দিন বদলের ধারাবাহিকতায় কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে আম। দেশের উত্তরবঙ্গের কৃষকদের জন্য আম উৎপাদন এখন একটি লাভজনক ব্যবসা। আমচাষীদের তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন কৃষকরা তাদের উৎপাদিত স্থানীয় জাতের আমের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে সেগুলো ফেলে দিতে বাধ্য হতো। প্রাণ এগ্রো লিমিটেড নতুন আশার আলো দেখিয়েছে।
২০০১ সালে নাটোরে দেশের অন্যতম বৃহৎ কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান প্রাণ এগ্রো লিমিটেড প্রতিষ্ঠার পর থেকে আমচাষীদের নতুন দিন শুরু হয়। কারণ কোম্পানির শুরু থেকে প্রতিবছরই সরাসরি কৃষকের কাছে থেকে আম ক্রয় করে আসছে। প্রাণের আমক্রয় কার্যক্রম উত্তরবঙ্গের আমচাষীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আগে কৃষকদের উৎপাদিত আমের বেশির ভাগই নষ্ট হয়ে যেত পরিচর্যার অভাবে অথবা বড় ক্রেতার অভাবে কমদামে বিক্রি করতে বাধ্য হতো।
প্রাণের আম ক্রয়ের ফলে কৃষকরা এখন আমচাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। ফলে এই এলাকার আমের উৎপাদন আগের তুলনায় অনেকগুণ বেড়েছে। এই এলাকায় কৃষিভিত্তিক আম শিল্প গড়ে ওঠার ফলে স্থানীয় জনশক্তির একটা বিশাল অংশের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যা এই এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।
প্রাণ এগ্রো লিমিটেডের পরিচালক ইলিয়াস মৃধা বলেন, ‘আমরা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ভালো মানের আম সংগ্রহ করি। প্রাণ প্রতি বছরের ন্যায় চলতি বছর প্রায় ৬০ লাখ মেট্রিকটন আম সংগ্রহের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পাবনা এবং দিনাজপুর থেকে মূলত এই আম সংগ্রহের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।’
তিনি জানান, প্রাণ কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রদানসহ আম চাষ এবং আমবাগানের পরিচর্যা বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রায় সারাবছর জুড়ে দিয়ে থাকে। ফলে কৃষকরা প্রাণের কাছে আম দিতে উৎসাহ বোধ করে।
এ ব্যপারে প্রাণ এগ্রো বিজনেস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার মাহাতাব উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কৃষকদের সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যবসায় বিশ্বাস করি। প্রায় ১৩ হাজার চুক্তিবদ্ধ আমচাষী রয়েছে, তাদের প্রাণ কৃষি হাবের মাধ্যমে সারাবছর বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্পমূল্যে উন্নতজাতের চারা প্রদান, সার, কীটনাশক ব্যবহার এবং রোপন প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান।
তিনি জানান, এছাড়া বছরব্যাপী চারা রোপন থেকে শুরু করে ফল দেয়া পর্যন্ত সমস্ত কর্মকাণ্ডে আমচাষীদের সহযোগিতা করা হয়।
মাহাতাব উদ্দিন বলেন, প্রাণ এগ্রো বিজনেস লিমিটেডের আওতায় ১৩ জন ফিল্ড সুপারভাইজার কর্মরত রয়েছেন। যারা প্রতিনিয়ত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, পাবনা এবং দিনাজপুর এলাকার চুক্তিবদ্ধ আমচাষীদের আমচাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকেন এবং তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।
প্রাণের কর্মকর্তারা জানান, প্রাণ এগ্রো লিমিটেড আমচাষীদের কাছে থেকে সাধারণত গুটি এবং আশ্বিনা এই দুইজাতের আম ক্রয় করে। আমচাষীদের কাছে থেকে বাজার মূল্যে আম ক্রয় করে প্রাণ। দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আমচাষীদের প্রতিনিধি ও প্রাণ এর প্রতিনিধির সমন্বয়ে নির্ধারিত হয়ে থাকে। প্রতি ৩-৭ দিন অন্তর আমের দাম পুনর্নির্ধারণ হয়ে থাকে। ফলে আমচাষীদের তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারে। আম ছাড়াও চুক্তিভিত্তিক প্রান্তিক কৃষক এবং সরবরাহকারীদের কাছে থেকে বিপুলপরিমাণ কৃষিপণ্য যেমন চাল, ডাল, বাদাম, টমেটো, দুধ, জলপাই, মরিচ ও হলুদ প্রভৃতি প্রতিবছর সংগ্রহ করে থাকে প্রাণ।
নাটোরে পাঁচ হাজার কর্মসংস্থান
প্রাণ কোম্পানির উদ্যোগে নাটোরে কৃষিভিত্তিক এ শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার কারণে ফ্যাক্টরিতেই সরাসরি প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়াও আমের মৌসুমে অতিরিক্ত আরো পাঁচ হাজার লোকের কর্মসংস্থান ঘটে ফ্যাক্টরিসহ আমচাষী ও সরবরাহকারীর কাজের সহায়তায়। এই শ্রমিকের প্রায় ৯০ ভাগই নারী শ্রমিক। পাশাপাশি আমের মৌসুমে ফ্যাক্টরিসহ আমচাষী ও সরবরাহকারীদের কাছে পরোক্ষ কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়। আম বহন, লোড-আনলোড, আম রাখার জন্যে শেড নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল বিভিন্ন কাজের জন্য স্বল্পমেয়াদী অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়।
প্রাণ এগ্রো লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার শেখ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা মান রক্ষায় আপোষহীন। ফ্যাক্টরিতে আম প্রবেশের সময় কোয়ালিটি কন্ট্রোলার দ্বারা আম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তা গ্রহণ করা হয়। আমগুলো পাকা কি না তা দেখা হয়, পোকা রোগমুক্ত এবং পচা কি না তা নিরীক্ষা হয়। এরপর ফরমালিন, ব্রিক্স, পি-এইচ টেস্টসহ প্রয়োজনীয় টেস্টের জন্য ল্যাবে পাঠানো হয় । বাছাই করা এই আমগুলি ফ্যাক্টরিতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রাসিং করে পাল্প সংগ্রহ করে রাখা হয়। আমের এই পাল্প দিয়ে ম্যাংগো ড্রিংক, ম্যাংগো বারসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসম্মত ও রুচিশীল খাবার তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বমানের পণ্য বিশ্বের প্রায় ৯৩টি দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশের কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিচ্ছি।’
নাটোর এলাকার প্রাণের আমচাষী মো. বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘আমি আমচাষ করে এখন স্বাবলম্বী। কারণ আমের সিজনে আম বিক্রি নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই। আমি এখন ন্যায্য মূল্যে আম বিক্রয় করতে পারি। কারণ আম গাছ থেকে নামিয়ে নেয়ার পর সেই আম প্রাণ কোম্পানি বাজার মূল্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দরদাম বাজারদর অনুযায়ী আলোচনা করে ঠিক করা হয়। কৃষকদের জন্য প্রাণ কোম্পানির মতো অন্য কোম্পানিরও এগিয়ে আসা উচিত।’
সূত্র - বাংলা নিউজ ২৪

