home top banner

স্বাস্থ্য টিপ

মানসিক চাপ দূর করুন
১৯ জুলাই, ১৩
  Viewed#:   484

মানসিক চাপ আমাদের সবাইকেই কমবেশি ভুগিয়ে থাকে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক হুমকি, চাকরি-বাকরি, ব্যস্ততা, অসুখ-বিসুখ সবকিছু মিলিয়ে এই মানসিক চাপ আমাদের স্বাস্থ্য ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। ফলশ্রুতিতে, জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। ছোটো-খাটো বিষয়ে হতাশা এসে একসময় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে জীবনের পরতে পরতে ! ছোট্ট এই জীবনটাকে উপভোগ করার আগেই বিষাদে ছেয়ে যায় মন।

কিন্তু এভাবে কি চলতে দেয়া যায় ? তাহলে কী করা উচিৎ ? আসুন জেনে নিই মানসিক চাপকে মোকাবিলা করার কিছু সহজ কিন্তু ফলপ্রসূ পদ্ধতি -

০১. ‘নাবলতে শিখুনঃ

কাজের চাপ এবং সমাজ ও পরিবারকে দেয়া অঙ্গীকার যখন বেশি হয়ে যায়, তখন ‘না’ বলাটা শিখুন। অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে যেয়ে সেধে চাপ নিতে যাবেন না। প্রয়োজনে সাহায্যও চেয়ে নিতে পারেন, এটিও টিম ওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

০২. বিরতি নিনঃ

ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট অ্যাসোসিয়েশানের মতে, “আপনি আপনার কাজে খুব ভালো দক্ষতা দেখাতে পারেন, যদি কাজের ফাঁকে ফাঁকে অন্তত ১০/১৫ মিনিটের বিরতি নেয়ার চর্চাটা করতে পারেন”। কাজেই ডেস্কে বসে লাঞ্চ না করে এই সময়টাতে মাথা থেকে দুশ্চিন্তা সব ঝেড়ে ফেলে নিজেকে একটু রিচার্জ করে আসুন। ফলাফল আপনার পরবর্তী পদক্ষেপগুলোই !

০৩. ব্যায়াম করুনঃ

মানসিক চাপ ঝেড়ে ফেলার একটি দুর্দান্ত উপায় হচ্ছে দৈহিক কার্যকলাপ। শারীরিক পরিশ্রম আমাদের শরীরে এন্ডোর্ফিনের নিঃসরণ ঘটায়, যা আমাদের মনে ভাল লাগার অনুভূতি তৈরী করে। একই সাথে তা আবার এনার্জি বাড়ায় এবং স্ট্রেস হরমোন যেমন কর্টিসোলকেও প্রতিহত করে। আপনার দেহের উপযোগী যেকোনো একটি ব্যায়াম নির্বাচন করে নিন, হতে পারে সেটি হাঁটা কিংবা নাচ কিংবা জিমের ব্যায়াম !

০৪. সুইচ অফ করতে শিখুনঃ

আজকের জন্য অফিস ছুটি বা কাজ শেষ? তবে মোবাইলের সুইচ অফ করার মতো করে আপনার মনের সুইচটিকেও অফ করে দিন। অযথা কাজের চিন্তায় মনটাকে ভার করে রাখবেন না।

০৫. গভীর নিঃশ্বাস নিনঃ

মানসিক চাপে থাকলে আমরা সাধারণত অগভীর শ্বাস নিই, যা মূলত দুশ্চিন্তা বাড়ায়। উদ্বেগ দূর করার জন্য শ্বাসপ্রশ্বাসের কিছু নিয়ম আছে –

  • আপনার মধ্যচ্ছদা (ডায়াফ্রাম) পর্যন্ত গভীর একটি নিঃশ্বাস নিন, যাতে আপনার পাঁজর বিস্তৃত হচ্ছে বলে বোধ হয়।
  • একবার যখন নিঃশ্বাস পূর্ণ বলে মনে হবে, তখন আরও তিনবার শ্বাস নিন ও ধরে রাখুন।
  • এইবার পুরো নিঃশ্বাস ছেড়ে দিন এবং ছোটো ছোটো আরও বার তিনেক নিঃশ্বাস ছাড়ার চেষ্টা করুন।
  • তিন-চারবার পুনরাবৃত্তি করুন।

০৬. ক্যাফেইন সমাচারঃ

কফি, চা, কোলা ও সমস্ত অ্যালকোহল জাতীয় জিনিস রক্তে অ্যাড্রেনালিনের নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যেটি আসলে স্ট্রেসের মাত্রার বৃদ্ধি ঘটায়। পান করতে হলে সবুজ চা পান করুন। সবুজ চায়ে আছে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা স্ট্রেসের কারণে শরীরে সৃষ্ট অক্সিডেটিভকে প্রতিহত করে।

০৭. ইতিবাচক হোনঃ

অধিকাংশ মানসিক চাপই আসলে আপনার অনুধাবনের উপর নির্ভর করে। একটু পেছনে ফিরে তাকান এবং ভাবুন, সত্যিই যা নিয়ে আপনি উদ্বিগ্ন, তা নিয়ে খুব চিন্তা করার দরকার আছে কি? শুধুমাত্র আপনার দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তনই আপনাকে যেকোনো সমস্যাকে একটি ইতিবাচক কোণ থেকে দেখতে সাহায্য করবে।

০৮. পরিকল্পনাই সবঃ

সময় ব্যবস্থাপনায় কৌশলী হোন। একদিনের কাজ শেষে পরের দিন ‘কী করতে হবে’ তার একটি তালিকা তৈরি করে রাখুন। তালিকাবদ্ধ কাজগুলো একটি একটি করে শেষ হওয়ার পর তা আপনাকে স্বস্তির আবেশ দেবে।

০৯. নিশ্চিন্তে ঘুমোন রাতের বেলায়ঃ

রাতে ঘুম আসেনা? মানসিক চাপের একটি অন্যতম পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হল ইন্সোমনিয়া, মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং শরীরকে ক্লান্ত ও মেজাজকে খিটখিটে করে তোলে। টেলিভিশান বন্ধ করে দিন, উষ্ণ গরম পানিতে স্নান করে নিন। বই পড়ুন অথবা শোবার আগে গান শুনতে পারেন। আপনার বেডসাইড টেবিলে একটি নোটবই রাখুন, সেখানে মাথায় ভিড় করে থাকা সমস্ত কথা লিখে রাখুন। তাহলে সেগুলো আপনার মনে জমে থেকে আর স্ট্রেস বাড়াতে পারবেনা ।

১০. নিজের মুক্তির পথ খুঁজে নিনঃ

রবার্ট এম. সাপোলস্কির মতে, আপনার নিত্য যেসব বিষণ্ণতা, সেগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য নিয়মিত একটি মুক্তির পথ খুঁজে নিন, মানসিক চাপ দূর করার ক্ষেত্রে তা অনেক কাজে দেবে। হতে পারে তা কোন সামাজিক অনুষ্ঠান, গান, নাচ, কিংবা ধ্যান, প্রার্থনা কিংবা কোন শখের কাজ ! এটি আপনাকে মানসিক শক্তি দেবে এবং উপভোগ্য করে তুলবে আপনার এক একটি বিষাদময় দিন।

১১. ম্যাসেজ করুনঃ

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের একটি ভাল উপায় হল মালিশ করা। এটি আপনার খিল ধরে থাকা পেশিকে শিথিল করে, ব্যাথা কমায় ও রক্ত চলাচলের উন্নতি ঘটায়। আখেরে যা মানসিক অবসাদ দূর করায় ভূমিকা রাখে ।

১২.  মেডিটেশন করুনঃ

দিনে অন্তত ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের জন্যে হলেও মেডিটেশন করুন। কাজের চাপে আপনি খুব ব্যস্ত থাকলেও মেডিটেশনের জন্য একটু সময় রাখুন। মেডিটেশন করতে হলে আপনার দরকার হবে শুধুই আপনার মন। দিনে কিছুটা সময় নিজের মনটাকে একটু নীরবতা দিন অথবা শ্বাসপ্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিন। একটুখানি মনের শান্তিই সারাদিন আপনাকে অসংখ্য চাপ আর অশান্তি মোকাবিলা করার শক্তি দেবে।

১৩. বেঁছে নিন যোগ ব্যায়ামকেঃ

যোগ ব্যায়ামের ফলে মস্তিষ্কে এন্ডোর্ফিনের নিঃসরণ বাড়ে, যা মনকে প্রফুল্ল করে তোলে। তাছাড়া যোগ ব্যায়াম মেদবহুলতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়। তাই বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করে আপনার শরীরের উপযোগী যোগ ব্যায়ামের ধরণ বেঁছে নিন।

১৪. জীবনকে সংগঠিত করুনঃ

সুসংগঠিত জীবন আমাদেরকে উপহার দেয় একটি শান্তিপূর্ণ মন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ বোধ।  সবসময় সবকিছু টুকে রাখতে চেষ্টা করুন, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় আর ভুলবেন না। সময় ধরে ধরে কাজ করুন এবং সমস্ত কাজের ফাঁকেই নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখুন। দেখবেন স্থির হয়ে আসছে মনের সব ঝড় !

১৫. স্বাস্থ্যকর খাবার খানঃ

ইতোমধ্যে এটি প্রমাণিত যে, জাঙ্ক ফুড আমাদের মনের বিষাদ বাড়িয়ে দেয় (মেদবহুলতার কথাতো বলাই বাহুল্য)। কাজেই খাদ্যাভ্যাসে একটু পরিবর্তন নিয়ে আসুন। আমিষ ও শস্যজাতীয় খাবার আমাদের শক্তি বাড়ায় এবং মানসিকতায় তা পরিবর্তন আনতেও সচেষ্ট। বিজ্ঞানীদের মতে, কাঠবাদাম, সামুদ্রিক মাছ, শাকসবজির মত খাবার মানসিক চাপ দূর করায় ভূমিকা রাখে।

১৬. ইন্টারনেট ফোনের ব্যবহার কমিয়ে দিনঃ

সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন। মানসিক চাপ কমাতে না পারার একটি বড় কারণ হচ্ছে ইন্টারনেট ও টেলিফোন থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে না পারা। ইন্টারনেট ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে অন্তত এমন কিছু বিষয় থেকে দূরে থাকা যায়, যা আমাদেরকে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। আর তাছাড়া নিজের মূল্যবান সময়গুলোকেও উপভোগ করা যায় নিজের মত করে ।

১৭. ভিটামিন বি গ্রহণ করুনঃ

মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সুষম বিকাশে ভিটামিন বি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর তাছাড়া এটি শিথিলায়নেও ভূমিকা রাখে। ভিটামিন বি এর অভাবে খিটখিটে মেজাজ ও বিষাদ বাড়ে। কাজেই ভিটামিন বি গ্রহণ করুন। সাধারণত শিম, মটরশুঁটি, বাদাম, কলিজা, ডিম ও দুধে প্রচুর ভিটামিন বি থাকে।

১৮. অ্যারোমাথেরাপিঃ

কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিঃশ্বাসে গ্রহণের ফলে তৎক্ষণাৎ মানসিক চাপ দূর হয়ে যায় এবং পাশাপাশি দুশ্চিন্তা কমে গিয়ে মনোযোগ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুগন্ধি আমাদের ইন্দ্রিয় ব্যবস্থায় উদ্দীপনা সৃষ্টি করে, যা মস্তিষ্কে এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থের নিঃসরণ ঘটায়, যা আমাদের মধ্যে শিথিলায়ন, ভালবাসা, উত্তেজনা ও শান্তির অনুভূতি সৃষ্টি করে। মানসিক চাপ নির্মূলে কয়েকটি জনপ্রিয় সুগন্ধি তেল হচ্ছে রোজমেরি, সাইপ্রেস ও ল্যাভেন্ডার।

তো আর চিন্তা কিসের ? উপরোক্ত কৌশলগুলোকে রপ্ত করে ফেলুন আর জীবনে স্বস্তি নিয়ে আসুন। একটাইতো জীবন ! খামাখা চাপ নিয়ে জীবনটাকে কেন কষ্ট দেবেন? আত্মার শান্তিতেই আপনার শান্তি ! শুভ কামনা আপনার জন্য।

লিখেছেনঃ নুজহাত

Please Login to comment and favorite this Health Tip
Next Health Tips: Signs of a Midlife Transformation
Previous Health Tips: নিয়ম মেনে হাত ধোয়া কি হয়?

আরও স্বাস্থ্য টিপ

গাইনি ডাক্তারের কাছে যে বিষয়গুলো কখনোই লুকাবেন না

মেয়েলী যে কোনো সমস্যা হলেই গাইনি ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। আর গাইনি ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে অনেক নারীই কিছুটা দ্বিধাবোধ করেন। বিশেষ করে ডাক্তার যদি পুরুষ হয়ে থাকেন তাহলে অধিকাংশ সমস্যার কথাই জানাতে পারেন না নারীরা। গাইনি ডাক্তারের কাছে কিছু বিষয় লজ্জায় এড়িয়ে যান বেশিরভাগ রোগী। কিন্তু অত্যন্ত... আরও দেখুন

ত্বকের ক্লান্তি ভাব লুকাবেন যেভাবে

বেসরকারি ফার্মে চাকরি করেন অর্ষা। প্রায়ই বাসায় ফেরার পর তাকে রাত জেগে অফিসের কাজ করতে হয়। রাত জেগে কাজ করার ফলে ভালো ঘুম হয় না। তাই পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার পর খুবই ক্লান্তি লাগে তার। মাঝেমধ্যে এ বিষয় নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। ঠিকমতো ঘুমের অভাবে চোখের নিচেও কালি পড়েছে। প্রায়ই অফিসের... আরও দেখুন

পেয়ারার স্বাস্থ্য উপকারিতা

ছোট থেকে বড় সকলের কাছেই পেয়ারা খুবই প্রিয় একটি ফল৷ পেয়ারায় বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে, আর এই কারণেই এটি ‘সুপার ফ্রুট’ নামে পরিচিত৷ আপনিও জেনে নিন এই ‘সুপার ফ্রুট’এর গুণাগুণ৷ •    শরীরের অতিরিক্ত শর্করা শুষে নিতে পারে পেয়ারা৷ এছাড়াও এতে... আরও দেখুন

গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটির সমস্যা ও সহজ সমাধান

গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটির সমস্যা আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক ব্যপার। অনেককে বছরের প্রায় সময়ই ভূগতে হয় এ সমস্যায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর প্রতিকার হিসাবে পাওয়া যায় অনেক নামি দামি ওষুধ। কিন্তু আমাদের হাতের কাছের বিভিন্ন প্রকৃতিক জিনিস দিয়ে যদি করা যায় এর নিরাময়, তাহলে বাড়তি টাকা খরচ করার কি... আরও দেখুন

ওজন কমাতে রাতের বিশেষ খাবার ‘দই-ফল’

ওজনটা নিয়ে অনেকেই বেশ বিপাকে আছেন। ওজন যত সহজে বাড়ে তত সহজে কমে না। কঠিন ডায়েট চার্ট, দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করে ঘাম ঝরানোর কাজটাও খুবই কঠিন। তাই ওজন কমানোর ইচ্ছে থাকলেও কমানো হয়ে ওঠে না। যারা চট জলদি ওজন কমাতে চান একেবারে কষ্ট ছাড়াই তারা রাতের খাবারের মেন্যুটা একটু বদলে ফেলুন। রাতের খাবারে অন্য সব... আরও দেখুন

ডিম খাওয়ার লাভ-লোকসান!

ট্রেন কিংবা বাস স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, স্টেডিয়ামে, হাট-বাজারে এখনো শোনা যায় ফেরিওয়ালার ডাক—‘এই ডিম ডিম ডিম...সেদ্ধ ডিম...মুরগির ডিম...হাঁসের ডিম।’ আর তা হবেইবা না কেন? সহজলভ্য পুষ্টির উত্স হিসেবে ডিমের তুলনা কেবল ডিমই হতে পারে। তাই বাড়িতে বা রেস্তোরাঁয় সকাল-বিকেলের নাশতাতেই হোক... আরও দেখুন

healthprior21 (one stop 'Portal Hospital')