রাত থেকেই প্রসবব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন তাসলিমা। খুব ভোরে স্বামী হাফিজুল তাসলিমাকে নিয়ে যান স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু সেখান থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, অভিজ্ঞ চিকিৎসক নেই, তাই এখানে সন্তান প্রসব হবে না। বাধ্য হয়ে তাসলিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের একটি হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাসলিমার গর্ভের শিশু গর্ভেই মারা যায়। ঘটনাটি ঘটে ২০১২ সালে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলায়।শুধু চাঁদপুরেই নয়, দেশের অনেক জেলার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। চিকিৎসক না থাকায় প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। এসব কেন্দ্রে প্রজননস্বাস্থ্যসেবা বলতে কিছু নেই। প্রজননস্বাস্থ্যসেবা পাওয়াটা মানুষের জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলেও জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে প্রজননস্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ স্বাস্থ্যকেন্দ্র অপরিচ্ছন্ন। অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও নেই। ফলে অসংখ্য রোগী গ্রাম্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং অপচিকিৎসার শিকার হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। দুর্গম চরাঞ্চল, হাওরাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রজননস্বাস্থ্যসেবা উপেক্ষিত। বিঘ্নিত হচ্ছে নিরাপদ মাতৃত্ব।ভোলা জেলার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে লেবার রুম (প্রসূতি ঘর) থাকলেও তা অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর। ফলে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মায়েরা নানা সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। ভোলা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহমুদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, একটি আধুনিক প্রসূতি ঘর অবশ্যই জীবাণুমুক্ত হতে হবে। কিন্তু বেশির ভাগ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তা নেই। তিনি আরও বলেন, ভোলায় ৪৮টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র আছে, এর প্রতিটিতে সন্তান প্রসব হওয়ার কথা; অভিজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় তা হচ্ছে না।ভোলার সদর ও দৌলতখান উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, এসব ইউনিয়নের বেশির ভাগ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র অনাধুনিক, অপরিচ্ছন্ন ও জীবাণুযুক্ত। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, অবেদনবিদ, সেবিকা, আয়া, ঝাড়ুদার নেই। অথচ প্রতিটি কেন্দ্রে প্রতি মাসে অর্ধশতাধিক সন্তান প্রসব করানো হয়। তবে সদর উপজেলার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের অবস্থা অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তুলনায় অনেক ভালো।
ভোলা জেলা সিভিল সার্জন ফরিদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, অজ্ঞতা, কুসংস্কার, লজ্জা ও ভয়ের কারণে প্রজননতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে মানুষজন, বিশেষ করে নারীরা সাধারণত চিকিৎসকদের কাছে আসেন না। তার পরও যাঁরা আসেন, তাঁরাও ঠিকমতো সেবা পাচ্ছেন না। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রজননস্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাই প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রজননস্বাস্থ্য-বিষয়ক আলাদা বিভাগ থাকা আবশ্যক।
প্রয়োজনীয় উপকরণসহ মাঠপর্যায়ে জনবলের অভাব পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রজননস্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। এ ছাড়া অপারেশন থিয়েটারে আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশের অভাবে প্রজননস্বাস্থ্যসেবার ক্লিনিক্যাল কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিধি বাড়ানো হলেও অপারেশন থিয়েটারের পুরোপুরি সুবিধা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এখনো অনেক সরঞ্জামের অভাব রয়েছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সম্প্রসারিত ভবনে ২০০২ সাল থেকে জরুরি প্রসূতিসেবা (ইওসি) কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এখানে অস্ত্রোপচারের পর মা ও নবজাতককে রাখা হয়। এ জন্য ১২টি শয্যা রয়েছে। তবে লোহার শয্যাগুলো মরিচা ধরে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া এর বিছানাপত্র, মশারি ব্যবহার করার মতো নয়। যে কয়টি বৈদ্যুতিক পাখা রয়েছে, তার অধিকাংশই অকেজো হয়ে গেছে। ভেঙে গেছে দরজা-জানালা। বাথরুমগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে প্রসূতি মায়েরা নানা সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন।
হবিগঞ্জ জেলা মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের চিকিৎসা পাচ্ছেন না স্থানীয় অধিবাসীরা। চিকিৎসক, ওষুধসহ নানা সংকট লেগেই আছে এখানে। এ ছাড়া এই কেন্দ্রে অর্থের বিনিময়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অস্ত্রোপচার করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গত সপ্তাহে এই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য শিশু ও মা চিকিৎসা নিতে এসেছেন। চিকিৎসা নিতে আসা হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লুকড়া গ্রামের অন্তঃসত্ত্বা অনিতা রানী জানান, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোনো চিকিৎসক না পেয়ে তিনি চলে যাচ্ছেন। একই উপজেলার শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজ এলাকার বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা রহিমা খাতুন (৩৫) বলেন, আজ (গত সোমবার) তাঁর অস্ত্রোপচার হবে। তবে চিকিৎসক না থাকায় বাইরের চিকিৎসক এসে অস্ত্রোপচার করবেন। এ জন্য এখানকার লোকজনের সঙ্গে তাঁর ১২ হাজার টাকায় রফা হয়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা হাসিনা বেগম (৩৩) জানান, এক মাস আগে এখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর সন্তান হয়। সেলাই না শুকিয়ে তা ছিঁড়ে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে ও পচন ধরেছে। যে কারণে তিনি আবার এসেছেন। তিনি জানান, তাঁর সন্তান হওয়ার সময় এখানকার চিকিৎসককে অস্ত্রোপচারের জন্য তিন হাজার ও ওষুধের জন্য সাত হাজার টাকা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্বরত চিকিৎসা কর্মকর্তা আবদুর রব মোল্লা জানান, চিকিৎসক এম এ মান্নান নিজের চিকিৎসার জন্য ছুটিতে রয়েছেন। রোগীরা চিকিৎসা ও ওষুধ না পাওয়া এবং অর্থ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত নন।
তবে ভিন্ন চিত্রও আছে। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের পরিস্থিতি সন্তোষজনক। এখানে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচি (এমএনএইচ) চালুর পর প্রতিদিনই অন্তঃসত্ত্বা নারীরা আসছেন। এখানে বিনা মূল্যে এলাকার মানুষ এই সেবা পাচ্ছেন।
কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বামী আনোয়ারুল ইসলাম জানান, এ কেন্দ্রে গর্ভবতী মায়েদের ভালো চিকিৎসা করার কথা শুনে ঠাকুরগাঁওয়ের লক্ষ্মীরহাট থেকে স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন। স্ত্রীর স্বাভাবিকভাবে ছেলেসন্তান হয়েছে। কোনো টাকা লাগেনি, ওষুধও কিনতে হয়নি। ওই কেন্দ্রের স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা উম্মুল ওয়ারারা জানান, প্রতিদিন এ কেন্দ্রে নারীদের ভিড় লেগে থাকে। প্রতি মাসে এই কেন্দ্রে ১৫ থেকে ২৫ জনের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এবং ৫০ থেকে ৭০ জনের স্বাভাবিকভাবে সন্তান হচ্ছে। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনার নানা সেবার জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৫০ জন নারী এ কেন্দ্রে আসেন।
এই কেন্দ্রের অবেদনবিদ আবদুল্লাহ জানান, ইউনিসেফ ও ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় এমএনএইচ কর্মসূচি চালুর পর ২০ শয্যার এ কেন্দ্রের গতিশীলতা বেড়েছে। এখানকার প্রসূতিসেবাকক্ষে এসি লাগানো হয়েছে। আইপিএস স্থাপন এবং সাতজন পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবায় অবদান রাখার জন্য এ বছর জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেয়েছে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতাল। ২০১১ সালে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচির (এমএনএইচ) আওতায় এ হাসপাতালে চালু করা হয় মা ও নবজাতকের পরিচর্যার জন্য আলাদা একটি ইউনিট। এখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। রয়েছে ইনকিউবেটর, ফটোথেরাপি মেশিন, ওয়ার্ম মেশিন, বেবি সাকার, কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র, ওজন পরিমাপক যন্ত্র ও নেবুলাইজার মেশিন। মানসম্মত ওষুধ সরবরাহের জন্য দেশের সেরা ১০টি ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে ওষুধ কেনা হচ্ছে।
এ ইউনিটের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক শাহজাহান নেওয়াজ বলেন, ইউনিটে ১৭টি শয্যা থাকলেও প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৬ জন রোগী সেবা নেন। ধারণক্ষমতার বেশি রোগী ভর্তি হলেও সব রোগীকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
সূত্র - প্রথম আলো

