চিকিৎসক-সেবিকারা ছোটাছুটি করছেন। রোগী আসছে, যাচ্ছে। বেশির ভাগই গরিব। হাতে টাকা নেই। তাই বলে চিকিৎসা থেমে নেই তাদের। নিখরচায় চিকিৎসা শেষে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে টাকা ছাড়াই। যারা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, তাদের জন্য রয়েছে হাসপাতালের ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম। সেই দলের সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বৃদ্ধদের চিকিৎসা দেন। হাসপাতালটি ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে।
এটি পাড়াগাঁয়ের একটি হাসপাতালের চিত্র। চার কক্ষের হাসপাতালের আধপাকা ভবনটি খুলনার ফুলতলা উপজেলার পায়গ্রামকসবা গ্রামে অবস্থিত। কাগজে-কলমে এটি নাইফা মারুফ হাসপাতাল। কিন্তু এলাকায় এটি ‘গরিবের হাসপাতাল’ নামে পরিচিত।
যেভাবে শুরু: হাসপাতালটির স্বপ্নদ্রষ্টা মারুফ উল ইসলাম। মেয়ের স্মৃতি রক্ষার্থে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় কিডনিজনিত সমস্যায় মেয়েটা মারা যায়। ২০০৪ সালের কথা। মেয়েটার নাম ছিল নাইফা মারুফ। মেয়ের মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েন মারুফ উল ইসলাম। পণ করেন, গ্রামেই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করবেন। সে চিন্তা থেকেই ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যাত্রা শুরু হয় নাইফা মারুফ হাসপাতালের।
যেভাবে দেওয়া হয় চিকিৎসা: একজন চিকিৎসক ও দুজন সেবিকা ২৪ ঘণ্টাই হাসপাতালে থাকেন। চারটি বিভাগ রয়েছে এখানে—জরুরি, মেডিসিন, গাইনি ও শিশু। প্রতি দিন গড়ে ১০০-১২০ জন রোগী আসে। প্রত্যেক রোগীকে দেওয়া হয় বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধপত্র।
চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পাঁচজন সহকারী চিকিৎসক ও ছয়জন সেবিকা আছেন এখানে। প্রতি শুক্রবার একজন মেডিসিন ও একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ, শনিবার একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ এবং সোমবার একজন শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগী দেখেন। সপ্তাহের অন্যান্য দিন রোগী দেখেন সহকারী চিকিৎসকেরা। একজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম দেখভাল করেন। এলাকায় যারা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, তাদের জন্য রয়েছে হাসপাতালের ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম (এমএমটি)। প্রতি শুক্র ও রোববার ওই দলের একজন চিকিৎসক ও একজন সেবিকা রোগীর বাড়ি হেঁটে গিয়ে চিকিৎসা দেন। চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হাসপাতালটির রয়েছে ২০ সদস্যের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল।
বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সহায়তায় প্রতিবছর দুবার হাসপাতালের চত্বরে স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক সমাবেশ করা হয়। সর্বশেষ এই সভা হয় গত ৩০ মার্চ। সেখানে সাতজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ৬৫৪ জন রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেন।
রোগীদের অনুভূতি: ভৈরব নদ পার হয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের যশোরের অভয়নগরের শুভরাড়া গ্রাম থেকে চিকিৎসার জন্য এসেছেন লাইলী বেগম (৭৬)। তিনি বলেন, ‘আমার বুক ধড়ফড় করে, মাথা ঘুরে। গ্যাসেরও সমস্যা আছে। এখানে বড় ডাক্তার রোগী দেখে। কোনো টাকা লাগে না। ওষুধও ফ্রি পাই।’
ওষুধ ও ব্যবস্থাপত্র হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন অভয়নগরের ভূগিলহাট গ্রামের ফুলজান বেগম (৭৫)। তিনি বলেন, ‘আমার হাতের খোসা উঠছে। হাত ফেটে যাচ্ছে। গায়ের মধ্যে সব সময় কামড়ায়। ডাক্তার দেখে ওষুধ দিছে। ডাক্তারের ফি ও ওষুধের দাম লাগে নাই।’
বর্তমান অবস্থা: ৫০ শতাংশ জমির ওপর হাসপাতালটি গড়ে তোলা হয়। ১৭ জন চিকিৎসক, সেবিকা ও কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন এখানে। প্রতি মাসে গড়ে ব্যয় হয় আড়াই লাখ টাকা। এর মধ্যে ওষুধ কেনা বাবদ খরচ প্রায় দেড় লাখ টাকা। বাকি এক লাখ টাকা চিকিৎসকদের সম্মানি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ খরচ হয়। হাসপাতালটি সম্প্রসারণের জন্য পাশেই সম্প্রতি এক একর ৫১ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। নাইফা মারুফ ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে।
সরেজমিনে একদিন: হাসপাতালের সামনেই জলপাইগাছের নিচে সিমেন্ট-বালুর তৈরি বেঞ্চে বসে আছে রোগীরা। সেখান থেকে উঠে একজন করে রোগী নাম লেখাচ্ছে। প্রথম কক্ষে রোগী দেখছেন সহকারী চিকিৎসক ও হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সরদার ওয়াহিদুর রহমান। তাঁর পেছনে আলমারিতে থরে থরে সাজানো রয়েছে ওষুধ। পাশের কক্ষটি কার্যালয়। সেখানে রোগীদের নাম, ঠিকানা ও রোগের নাম কম্পিউটারে লেখা হচ্ছে। এরপর জরুরি বিভাগ। সর্বশেষ কক্ষটিতে রোগী দেখছেন শিশু বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আবু জাফর।
সবাই যা বলেন: প্রথমে ১০০ শয্যার হাসপাতাল। পর্যায়ক্রমে তা ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। ভবিষ্যতে এখানে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হবে বলে জানালেন হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক মারুফ উল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) দারফুর অপারেশনপ্রধান হিসেবে বিশ্বের অনেক দেশ ভ্রমণের সুযোগ আমার হয়েছে। সব জায়গায় দেখেছি, সব থেকে পিছিয়ে আছে স্বাস্থ্যসেবা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের মধ্যে এ সমস্যা প্রকট। এলাকার মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং হতদরিদ্র মানুষের মধ্যে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য হাসপাতালটি গড়ে তোলা হয়েছে। দুই বছরে প্রায় এক লাখ গরিব মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে।’
আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সরদার ওয়াহিদুর রহমান জানান, এখানে মূলত গরিব রোগীদের সেবা দেওয়া হয়। গরিবদের সেবা দিয়ে মনে একটা আনন্দ পাওয়া যায়। ভালো লাগে। এর অনুভূতিই আলাদা। টাকা দিয়ে এ অনুভূতি কেনা যাবে না।
শিশু বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ আল জাফর বলেন, ‘কিছুটা পেটের টান আছে, এটা সত্য। সে জন্য সামান্য সম্মানি নিই। কিন্তু অজপাড়াগাঁয়ের এ হাসপাতালে খুলনা থেকে রোগী দেখতে ছুটে আসার মধ্যে রয়েছে প্রাণের টান। স্বাস্থ্যসেবায় হাসপাতালটি অসম্ভব রকমের ভালো কাজ করছে।’
ফুলতলা ইউপির চেয়ারম্যান শেখ আবুল বাশার জানান, নাইফা মারুফ হাসপাতাল সমাজসেবামূলক কাজ করছে। এটি ইতিমধ্যে এলাকার গরিব মানুষের কল্যাণে কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
Source: The Daily Prothom Alo

