বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যা শুরু করা উচিত হলেও আমাদের দেশে এ বিষয়ে কোনো সচেতনতা নেই। বিষয়টি নিয়ে অনেকে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন টাঙ্গাইলের কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ফিস্টুলা সার্জন বিলকিস বেগম চৌধুরী।
প্রথম আলো: প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যা কেন প্রয়োজন? এর উপাদানগুলো কী কী?
বিলকিস বেগম চৌধুরী: সন্তান জন্মদানের সঙ্গে যুক্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাস্থ্যের বিষয়টি হচ্ছে প্রজননস্বাস্থ্য। দেহ ও মনকে সুস্থ রাখার জন্য অবশ্যই প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যা প্রয়োজন। নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যা প্রয়োজন। তবে যেহেতু নারী সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই তাঁদের প্রজননস্বাস্থ্যের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। প্রজননস্বাস্থ্যের উপাদানকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ধাপে আসে শরীরের অন্তর্গত অঙ্গগুলো। যেমন জননপথ, জরায়ু, ডিম্বাশয় ও ডিম্বনালি। বাইরের অঙ্গের মধ্যে রয়েছে জননপথের মুখ, ভগাঙ্কুর, ভগওষ্ঠ, স্তন ইত্যাদি। পুরুষের অঙ্গগুলোর মধ্যে অণ্ডকোষ, সেমিনাল ভেসিক্যাল ইত্যাদি।
প্রথম আলো: প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যার শুরু হওয়া উচিত কোন সময় থেকে?
বিলকিস বেগম চৌধুরী: নারীর ঋতুস্রাবের সময় থেকে তাঁর প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যার ব্যাপারটি শুরু হওয়া উচিত। চলবে মেনোপজ না হওয়া পর্যন্ত। পুরুষের ক্ষেত্রে ১২-১৩ বছরের পর থেকেই প্রজনন অঙ্গগুলো আকারে বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়। এই বয়স থেকেই তাঁদের প্রজননস্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথম আলো: প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যার অভাবে কী কী রোগ হতে পারে?
বিলকিস বেগম চৌধুরী: যৌনবাহিত রোগ, যেমন সিলিফিস, গনোরিয়াসহ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত বিভিন্ন রোগ হতে পারে। মেয়েদের গর্ভপাত, গর্ভকালীন খিঁচুনি, উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদি হতে পারে। প্রসবকালীন জটিলতার কারণে জরায়ু ফেটে যাওয়া, জননপথের মুখ ফেটে যাওয়া, ফিস্টুলা ও ক্যানসার হতে পারে।
প্রথম আলো: এসব রোগ প্রতিরোধের উপায় কী?
বিলকিস বেগম চৌধুরী: সবার উচিত প্রজনন অঙ্গগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। প্রজননস্বাস্থ্যের পরিচর্যার অভাবে নারীদের জরায়ুমুখের ক্যানসার হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্যানসার না হওয়ার জন্য টিকা দেওয়া, অপ্রাপ্ত বয়সে গর্ভধারণ না করার ব্যাপারে সচেতন করা এবং যৌনবাহিত রোগগুলো থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনিরাপদ শারীরিক মিলন থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রথম আলো: প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে?
বিলকিস বেগম চৌধুরী: প্রজননস্বাস্থ্যটি একদিকে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে মনুষ্য প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার সঙ্গে যুক্ত। তাই প্রজননস্বাস্থ্য নর-নারী যে কারও জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর সুরক্ষার বিষয়টি সবার জানা উচিত। এ জন্য বিষয়টিকে স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে আনতে হবে। জনগণকে সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। এ ছাড়া জেলা হাসপাতাল, মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে প্রজননস্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রজনন-সম্পর্কিত বিষয়টি ‘খারাপ’ অথবা ‘গোপনীয়’ কোনো বিষয় নয়। এটি জীবনের একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। একমাত্র যথাযথ জ্ঞান ও সঠিক আচরণের মধ্য দিয়েই প্রজননস্বাস্থ্যের সুরক্ষা সম্ভব। তাই এ-সংক্রান্ত তথ্য জানা প্রতিটি মানুষের একই সঙ্গে অধিকার ও দায়িত্ব। মানুষের জীবনকে যে বিষয়টি সবচেয়ে সুন্দর করে তোলে, যাকে কেন্দ্র করে শিল্প-সাহিত্যের একটি বড় অংশ আবর্তিত হয়, সে বিষয়টিকে অবহেলা করা মানে জীবনকে অবহেলা করা। তাই প্রজননস্বাস্থ্যের সুরক্ষা মানবাধিকারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো: কুমুদিনী মেডিকেল কলেজে ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সম্পর্কে বলুন।
বিলকিস বেগম চৌধুরী: সন্তান প্রসবে দেরি হলে প্রসবপথের সঙ্গে মূত্রনালি অথবা মলনালির সংযোগ ঘটে যায়। ফলে যোনিপথ দিয়ে অবিরত প্রস্রাব বা মল অথবা উভয়ই ঝরতে থাকে। এটাই হচ্ছে ফিস্টুলা। ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। তাঁর দাম্পত্য জীবন ব্যাহত হয়। তাঁদের অধিকাংশই তালাক পেয়ে থাকেন। অথবা স্বামীর সংসারে কাজের মেয়ের মতো জীবন যাপন করেন। আমরা ফিস্টুলায় আক্রান্ত নারীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। কুমুদিনী হাসপাতালে ফিস্টুলার চিকিৎসায় আমরা তিনটি ধাপে সেবা দিয়ে থাকি। প্রথম ধাপে, যেসব নারীর ফিস্টুলার আশঙ্কা রয়েছে, তাঁদের প্রসবের আগে সেবা দেওয়া হয়, এরপর প্রসবকালীন সেবা দেওয়া হয়। প্রসব-পরবর্তীকালীন সেবা দেওয়া হয় প্রতিরোধের জন্য।
যাঁরা ইতিমধ্যে ফিস্টুলায় আক্রান্ত, তাঁদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিরাময়ের চেষ্টা করি। অনেকেই পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনযাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকে আবার অস্ত্রোপচারের পরও শারীরিকভাবে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন না। এ রকম অসহায় যাঁরা, তাঁদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের (সেলাই, হস্তশিল্প ) মাধ্যমে সামাজিক জীবনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে থাকি।
সূত্র - প্রথম আলো

