
আলোচিত হাতিরঝিল-বেগুনবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তবে এখনই প্রকল্প এলাকায় যানবাহন চলবে না।
লেকের গুলশান পয়েন্টে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঢাকাবাসীর জন্য এটি নববর্ষের উপহার। আমরা এ উপহার দিতে পেরে আনন্দিত।’
২০০৭ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এই প্রকল্প নেয়। রাজউকের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন এটি বাস্তবায়ন করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেশীয় পরামর্শকদের তৈরি করা নকশা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে। প্রকল্পটি যানজট নিরসনে সহায়তার পাশাপাশি বিনোদনের সুযোগ করে দেবে—এ প্রত্যাশায় রাজধানীবাসীর মধ্যে এ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।
প্রকল্প উদ্বোধন উপলক্ষে ঝিল ও খালের দুই পাড় ও সড়কগুলো সাজানো হয় ফুলের টব ও নানা রঙের পতাকা দিয়ে। একটি স্থানে একদল বাদক ঢোল বাজাচ্ছিলেন। প্রকল্পের নাম হাতিরঝিল বলে কয়েকটি হাতিও আনা হয় খালপাড়ের সড়কে। প্রসঙ্গত, হাতিরঝিলসহ তেজগাঁও এলাকায় ভাওয়ালের রাজার এস্টেটের অনেক ভূসম্পত্তি ছিল। এস্টেটের হাতির পাল এখানকার ঝিলে স্নান করতে বা পানি খেতে বিচরণ করত বলে কালক্রমে এর নাম হাতিরঝিল হয়।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানান। ঢাকায় পূর্ব-পশ্চিমে যোগাযোগের সড়ক কম—এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাতিরঝিল প্রকল্প সে ঘাটতি মেটাবে। এর সুবাদে যানজটও কমবে। প্রকল্পটি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন সময় সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছে। সেটা নিয়ে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। যাঁরা সমালোচনা করেছেন, তাঁদের ধন্যবাদ। তাঁদের কারণেই সরকারের দৃষ্টি সব সময় এদিকে ছিল। ভুলভ্রান্তি সংশোধনের সুযোগ পাওয়া গেছে। তিনি গণমাধ্যমের উদ্দেশে বলেন, ‘সমালোচনা করেন, তবে হতাশা সৃষ্টি করবেন না। কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে যেতে পারে, এমন কিছু করবেন না।’
প্রকল্পস্থলের সৌন্দর্য প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শীতকালে এমনিতেই গাছে পাতা থাকে না, যেসব গাছ লাগানো হয়েছে, সেগুলোতে পাতা গজালে অন্য রকম চেহারা পাবে এই প্রকল্প এলাকা। ঢাকার মানুষের উৎসব-অনুষ্ঠানের স্থান হবে। মানুষ খোলা পরিবেশে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবে।’
প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের রাজউকের ফ্ল্যাট দেওয়ার তাগিদ দেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্ল্যাট নির্মাণের আগেই তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কারণ, ফ্ল্যাট নির্মাণ হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও অনেকে তালিকায় ঢুকে পড়েন। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা তখন কিছু পান না। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নাম আগে ঢোকাতে হবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে রাজধানী ঢাকার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার (এসটিপি) আওতায় ঢাকার চারপাশে নৌপথ, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কমিউটার ট্রেন সার্ভিস, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গপথ ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নির্বিচার জলাশয় ধ্বংস বন্ধে ড্যাপ অনুমোদন ও ২০১৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পরবর্তী ড্যাপ প্রণয়নের কাজ চলছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে প্রথমে প্রকল্পের উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন ও মোনাজাতে অংশ নেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর লেকের পানিতে একঝাঁক হাঁস ছাড়া হয়। এ ছাড়া ছিল নৌকাবাইচের আয়োজন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, স্থানীয় সাংসদ এ কে এম রহমতউল্লাহ, সাংসদ আসাদুজ্জামান খান, রাজউকের চেয়ারম্যান নূরুল হুদা, প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ বক্তৃতা করেন। সভাপতিত্ব করেন গণপূর্তসচিব শওকত হোসেন। মঞ্চে এ সময় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারেক আহমদ সিদ্দিকী ও সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়াও উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে দুটি ‘ইউ’ আকৃতির লুপ সংযোজন করা হয়েছিল। এর নির্মাণকাজ এখনো চলছে। এ ছাড়া বিনোদনের জন্য উদ্যাপন স্থান, ওয়াটার কোর্ট, পানিতে চলাচলের ট্যাক্সি টার্মিনাল ও অ্যাম্ফিথিয়েটারসহ আরও বেশ কিছু কাজ করার কথা রয়েছে। সেগুলো পরে সম্পন্ন করা হবে বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
পদ্মা সেতুর নকশা করুন: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) নকশা প্রণয়ন, কারিগরি পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে এই প্রকল্পে যাঁরা সহযোগিতা করেছেন তাঁদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা এ প্রকল্প বাস্তবায়নে যেভাবে সহায়তা করেছেন, সেটা অভূতপূর্ব। আপনারা পদ্মা সেতুর নকশা করুন। আপনারাই পদ্মা সেতু করতে পারবেন।’
প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদ বলেন, ‘সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনের জনবল-সংকট আছে। জনবল দেওয়া হলে চার-পাঁচটা পদ্মা সেতু করতে পারব।’
উৎসাহীদের ভিড়: জনসাধারণের জন্য প্রকল্প এলাকা উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেখানে ভিড় করে। সীমিত হলেও যানবাহন চলাচল শুরু হয়। সন্ধ্যার পর ভিড় বেড়ে যায়। রাতে এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, এফডিসির গেটের কাছে টঙ্গী ডাইভারশন সড়কে প্রকল্পের প্রবেশমুখে ব্যাপক যানজট। গুলশানে আড়ংয়ের কাছের প্রবেশমুখেও যানজট দেখা যায়। একপর্যায়ে রাতে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। সকালে যে স্থানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেখানে রাতে কনসার্ট চলে।
প্রকল্প এলাকায় অনেক মানুষ সপরিবারে বেড়াতে যান। বাড্ডার বাসিন্দা নূরে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পত্রপত্রিকায় ও টেলিভিশনে হাতিরঝিল প্রকল্পের খবর ও ছবি দেখে বেড়াতে ইচ্ছে হয়েছিল। তাই সপরিবারে দেখতে এসেছি।’
প্রকল্পের বর্ণনা: প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে ৩০২ একর জমির ওপর। এতে মোট খরচ হয়েছে এক হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণে এক হাজার ৪৮ কোটি ও বাকি টাকা নির্মাণকাজে খরচ হয়।
বৃষ্টির পানি ও পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে রাজধানীর একটি বড় অংশের জলাবদ্ধতা দূর করা, বৃষ্টি ও বন্যাজনিত পানি ধারণ, নগরের নান্দনিক সৌন্দর্য বাড়ানো, রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থাসহ সার্বিক পরিবেশের উন্নয়ন করাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য। হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ী খালের সঙ্গে বনানী ও গুলশান লেকের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিকে ঘিরে একটি আধুনিক পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে বলে জানানো হয়েছে।
যানবাহন চলাচলের জন্য প্রকল্পে চারটি সেতু, চারটি উড়াল-সড়ক, প্রায় ১৭ কিলোমিটার সড়ক, ২৬০ মিটার ভায়াডাক্ট (সেতুপথ) এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার হাঁটার পথ নির্মাণ করা হয়েছে। গাড়িতে এ এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য এফডিসির পাশের মোড়ে, মগবাজার রেলক্রসিং ও রামপুরা সেতুর কাছে তিনটি পথ রয়েছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটি চালু হওয়ার ফলে ঢাকার যানজট কমবে।
content aggregation:healthPrior21
source:prothom-alo
http://www.24livenewspaper.com/site/index.php?url=www.prothom-alo.com

