ব্লাড ব্যাংক
ব্লাড ব্যাংকগুলোতে অধিক মুনাফার আশায় রক্তের প্যাকেটে স্যালাইন ও লবণ পানি মিশ্রণ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতি ব্যাগে ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত থাকে। এর মধ্যে ৫৫ ভাগ প্লাজমা (জলীয় অংশ) ও ৪৫ ভাগ সেল (কোষ) থাকে। দেখা গেছে, অসাধু ব্লাড ব্যাংকগুলো অধিক লাভের আশায় রক্ত ও প্যাকেটের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য স্যালাইন বা লবণ মিশ্রিত পানি মেশায়। যদি একটি প্যাকেটে ২২ দশমিক ৫০ মিলিলিটার স্যালাইন বা লবণ পানি মেশানো হয় তাহলে ২২ দশমিক ৫০ মিলিলিটার সেল (কোষ) কমে যাবে। ফলে একদিকে বেশি দামে রক্ত কিনে ক্রেতা যেমন প্রতারিত হবে। রক্তের প্যাকেটে স্যালাইন মিশ্রিত থাকলে রক্তের নির্ধারিত প্লাজমা (জলীয় অংশ), সেল (কোষ) ও রক্তে হিমোগ্লোবিন-এর যে কোন একটির পরিমাণ কমে যাবে। এই রক্ত যার শরীরে প্রবেশ করবে তার জীবন সঙ্কটাপন্ন হবে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, রক্তে কোন কিছু মেশানো হলেই তা মানবদেহের জন্য হয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের কোন রক্ত কাউকে দেয়া হলে তা রোগীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে পড়ে। এজন্যই সরকার কারও রক্ত নেয়ার আগে রক্তের ৫টি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক (ম্যান্ডেটরি) করে দিয়েছে। রক্ত দাতার রক্ত গ্রহণ করার আগে এইচবিএজি ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাস, এইচসিভি বা ‘হেপাটাইটিস সি’ ভাইরাস, ‘এইচআইভি’ এইডস, সিফিলিস বা কোন যৌন রোগ ও ম্যালেরিয়াল প্যারাসাইটের জীবাণু আছে কিনা তা পরীক্ষা করতে হয়। রক্তের গ্রুপিং (এবিও) ও ক্রস ম্যাচিংও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রক্ত দাতা শেষ কবে রক্ত দিয়েছেন সেই বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা হয়।

থেকে ৩৫০০
স্ক্রিনিং টেস্টবিহীন জীবাণুবাহী কোন রক্ত যদি গ্রহীতার শরীরে প্রবেশ করে তাহলে অন্যূন দেড় মাস ও অনূর্ধ্ব দেড় বছরের মধ্যে এই রোগের জীবাণু তার শরীরে স্থায়ী হয়ে যাবে এবং রোগী অনুমিতভাবেই সেই রোগ বহন করবে।
রক্ত বিক্রির এ সব প্রতারণার মাধ্যমে অনিরাপদ ও ঝুকিপূর্ন রক্ত সংগ্রহ করে বিক্রি হচ্ছে রোগী ও তার স্বজনদের কাছে। ফলে অনিরাপদ, ঝুঁকিপূর্ণ, স্যালাইন ও লবণ পানি মিশ্রিত রক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ঢুকে যাচ্ছে মুমূর্ষু রোগীর শরীরে। বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। সেই সঙ্গে বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে অনুমোদিত ব্লাড ব্যাংক (বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র) সংখ্যা ৬৯টি। রাজধানীতে এই সংখ্যা ৫০টি। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীতে অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে রক্ত কেনা-বেচায় তাদের প্রতারণা ও অপকৌশল।
রাজধানীর মহাখালীর দি ঢাকা ক্লিনিক অ্যান্ড ব্লাড ব্যাংক, ধানমন্ডির ঢাকা সিটি ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার, মহাখালীর রোগী কল্যাণ ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ডে কেয়ার সেন্টার, মালিবাগের ক্রস ম্যাচ ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার, পুরনো ঢাকার মিটফোর্ড ব্লাড ব্যাংক, চানখাঁরপুল ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড প্যাথলজি, মোহাম্মদপুরের রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংক, গ্রীন রোডের মেডিফেয়ার ব্লাড ব্যাংক, গুলিস্তান ফুলবাড়ীয়ার লাইফ সেভ ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন সেন্টার, চানখাঁরপুল জেনারেল হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে রয়েছে এ সংক্রান্ত অভিযোগ। রক্ত পরিসঞ্চালন ও সরবরাহের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানেরই নেই প্রয়োজনীয় লোকবল, অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। তাদের পেশাদার রক্তদাতার মধ্যে রয়েছে মাদকাসক্ত নারী-পুরুষ, যৌনকর্মী, ফুটপাতে বাস করা ছিন্নমূল মানুষ। এদের বেশির ভাগই অসুস্থ ও ভয়ঙ্কর জটিল রোগের জীবাণু বহনকারী।
সমপ্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ আদালত ধানমন্ডির শংকর প্লাজা এলাকার সিটি ব্লাড ব্যাংক, লেক সার্কাস কলাবাগানের ক্রস ম্যাচ ব্লাড ব্যাংক, মোহাম্মদপুর রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংক, মহাখালীর রোগী কল্যাণ ব্লাড ব্যাংক ও ডে কেয়ার সেন্টারে অভিযান চালায়। সেখানে স্যালাইন মিশ্রিত রক্তের প্যাকেট জব্দ করে প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও জরিমানা করে প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেয়।
বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি প্যাক (৪৫০ মিলিলিটার) রক্তের জন্য পেশাদার রক্ত দাতাকে দেয়া হয় সর্বনিম্ন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। ব্লাড ব্যাংক সংশ্লিষ্ট টেকনোলজিস্টরা জানিয়েছেন, এক প্যাকেট রক্ত সংগ্রহ করলে সংগৃহীত রক্তের খালি প্যাকেট (বিভিন্ন মেয়াদের), স্লাইডিং, সিরিঞ্জ ও সংরক্ষণসহ খরচ হয় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। ব্লাড ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ক্লিনিক ও সরকারি, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে রক্তের গ্রুপভেদে প্রতি প্যাক রক্ত সরবরাহ করে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। একই রক্ত রোগীর কাছে গ্রুপ ভেদে বিক্রি হয় ১০০০ থেকে ৩৫০০ টাকায়।
content aggregation:healthPrior21
source:ekusheynews24

