সম্প্রতি ইন্টারনেট নামের আশ্চর্য জাদুর প্রদীপের কল্যাণে ছড়িয়ে পড়েছে আইরিস হ্যামশো নামের এক শিল্পীর আঁকা ছবি। খুব সাধারণ রং-তুলির আঁচড়ে শিল্পীর বিমূর্ত ভাবনার প্রকাশ দেখে জাঁদরেল সমালোচকেরা পর্যন্ত বাহবা দিচ্ছেন। এক ঝলক সেই শিল্পীর আঁকা ছবি দেখেই বিমোহিত হচ্ছেন সাধারণ শিল্পপ্রেমীরাও। সম্প্রতি তার দুটি ছবি বিক্রি হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকায়। নতুন, অচেনা-অখ্যাত কোনো শিল্পীর জন্য অঙ্কটা অবশ্যই অনেক বড়। তার ছবির প্রিন্ট বিক্রি হচ্ছে ৩৫ হাজার টাকায়।
এরপর খোঁজ নিতে গিয়ে চমকে উঠে জানা যাচ্ছে, শিল্পীটির বয়স মাত্র তিন বছর। এর চেয়েও বিস্ময়কর তথ্য হলো, শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত, আমাদের চেনা অভিধানে খুব রূঢ় একটি শব্দ আছে এ ধরনের শিশুদের বোঝাতে—বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী।
আরাবেলা কার্টার-জনসন ও পিটার জন-হ্যামশো যখন জানতে পারলেন তাঁদের মেয়ে অটিজমে আক্রান্ত; আর দশটা মা-বাবার মতো ভেঙে পড়েছিলেন। অন্য শিশুদের সঙ্গে আইরিস মিশতে পারে না। কারণ, এটি তাকে বিচলিত করে, যন্ত্রণাবিদ্ধ করে। অচেনা পৃথিবী পদে পদে তাকে ভয় আর আতঙ্কগ্রস্ত করে তোলে। হ্যামশো দম্পতি ভাগ্যবান। কারণ, তাঁরা দ্রুতই এর সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। রং-তুলি এনে দিলেই আইরিস শান্ত। এটাই যেন তার সবচেয়ে চেনা জগৎ। ডাঙায় ছটফট করতে থাকা মাছকে জলে আবার ছেড়ে দিলে যেমন হয়, আইরিসের জন্য রং-তুলি আর ছবি আঁকার কাগজ ঠিক তেমনটাই।
ছবি আঁকার তার এই প্রতিভা আবিষ্কৃত হয়েছে হুট করে। আরাবেলা বলেছেন, ‘একদিন আমি কিছু রেখামানব আঁকলাম। এটা দেখে ও খুব মজা পেল। এই দেখে আমার মা ওর জন্য একটা ইজেল (ছবি আঁকার কাঠের ফ্রেম) এনে দিলেন। আমরা তাতে ছবি আঁকতে শুরু করলাম। আইরিস ব্রাশ দিয়ে একটা টান মারল। কিন্তু রংগুলো গড়িয়ে নিচের দিকে পড়ে গেল। এই না দেখে ও রাগে-কান্নায় ফেটে পড়ল। আমি সমস্যাটা বুঝতে পারলাম। এটা আসলে রঙের সমস্যা নয়, সমস্যা হলো ও তুলি দিয়ে রংটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফলে ইজেলে কাগজটা খাড়া করে রাখার বদলে আমরা সেটা টেবিলে শুইয়ে রাখলাম, যেন সে পুরোটা রং দিয়ে ভরিয়ে ফেলতে পারে। এবং দেখে মনে হলো, কী করতে হবে সেটা যেন ও সহজাতভাবেই বুঝতে পারছে।’
এভাবেই শিল্পী হয়ে ওঠা আইরিসের। এভাবেই ইজেলের বদলে টেবিলে কাগজ রেখেই ছবি আঁকে সে। অনেক সময় ঝানু শিল্পীর মতো ব্রাশের পাশাপাশি ব্যবহার করে স্পঞ্জ, কাঠি এমনকি প্লাস্টিকের কাঁটা চামচও। দিনে পাঁচ ঘণ্টার মতো ছবি আঁকার পেছনে ব্যয় করে সে। তবে শুধু ছবি আঁকার মধ্যে নিজের জগৎটা যেন তার আটকে না যায়, সেদিকেও সচেতন তার মা-বাবা। অন্যান্য বিষয়েও মনোযোগী করে তোলার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
গত চার মাসে ৩৫টি ছবি এঁকেছে আইরিস। তাঁর আঁকা ছবিগুলো প্রথম দিকে চেনাজানাদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলে দেয়। এরপর আরাবেলা যখন বুঝতে পারেন তাঁর মেয়ের মধ্যে সত্যিই বিশেষ এক প্রতিভা আছে, তিনি ইন্টারনেটের সাহায্য নেন। ফেসবুকে পোস্ট করেন মেয়ের আঁকা ছবি। বানান বিশেষ এক ওয়েবসাইটও। এই কয়েক দিনের মধ্যে যে সাইটে ১৩০টি দেশ থেকে এক লাখের মতো মানুষ দেখেছে আইরিসের আঁকা ছবি। আগামী নভেম্বরে তার ছবিগুলো নিয়ে বিশেষ প্রদর্শনীর পরিকল্পনা চলছে। নিজের আঁকা ছবি দিয়ে শুধু নিজের চিকিৎসা ব্যয়ের অনেকটাই আইরিস পূরণ করছে না, এমনও পরিকল্পনা আছে, এর থেকে ভালো পরিমাণ টাকা উঠে এলে তা দিয়ে গঠন করা হবে বিশেষ তহবিল।
সূত্র - প্রথম আলো

