[ব্যক্তিত্ব সমস্যা আসলে একধরনের মনঃরোগ। এধরনের রোগে আক্রান্ত কোন ব্যক্তি সামাজিক রীতি-নীতির বিপরিতে এমন কিছু করে যা অনেক সময় বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে। আস্তে আস্তে ঐ
ব্যক্তি নীতি-নৈতিকতার বাইরে গিয়ে অসামাজিক হয়ে পড়ে এবং দিনকে দিন তার কাজের দক্ষতাও হারিয়ে ফেলে। পরিচয় সংকট থেকে শুরু করে বহুমুখি ব্যক্তিত্ব সংকটে ভুগতে থাকা মানুষগুলো একসময় নিজের চিন্তা-চেতনা, স্মৃতি, কাজের সাথে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। নিজের ভিতরেই দ্বৈত ব্যক্তিত্বের সাথে লড়াই করে ছিন্ন-ভিন্ন হয়।
‘হেলথ প্রায়র ২১’ এর অন-লাইন পাঠকদের সুবিধার্থে ওয়েবএমডি’র সৌজন্যে আমরা বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্ব সংকট নিয়ে আলোচনা করব।]
আজ থাকছে নারসিসিজম বা ‘নিজের মধ্যে একান্ত অভিনিবিষ্টতা সমস্যা’। ইংরেজিতে যাকে Narcissistic Personality Disorder বলে।
আমরা সবাই জানি গ্রীক পূরাণের একটি চরিত্র “নারসিসাস” নামে এক সুদর্শন যুবকের গল্প। যে কিনা ঝর্নার পানিতে নিজের চেহারা দেখে এতটাই অভিভূত হয়ে পড়ে যে শেষে নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে যায় এবং অন্যদেরকে সে আর পাত্তাই দেয় না। এখানে নারসিসিজম তেমনি একটি পরিভাষা যেখানে মানুষ হয়ে পড়ে পুরোপুরি আত্মকেন্দ্রিক, নিজের প্রশংসায় মত্ত, নিজের ভিতরে গড়ে ওঠে অন্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবনতা।
Narcissistic Personality Disorder একধরনের সমষ্টিগত অবস্থা যা ড্রামাটিক পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের মধ্যে পড়ে। এধরনের সমস্যায় ভোগা মানুষগুলোর মধ্যে একধরনের তীব্র ও ভারসাম্যহীন আবেগ কাজ করে। আর নিজের ভিতর তৈরী হয় এক মিথ্যা আত্মপ্রতিবিম্ব। তৈরী হয় একধরনের অস্বাভাবিক আত্মমোহ বা আত্মপ্রেম, একধরনের অতিরঞ্জিত অহমিকাবোধ। এরা নিজেকে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ন মনে করে। ক্ষমতা এবং সাফল্য পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। যদিও এধরনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরনে তাদের নিজেদের প্রতি আস্থার প্রতিফলন ঘটে না। এধরনের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য তার নিজের প্রতি নিজের ভঙ্গুর আত্মম্ভরিতা আর নিরাপত্তাহীনতাকে লুকিয়ে রাখবার প্রবনতা মাত্র। এধরনের সমস্যায় জর্জরিত মানুষের মধ্যে প্রায়শঃই অপরের প্রতি সহমর্মিতাবোধের পুরোপুরি অভাব পরিলক্ষিত হয়।
লক্ষণসমূহঃ
v এরা অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক এবং দাম্ভিক হয়
v সবসময় অন্যের মনযোগ নিজের প্রতি থাকুক এটা চায় এবং অন্যের মুখে নিজের প্রশংসা শুনতে চায়
v অন্যদের তুলনায় নিজেকে উত্তম ভাবে
v নিজের মেধাকে ও অর্জনকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরে
v তারা বিশ্বাস করে যে অন্যেরা তাকে বিশেষ দৃষ্টিতে দেখে বা গুরুত্ব দেয়
v অল্পতেই মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় কিন্তু সহজে প্রকাশ করে না
v অপূরণীয় লক্ষ্য নির্ধারন করে বা অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারন করে
v অন্যের সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে নিজের লক্ষ্য হাসিল করতে চায়
আরো যেসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে দেখা যায় সেসব হলঃ
- এরা কল্পনার দ্বারা পরিচালিত হয় যার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে অলিক সাফল্য, ক্ষমতা, জ্ঞান, সৌন্দর্য্য বা ভালবাসা
- নিজেকে সে ভাবে ‘অনন্য আর অসাধারন কিছু’ এবং আরো ভাবে তাকে বোঝে শুধু তার মত বিশেষ লোকেরাই
- সে বিশ্বাস করে যে অন্যরাও তার মত করে অনুভব করে, তার মতই দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করে, অন্যের চাহিদাও তার মতই
- অন্যের প্রতি সে ঈর্ষা পরায়ন এবং ভাবে অন্যরাও তার প্রতি ঈর্ষা পরায়ন
- অবমাননা, সমালোচনা, কিংবা পরাজয়ে অতিসংবেদনশীল এবং প্রতিক্রিয়া দেখায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে লজ্জা আর অবমাননার সাথে
- আচরন এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে উদ্ধত
কেন হয়
Narcissistic Personality Disorder কেন হয় বা দেখা দেয়, তার কারন এখনো উৎঘাটিত হয় নাই। তবে অনেক মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে এটা বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় নাজুক অবস্থা, সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং বিভিন্ন মনস্তাত্তিক কারনসহ অনেকগুলো ফ্যাক্টর এর জন্য দায়ী। কেউ কেউ বলেন, ছোটবেলায় তার সাথে কিরুপ ব্যবহার করা হয়েছে তার উপর তার আচরন নির্ভর করে যেমন বাবা-মা হয়তো তাকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিতেন, অথবা মেধাবী বা বিশেষ কিছু হতে অতিরিক্ত উৎসাহ দিতেন বা মনে করতেন। এতে এসব বাচ্চারা নিজেদেরকে অন্যদের তুলনায় বিশেষ কিছু মনে করতে থাকে। আবার বিপরীতভাবে হতে পারে শৈশবে সে বাবা-মা কিংবা অন্যদের কাছ থেকে প্রচন্ড অবহেলার শিকার হয়েছে। এখন বড় হয়ে সে নিজেকে বড় কিছু ভেবে বা হয়ে শৈশবের বঞ্ছনাকে পুষিয়ে নিতে চায়।
কিভাবে সনাক্ত করা যায়
ব্যক্তিত্ব আসলে একদিনে গড়ে ওঠে না। শৈশব, কৈশোর পার হয়ে যৌবনে হয়তো দেখা দেয়। শারীরিক সমস্যায় যেমন একজন ডাক্তার কর্তৃক তার মেডিকেল হিস্ট্রি কিংবা শারীরিক পরীক্ষা করে নির্ণয় করা সম্ভব, পারসোনালিটি ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে তেমন কোন ল্যাব টেস্ট নাই। তবে যদি কারো ক্ষেত্রে তার ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়, সেক্ষেত্রে কিছু কিছু ল্যাব টেস্ট যেমন নিউরোইমেজিং, রক্ত পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে, তার এমন কোন স্নায়ুবিক বা শারীরিক সমস্যা আছে কি না যার ফলে তার ব্যক্তিত্বেরও পরিবর্তন হচ্ছে।
যদি কোন শারীরিক সমস্যা না পাওয়া যায় তবে তাকে কোন দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মনঃরোগবিদের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। তারা বিশেষ ডিজাইনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও এ্যসেসমেন্ট টুলের সাহায্যে তার ব্যক্তিত্বের সমস্যা বা কোন ধরনের ব্যক্তিত্ব সমস্যায় সে ভুগছে তা’ নিরুপন করবেন।
চিকিৎসা
এই রোগে থেকে পুরোপুরি ভাল হয় বা সেরে ওঠে এমন কোন চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয় নি। তবে সাইকোথেরাপির (এক ধরনের কাউনসেলিং) মাধ্যমে পরিবার ও সমাজের প্রতি ইতিবাচক আচার-আচরন তাকে বোঝানো বা শেখানোর চেষ্টা করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের কাউনসেলিং করে তার ভিতরে একটা ইতিবাচক অন্তর্দৃষ্টি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয় যাতে সে তার ভিতরের সমস্যাগুলো বুঝতে সক্ষম হয় যা তার আচরনকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসতে পারে এবং তাকে বাস্তব জগতে নিয়ে আসে।

