতেছে। ফলে দুগ্ধ উত্পাদনও কমিতেছে। ইহার কারণেই আমদানি বাড়িয়া গিয়াছে। অথচ এক সময় মাছে-ভাতে যেমন তেমনি দুধে-ভাতে বাঙালি হিসাবেও আমাদের পরিচিতি ছিল। যাহা হউক, বর্তমানে দেশীয় দুধ দ্বারা আমাদের প্রয়োজনের মাত্র ২০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হয়। তাই আমদানি ছাড়া আমাদের চলে না। তবে গুঁড়া দুধের গুণ ও পুষ্টিগত মান নিয়া যেহেতু প্রশ্ন আছে, তাই দেশীয় দুগ্ধশিল্পের বিকাশে আমাদের যথাসম্ভব মনোযোগী হইতে হইবে। যদি পরিকল্পনামাফিক ৩০০/৪০০ কোটি টাকা উত্পাদনমুখী পশু সম্পদ খাতে ব্যয় করা যায় এবং উন্নতমানের গোখাদ্যের নিশ্চয়তা দেওয়া যায়, তাহা হইলে দেশীয় দুধের উত্পাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। ইহাতে শত শত কোটি টাকার বিদেশি মুদ্রা সাশ্রয় হইবে। আমাদের ডেইরি ফার্মগুলিতে ভ্যাকসিনের অভাবসহ বিভিন্ন সমস্যা আছে। অতএব, দেশীয় দুগ্ধ শিল্পের বিকাশ সাধন এবং খাঁটি দুগ্ধপণ্য সরবরাহে আমাদের অনেক করণীয় ঠিক করিতে হইবে। সামপ্রতিককালে চোরাইপথেও নিম্নমানের গুঁড়া দুধ দেশে আসিতেছে যাহা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ও আসলে অ্যানিমেল ফুড হিসাবে পরিচিত। এ ব্যাপারেও সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও জনগণের সচেতনতার প্রয়োজন একান্ত আবশ্যক।
সূত্র - দৈনিক ইত্তেফাক

