শেরপুর জেলা সদরে ধানের কুঁড়া থেকে উৎপাদিত ভোজ্যতেল এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাজারজাত করা হচ্ছে। স্পন্দন অয়েল মিল নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই তেল উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। এর ব্র্যান্ড নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্পন্দন’। এই তেল স্বাস্থ্যসম্মত ও কোলেস্টেরলমুক্ত দাবি করেছেন উদ্যোক্তারা।
উদ্যোক্তারা জানান, ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে তাঁরা এই তেল কারখানা স্থাপন করেছেন। এতে তেল উৎপাদনের জন্য প্রতিদিন দেড় শ মেট্রিক টন ধানের কুঁড়া প্রয়োজন হয়, যা থেকে ২৫ মেট্রিক টন তেল উৎপাদিত হচ্ছে। তাঁদের মতে, এটি দেশের দ্বিতীয় ভোজ্যতেল উৎপাদন কারখানা এবং শেরপুর জেলায় এ ধরনের একমাত্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
মিল-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বেশ কয়েকটি রাইস ব্র্যান (ধানের কুঁড়া) অয়েল মিল রয়েছে। সে অনুযায়ী অর্থাৎ সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি দিয়ে বেসিক ব্যাংকের অর্থায়নে শেরপুর জেলা শহরের শেরীপাড়া এলাকায় তিন একর জমির ওপর কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। গত ১ জানুয়ারি থেকে এই কারখানায় উৎপাদিত তেল বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করা হচ্ছে।
স্পন্দন অয়েল মিলের রিফাইনারি ইনচার্জ ভারতীয় নাগরিক শাহিজ পি টি প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে দাবি করেন, ‘এই মিলে উৎকৃষ্ট মানের তেল তৈরি হচ্ছে। এই তেল প্রাকৃতিক ভিটামিন ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ এবং শতভাগ কোলেস্টেরলমুক্ত। এতে ভিটামিন এ, ডি, ই ও ওমেগা ৩ আছে, যা রক্তের এলডিএলের (মন্দ কোলেস্টেরল) মাত্রা কমিয়ে এবং এইচডিএলের (ভালো কোলেস্টেরল) মাত্রা বাড়িয়ে হূদেরাগের ঝুঁকি প্রতিরোধে ভূমিকা পালন করে।’
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, এতে ১৩ জন ভারতীয় নাগরিকসহ প্রায় ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক নিয়োজিত আছেন।
এই কারখানায় ব্যবহূত মোট কাঁচামালের ৯০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
এ ছাড়া উপজাত হিসেবে প্রাপ্ত ক্রুড অয়েল, গাম (আঠাজাতীয় পদার্থ) ও ফ্যাটি এসিড সাবান তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
শেরপুর জেলা শহরের ব্যবসায়ী মো. আলাল উদ্দিন জানান, কিছুদিন আগেও এলাকার ভোক্তারা বিদেশ থেকে আমদানি করা সয়াবিন তেল কিনতেন। কিন্তু এখন তাঁরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই ভোজ্যতেল কিনছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বলে তিনি জানান।
সমপ্রতি সরেজমিনে কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বিশেষজ্ঞ, টেকনিশিয়ান ও শ্রমিকেরা বেশ আগ্রহ নিয়ে তেল উৎপাদনের কাজ করছেন। মিলের গবেষণাগারেও চলছে উৎপাদন-প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ সময় কারখানার সহকারী কেমিস্ট সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে জানান, রাইস ব্র্যান অয়েল বা ধানের কুঁড়ার তেল উৎপাদনে ফসফরিক এসিড, সাইট্রিক এসিড, অ্যাক্টিভেটেড কার্বন, ব্লিচিং আর্থ, কস্টিক সোডা, কমন সল্ট প্রভৃতি রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়।
স্পন্দন অয়েল মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হাসিবুল গণি প্রথম আলোকে বলেন, ধান উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। সে জন্য দেশে যে পরিমাণ ধানের কুঁড়া উৎপাদিত হয়, তার সঠিক ব্যবহার করতে পারলে ভবিষ্যতে বিদেশ থেকে হয়তো আর ভোজ্যতেল আমদানি করতে হবে না। এতে দেশীয় শিল্প বিকাশের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
Source: The Daily Prothom Alo

