ক্যানসারের কোষগুলো চিকিৎসকদের জন্য এক বিশেষ সমস্যার সৃষ্টি করে। কেননা এগুলো সুস্থ কোষগুলোর মতই দেখতে। সুস্থ কোষের মতই ক্রমানুসারে থাকে এগুলো। তাই এগুলোকে শনাক্ত করা সহজ নয়। মানব শরীরের জন্য প্রয়োজন বিলিয়ন বিলিয়ন তাজা সেল বা কোষ। স্টেমসেলগুলো অগ্রগামী সেল তৈরি করে, যা অবিশ্বাস্য দ্রুত গতিতে বিভক্ত হয়। এই সময় তারা শরীরের বিশেষ বিশেষ সেলে পরিণত হওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকে। যেমন কেশ, ত্বক বা অন্ত্রের জন্য। দ্রুত বিভক্ত হওয়া অগ্রগামী কোষগুলো টিউমার সেলও তৈরি করে। কেমোথেরাপির মাধ্যমে দ্রুত বিভক্ত হওয়া সেলগুলোকে আয়ত্তে আনার চেষ্টা করা হয়। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হল, এই থেরাপিতে শুধু অসুস্থ কোষ নয়, সুস্থ কোষগুলোও মরে যায়। রোগীর চুল পড়ে যায়, ডায়রিয়া ও রক্তাল্পতায় ভোগেন তাঁরা। তবে দ্রুত বিভক্ত হয় না বলে কেমোথেরাপি দিলেও স্টেমসেলগুলো বিনষ্ট হয় না। তাই থেরাপি বন্ধ হলে রোগীর মাথায় আবার চুল গজায়, রক্তাল্পতাও দূর হয়। সমস্যা হল ক্যানসারেরও নিজস্ব স্টেমসেল রয়েছে। সেগুলোও সুস্থ সেলের মত কেমোথেরাপির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারে। এ গুলো চাঙা হয়ে উঠলে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সারা শরীরে চলে যায় এবং বিভিন্ন জায়গায় মেটাস্ট্যাসিস তৈরি করে। ক্যানসার জয় করতে হলে ক্যানসারের স্টেমসেলকে ধ্বংস করতে হবে। এজন্য কয়েকটি পদ্ধতির কথা চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। যেমন ক্যানসারের স্টেমসেলগুলোকে প্রথমে চাঙা করে তারপর কেমোথেরাপি দিয়ে ধ্বংস করা। আরেক পদ্ধতি হোল, ক্যানসারের স্টেম সেলকে অকেজো করে দেয়া। এই সেলগুলো বিশেষ ধরনের পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভরশীল। টিস্যু সেলের সঙ্গে এক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলো জেগে ওঠে। অ্যান্টিবডির সাহায্যে এই মিথস্ক্রিয়া বন্ধ করে দেয়া যায়। এর ফলে ক্যানসারের স্টেমসেলগুলো সাধারণ ক্যানসারের সেলে পরিণত হয়, যেগুলো কম বিপজ্জনক। কেমোথেরাপি দিয়ে সহজে আয়ত্তে আনা যায় এই সেলগুলোকে। ক্যানসার দমনে আরেকটি পদ্ধতি হলো, শরীরের প্রতিরোধ বা ইমিউন শক্তিকে এমনভাবে উজ্জীবিত করা, যাতে তা ক্যানসারের সেলকে দমন করতে পারে। এই কাজটা হাতে নিতে পারে তথাকথিত টি-সেল। এই টি-সেলগুলো টিউমারের প্রোটিনকে চিনতে পারে এবং ধ্বংসও করতে পারে। ক্যানসার রোগীদের ইমিউন সিস্টেম তেমন শক্তিশালী নয় বলে টি-সেলকে উজ্জীবিত করা হয়। তবে টিউমার সেলগুলো আত্মরক্ষার কৌশল খুঁজতে চেষ্টা করে, চেষ্টা করে টি-সেলকে পাশ কাটাতে। কিংবা ধারণ করে ছদ্মবেশ। এর ফলে এই মারাত্মক কোষগুলোকে চেনা সহজ হয় না। গবেষকরাও পিছিয়ে নেই। তাঁরা টি-সেলকে জিনগত দিক দিয়ে এমনভবে পরিবর্তন করাতে পেরেছেন, যাতে ছদ্মবেশ সত্ত্বেও ক্যানসার সেলগুলোকে এই পরিবর্তিত টি-সেলগুলো চিনতে পারে। ইমিউন থেরাপির আর একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। টি-সেলগুলো একবার টিউমার সেলের সংস্পর্শে এলে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে চেনের মত একটা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শুধু একবার নয়, পেছনে থাকা টিউমার সেলগুলোকেও ধ্বংস করতে পারে এগুলো। এই প্রক্রিয়ার সময় টি-সেলগুলো ‘ডটার সেল’ বা ‘অপত্য কোষ’ সৃষ্টি করে, যেগুলো আবার নিজের নিজের জায়গায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। গবেষকদের ধারণা, কেমোথেরাপি ও ইমিউন থেরাপি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। কেমোথেরাপিকে আরো কার্যকরী করে তুলতে আর একটা কাজ করা যায়। আর তা হলো, কেমোর বিষাক্ত মলিকিউলকে বিশেষ অ্যান্টিবডির সঙ্গে যুক্ত করে টিউমার সেলকে আক্রমণ করা। রোগীদের জন্য এই চিকিৎ্সা তেমন কষ্টকর নয়। কেননা এই পদ্ধতিতে দেয়া কেমোথেরাপি শুধু টিউমারকে আক্রমণ করে। সুস্থ সেলগুলো আক্রান্ত হয় না। সূত্র : ডয়েচে ভেলে

