আবহাওয়াবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হিমালয় ও তত্সংলগ্ন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একটি উচ্চচাপ বলয় তৈরি হয়েছে। এই উচ্চচাপ বলয়ের প্রভাবে সাইবেরিয়ার হিমশীতল বাতাস হিমালয় ও ভারতীয় ভূ-ভাগ অতিক্রম করে দেশের ভেতরে ঢুকে পড়ায় এই শৈত্যপ্রবাহ। শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে সূর্যালোকের অনুপস্থিতি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে। ঘন কুয়াশার কারণে এমনটি ঘটছে। সাধারণত বর্ষা মওসুম শেষ হওয়ার পর বাতাসে বেশকিছু পরিমাণ জলীয়বাষ্প থেকে যায়। সেজন্যেই শীতকালে মাঝে-মধ্যে কোথাও কোথাও বৃষ্টি হতে দেখা যায়। কিন্তু এবারে এ ধরনের বৃষ্টি হয়নি। জলীয় বাষ্প রয়ে গেছে বাতাসেই। এখন ঠাণ্ডা বেড়ে যাওয়ায় এই জলীয় বাষ্পই মেঘ না হয়ে ঘন কুয়াশায় পরিণত হয়ে আমাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। একবার বৃষ্টি হয়ে গেলে কুয়াশার দাপট কমে যাবে। প্রসঙ্গত, সূর্যের তাপ দিনের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের তাপ ভূ-পৃষ্ঠে পৌঁছাতে বাধা পেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় না। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, গত কয়েকদিন ধরে ঊর্ধ্বাকাশের দুরন্ত হাওয়া বা জেট বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় থাকলেও শুক্রবার থেকে এর সক্রিয়তা কমে গেছে। এটি ১৮ হাজার ফুট পর্যন্ত নেমে এসেছিল। শুক্রবার এই বায়ু আবার ২২ থেকে ২৪ হাজার ফুটের স্তরে চলে গেছে। এখন যে অবস্থা তাতে জেট বায়ু সক্রিয় থাকলে পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে যেতো।
গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যশোরে ৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া আরও ১৪টি স্থানে তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। এর মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহ ৯ দশমিক ৫, কুমিল্লা ৮ দশমিক ৮, শ্রীমঙ্গল ৯, রংপুর ৯ দশমিক ৩, দিনাজপুর ৮ দশমিক ৫, সৈয়দপুর ৮ দশমিক ৫, খুলনা ৯ দশমিক ৫, মংলা ৯ দশমিক ৮, সাতক্ষীরা ৮ দশমিক ৭, চুয়াডাঙ্গা ৯, বরিশাল ৮ দশমিক ৮, পটুয়াখালী ৯ দশমিক ৫, ক্ষেপুপাড়া ৯ এবং ভোলায় ৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
মাওয়া-কাওড়াকান্দি ফেরি সার্ভিস ১০ ঘণ্টা বন্ধ ছিল : আমাদের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি ও শিবচর সংবাদদাতা জানিয়েছেন, মাওয়া-কাওড়াকান্দি ফেরি সার্ভিস পৌনে ১০ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টা থেকে চলাচল শুরু হয়েছে। ঘন কুয়াশার কারণে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টা থেকে এই সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় মাঝ পদ্মায় ৭টি ফেরিতে প্রায় দুই হাজার যাত্রী কনকনে শীতে চরম বিড়ম্বনায় পড়ে।
যশোর অফিস জানায়, তীব্র শীত ও কনকনে ঠাণ্ডায় যশোরের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শীতের সঙ্গে ঘন কুয়াশার কারণে শহরে লোক চলাচল তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। তীব্র শীতে দরিদ্র অসহায় মানুষের অবস্থা খুবই করুণ। সবাই পুরনো কাপড়ের দোকানে ভিড় করছে।
বরিশাল অফিস জানায়, প্রচণ্ড শীতে কাঁপছে পুরো দক্ষিণাঞ্চল। ঘন কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহে ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র মানুষের গরম পোশাক না থাকায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়ছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় শীত নিবারণের জন্য আগুন পোহাতে গিয়ে ১৬ জন অগ্নিদগ্ধ হয়েছে। এদের মধ্যে বৃহস্পতিবার শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় রুবি বেগম (৪০) নামে একজন মারা গেছেন। নিহত রুবি বেগম পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জের ঘটকের আন্দুয়া গ্রামের কেরামত আলীর স্ত্রী। তিনি গত বুধবার খড়কুটায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হন। তাকে ঐ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। আহতদের মধ্যে ৪ জনকে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়।
পিরোজপুর অফিস জানায়, প্রচণ্ড শীতে পিরোজপুরে তিনজনের মৃত্যু ঘটেছে। মৃতরা হলেন নাজিরপুর উপজেলায় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফিরোজ আহম্মেদ খসরু (৪৮), ইউপি সদস্য রুস্তুম আলী হাওলাদারের মা গহরজান বিবি (৭২) এবং ভাণ্ডারিয়া উপজেলার সুমন (৯)। জানা গেছে, যুবলীগ নেতা খসরু মোটরসাইকেলে চেপে বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে শহরের বাসায় ফিরে বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েন। শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি দেখে তার স্ত্রী ঘুম ভাঙ্গাতে গেলে বিছানায় খসরুকে মৃত অবস্থায় পান। এদিকে চৌঠাইমহল গ্রামে শ্রীরামকাঠির সাবেক ইউপি সদস্য মরহুম এসাহাক উদ্দিনের স্ত্রী গহরজান বিবির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ঠাণ্ডাজনিত কারণে দু'জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় চিকিত্সক জানিয়েছেন। অপরদিকে জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২য় শ্রেণীর ছাত্র সুমন (৯) ঠাণ্ডাজনিত কারণে মারা গেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করার পরই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাত্ক্ষণিকভাবে তাকে ভাণ্ডারিয়া হাসপাতালে নিয়ে আসার পর কর্তব্যরত চিকিত্সক তার উন্নত চিকিত্সার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল হাসপাতালে পাঠান। রাতে বরিশাল হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। সে ভাণ্ডারিয়া সদরের লক্ষ্মীপুরা গ্রামের সুপারি ব্যাবসায়ী খলিল ভুঁইয়ার ছেলে।
বরিশাল অফিস জানায়, শৈত্যপ্রবাহে ঠাণ্ডাজনিত কারণে বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার আস্কর গ্রামে সুখ রঞ্জন বাড়ৈ (৬৫) মারা গেছেন। একইদিন সকালে পয়সারহাট বন্দরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী উপজেলার পূর্ব সুজনকাঠী গ্রামের জেন্নাত আলী মোল্লার মৃত্যু হয়। ঠাণ্ডার কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা নিউমোনিয়াসহ শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বরূপকাঠি (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, স্বরূপকাঠিতে গত কয়েকদিন ধরে ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সারাদিন সূর্যের দেখা মিলেনি। কনকনে শীতে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে। শীতে বেশি কষ্ট ভোগ করছে শিশু ও বয়স্করা।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ফজলে ইলাহী স্বপন জানিয়েছেন, প্রচণ্ড শীতে কুড়িগ্রামের জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। কুড়িগ্রামের ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমোরসহ ১৬টি নদ-নদীর ২ শতাধিক চর-দ্বীপচরের ও বাঁধের পাড়ের প্রায় ৮ লাখ দুঃস্থ দরিদ্র মানুষ দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালের শীতজনিত বিভিন্ন রোগে প্রায় অর্ধশত শিশু চিকিত্সাধীন রয়েছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গত দুই সপ্তাহের ঘন কুয়াশা, শৈত্যপ্রবাহ ও কনকনে শীতে গাইবান্ধার মানুষসহ প্রাণীকুলের জীবন কাহিল হয়ে পড়েছে। জনজীবন হয়ে পড়েছে স্থবির। টানা দুই সপ্তাহ ধরে জেলার কোথাও সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। দরিদ্র-অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্রের জন্য হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে। কনকনে শীতের কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, খেটে খাওয়া দিনমজুর, অফিস-আদালতের চাকরিজীবীসহ জনসাধারণ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। দৈনন্দিন কাজকর্মে নেমে এসেছে স্থবিরতা। এদিকে শীতের কারণে জেলায় কোল্ড ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, এ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট ও সর্দিজ্বরসহ বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
ভারতে শীতের দাপট
কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকের অনলাইন সংস্করণের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে শীতের দাপট অব্যাহত রয়েছে। আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর। কলকাতায় শুক্রবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটা স্বাভাবিকের তুলনায় ৪ ডিগ্রি কম। হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর ও উত্তরখন্ডে নতুন করে তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ঘন কুয়াশার কারণে ট্রেন ও বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

