মাটির কুঁড়েঘরে বসে মসুরের ডাল রান্না করছেন সুখরানি।রাতের জন্য রান্নার আয়োজন করছেন ৬০ বছরের এই বৃদ্ধা।একটি মোম থেকে মৃদু আলো ছড়াচ্ছে ঘরে।এর সঙ্গে যোগ হয়েছে চুলার লাকড়ির আগুন থেকে আসা আলো।জীবনভর এ আলো সম্বল করেই আঁধারে তাঁদের চলাফেরা।সারা গ্রামে বিদ্যুৎ বলতে কিছু নেই।
রোজ রাতে এভাবে কাঠের চুলায় রাতের খাবার রান্না করেন সুখরানি। ঘামে ভেজা মুখ মোছেন বারবার। ভারতের উৎর প্রদেশ রাজ্যের পূর্বা গ্রামে তাঁর বাস। শুধু সুখরানি নন, স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরও ভারতের কয়েক লাখ গ্রাম এখনো বিদ্যুৎবিহীন। এসব গ্রামের মানুষ সুখরানির মতো কখনো বিদ্যুতের আলো দেখেননি। রাতের জীবনটা তাঁদের সৎকারেই আঁধারে ঠাসা।
তবে পূর্বা গ্রাম থেকে মাৎ পাঁচ কিলোমিটার দূরে, প্রতিবেশী জানগাঁও গ্রামের চিৎটা একেবারেই আলাদা। জানগাঁও গ্রামে সুখরানির মতো এক কুঁড়েঘরে থাকেন আশরাফ আলী। কিন্তু তাঁর কুঁড়েঘরটি অন্ধকার নয়। আলোয় ভরা। কারণ আশরাফ আলীর ঘরে রয়েছে সৌর প্যানেলের সংযোগ। অন্ধকার দূর করতে তাই তিনি সৌরবাতির আলো জ্বালেন। সৌরশক্তিচালিত একটি বৈদ্যুতিক পাখাও ঘোরে তাঁর মাথার ওপর। আর এ সবকিছুর জন্য প্রতি মাসে খুব সামান্য কিছু অর্থ ব্যয় করতে হয় তাঁকে।
আশরাফ আলী গয়না তৈরির কাজ করেন। সৌরদীপের আলোতে রাত জেগে আশরাফ ও তাঁর স্ত্রীৎ রংবেরঙের চুড়ি আর গয়না তৈরি করেন। এগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। তাঁরা যখন গয়ন তৈরি করেন, তখন অন্য ঘরে তাঁদের সন্তানেরা খেলাধুলা বা পড়াশোনা করে। আশরাফ আলী জানান, যখন থেকে গ্রামে সৌরশক্তি এসেছে, তখন থেকেই তাঁদের জীবন অনেকটা সহজ হয়ে গেছে। সৌরদীপের এ আলো খুব উজ্জ্বল। এই সংযোগ নেওয়ার পরে ব্যবসারও অনেক উন্নতি হয়েছে। কারণ এখন রাতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে পারেন তাঁরা।সৌরল্যাম্পের আলোয় কাজ করছেন আশরাফ আলী ও তাঁর স্ত্রী। ছবি: বিবিসি।
জানগাঁও গ্রামে আশরাফ আলীর বাড়ি থেকে অল্প দূরেই একটি ভবনের ছাদে বসানো রয়েছে সোলার প্যানেল। এই সোলার প্যানেলটিই জানগাঁওয়ের মতো আরও ৩০টি গ্রামে আলো দিচ্ছে। সেই আলোতে চলছে গ্রামের স্কুল, টেলিকম টাওয়ার, ব্যবসা ও গৃহস্থালির কাজ। আশরাফ আলী জানান, সৌর প্যানেলগুলো বেশির ভাগ চীনের তৈরি। দামেও সস্তা। জানগাঁও গ্রামের বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানা সৌরশক্তি ব্যবহার করছে। ওই গ্রামে এখন ১০টি কারখানায় সৌরশক্তি ব্যবহার করা হয়।
এ ব্যাপারে সৌর প্যানেল প্রতিষ্ঠান ওমনিগ্রিড মাইক্রোপাওয়ার কোম্পানির কর্মকর্তা রোহিত চন্দ্র বলেন, স্বাধীনতার ৬৫ বছর পরও ভারতের ১২০ কোটি লোক বিদ্যুৎবিহীন। রাতের বেলা আঁধারে কাটাতে হয় তাঁদের। এ ক্ষেৎ সৌর প্যানেল ব্যবহার করে কম খরচে তাঁরা বিদ্যুতের সুবিধা পেতে পারেন। ভারতের এসব গ্রামে সৌর প্যানেলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
রোহিত চন্দ্র জানান, ব্যক্তিগত মালিকানায় ওমনিগ্রিড কোম্পানিটি পরিচালনা করা হয়। তারা নিজেদের উদ্যোগে সৌর প্যানেল চালু করেছে। সুবিধাবঞ্চিত গ্রামে এভাবে পৌঁছে দিচ্ছে বিদ্যুৎ। আসাম, বিহার, উৎর পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড, উৎর প্রদেশের প্রায় হাজার খানেক গ্রামের ৪০ কোটি মানুষ এখনো সৌরশক্তি ব্যবহার করেন, যা মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। তাই সৌরশক্তিচালিত বিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
সৌরশক্তি ভারতের গ্রামগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা পুরোপুরি মেটাতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের উৎরে দেশটির সরকারের জ্বালানি অবকাঠামোবিষয়ক উপদেষ্টা বিনায়ক চ্যাটার্জি বলেন, ভারতে বিদ্যুতের ঘাটতি এত বেশি যে বড় বড় সৌর প্যানেল প্রকল্প চালু করলেও আগামী তিন দশকে এ সমস্যার সমাধান হবে না। এ ধরনের বড় প্রকল্প চালু করাও যথেষ্ট ব্যয়বহুল। এ জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে সৌর প্যানেল যে জানগাঁওয়ের মতো গ্রামগুলোর চেহারা বদলে দিয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই জানগাঁওয়ের রাস্তা, মুদির দোকান, ক্লিনিক, খাবারের দোকানগুলোতে জ্বলে সৌরদীপ। কেটে যায় অন্ধকার। সঠিকভাবে উদ্যোগ নিলে সৌরশক্তিই ভারতের গ্রামগুলোকে দ্রুত বদলে দিতে পারবে। বিবিসি অনলাইন।
সুত্র - প্রথম আলো

