স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উপজেলা পর্যায়ে পুষ্টি কর্মশালায় অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কিছু কর্মশালা বন্ধ করে দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
তদন্তে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই কর্মশালা শেষ করা, অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের প্রাপ্য সম্মানী না দেওয়া, তাঁদের নামের তালিকাও না রাখা, কোথায় কোন তারিখে কর্মশালা হয়েছে সেই হিসাবও রাখা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। স্থানীয় পর্যায়ে বা জাতীয়ভাবে কর্মশালার ওপর নজরদারির কোনো ব্যবস্থা নেই।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান গত বছর জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিন দিন ও এক দিনের এসব কর্মশালার আয়োজন করে। এসব কর্মশালা নিয়ে গত বছরের ২ অক্টোবর প্রথম আলোতে ‘নামেই কর্মশালা, কাজে না’ শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপা হয়। ঘটনার তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৪ অক্টোবর পাঁচটি কমিটি গঠন করে। কমিটিগুলো জানুয়ারি মাসে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি সুনির্দিষ্টভাবে দুজন চিকিৎসকের নাম উল্লেখ করে দুর্নীতির জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। ময়মনসিংহের কমিটি অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। বরিশাল ও ঝালকাঠির দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি সুপারিশে বলেছে: কর্মশালা শুরুর আগেই উপজেলায় বরাদ্দকৃত টাকা ও প্রশিক্ষণ সহায়িকা পাঠাতে হবে; প্রশিক্ষণের স্থান ঠিক করা এবং অংশগ্রহণকারী ও প্রশিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে দিতে হবে, প্রশিক্ষককে আগেই প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, জাতীয় পুষ্টি কার্যক্রমের আওতায় ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে প্রতিটি উপজেলায় অবহিতকরণ সভা ও তিন দিনের কর্মশালা এবং স্কুলশিক্ষার্থীদের সচেতনতামূলক সভা ছিল অন্যতম।
জানা গেছে, প্রশিক্ষণে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মিললেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিয়ে তিন দিনের কর্মশালা ছাড়া কিছু কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, শাস্তিদানের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। তিনি বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় কর্মশালা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুষ্টিবিদ প্রথম আলোকে বলেছেন, অপুষ্টি দূর করার অন্যতম প্রধান উপায় হচ্ছে সচেতনতা বাড়ানো। দেশব্যাপী সচেতনতা বাড়াতে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নজরদারির দায়িত্ব পালন না করে কর্মশালা বন্ধ করে ঠিক করেনি মন্ত্রণালয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারা, বাঁশখালী ও সীতাকুণ্ড স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও কক্সবাজারের মহেশখালী, উখিয়া ও কুতুবদিয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গত বছরের মে ও জুন মাসে এক দিনের ও তিন দিনের কর্মশালা আয়োজন করে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের নামের তালিকা তদন্ত দল পায়নি। তিন দিনের কর্মশালাগুলো শেষ হয়েছে দুই দিনে। সম্মানী পাওয়া অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের যে তালিকা তদন্ত দলকে দেওয়া হয়, তাতে পদবি, কর্মস্থল, মুঠোফোন বা ই-মেইল ঠিকানা ছিল না। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মশালায় প্রশিক্ষকেরা ছিলেন অনভিজ্ঞ। অন্যদিকে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ব্যাগ (প্রতিটি ব্যাগের দাম ৬০০ টাকা) দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে খরচের বিল-ভাউচার তদন্ত কমিটিকে দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া ও ভালুকার কর্মশালাগুলোতে একই ধরনের অনিয়ম পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এই দুই জায়গায় কর্মশালার ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। কমিটি বলেছে, ব্যবস্থাপনায় যে চরম ত্রুটি রয়েছে, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র - প্রথম আলো

