বাংলাদেশের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণের গুঁড়া হলুদে মাত্রাতিরিক্ত সিসা থাকার প্রমাণ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মান নিয়ন্ত্র্রণকারী প্রতিষ্ঠান খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)।
এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণের গুঁড়া হলুদের চার পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে সে দেশের বাজার থেকে পণ্যটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে এফডিএ। সংস্থাটি বলছে, গুঁড়া হলুদে থাকা উচ্চমাত্রার সিসা নবজাতক, কম বয়সী শিশু ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সিসা শরীরে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সঞ্চিত থাকতে পারে। এর পরিমাণ বেড়ে গেলে স্বাস্থ্যগত সমস্যা বিশেষ করে মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
গুঁড়া মসলায় এত বেশি মাত্রায় সিসা থাকার বিষয়ে প্রাণের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছে দেশে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআই। এর একটি জবাবও দিয়েছে প্রাণ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে গুঁড়া হলুদ প্রত্যাহার করে নেওয়া শুরু হলেও দেশের বাজার থেকে এ হলুদ প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আমরা পণ্য উৎপাদন করি। যুক্তরাষ্ট্রে সিসা পাওয়ার অভিযোগ ওঠার পরও আমরা হলুদ পরীক্ষা করিয়েছি। তাতেও সিসা পাওয়া যায়নি। তাই দেশের বাজার থেকে গুঁড়া হলুদ তুলে নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না।’
যোগাযোগ করা হলে দেশে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সার্টিফিকেশন মার্ক-সিএম) কমল প্রসাদ দাস প্রথম আলোকে বলেন, বাজার থেকে প্রাণের গুঁড়া হলুদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। তাতে মাত্রাতিরিক্ত সিসা কিংবা ভারী ধাতব পদার্থ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলের মতো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক ভোক্তার অসুস্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে প্রাণের গুঁড়া হলুদে ক্ষতিকর মাত্রায় সিসা থাকার বিষয়টি নজরে আসে এফডিআইয়ের। সংস্থাটি এরপর দেশটির বিভিন্ন রাজ্য থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। নিউইয়র্কে এফডিএ ও বেসরকারি পরীক্ষাগারে পরীক্ষার পর তাতে ক্ষতিকর মাত্রায় সিসা পাওয়া যায়।
এফডিএ বলছে, ১৭ অক্টোবর প্রাণের ৪০০ গ্রামের গুঁড়া হলুদের প্যাকেটে ৪৮ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) মাত্রায় সিসা পাওয়া যায়। এর আগে ৮ অক্টোবর ৪০০ গ্রামের প্যাকেটে ৪২ পিপিএম ও ১৫ অক্টোবর একই ওজনের প্যাকেটে ৫৩ পিপিএম এবং ৩ অক্টোবর ২৫০ গ্রামের প্যাকেটে ৪২ পিপিএম এবং ৮ অক্টোবর একই ওজনের প্লাস্টিক জারের গুঁড়া হলুদে ২৮ পিপিএম সিসার উপস্থিতি ধরা পড়ে।
উচ্চমাত্রায় সিসার উপস্থিতির কারণে গত বৃহস্পতিবার ডালাসভিত্তিক পরিবেশক ফাহমান এন্টারপ্রাইজেস ইনকরপোরেশন প্রাণের গুঁড়া হলুদ বাজার থেকে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এর আগে ১৫ অক্টোবর মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েটভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বেস্ট ভ্যালু ইনকরপোরেশন, ৮ অক্টোবর নিউইয়র্কভিত্তিক এশিয়া ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি ইনকরপোরেশন ও ৩ অক্টোবর ব্রুকলিনভিত্তিক অন টাইম ডিস্ট্রিবিউশন ইনকরপোরেশন একই ঘোষণা দেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নয়টি অঙ্গরাজ্যে প্রাণের গুঁড়া হলুদ বাজারজাত করে আসছে।
গুঁড়া মসলায় সর্বোচ্চ কত মাত্রায় সিসা থাকবে সে বিষয়ে এফডিএর স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। তবে বিএসটিআইয়ের পরিচালক কমল প্রসাদ দাস বলেন, দেশের গুঁড়া হলুদে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ পিপিএম মাত্রায় সিসা ব্যবহার করা যায়।
প্রাণের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘আমরা প্রতিটি চালান পাঠানোর আগে ভালোভাবে যাচাই করে দেখি। তা ছাড়া এফডিএর ছাড়পত্র ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কোনো পণ্য বিক্রি হয় না। এখন এফডিএ বলছে, আমাদের হলুদে মাত্রাতিরিক্ত সিসা পাওয়া গেছে।’ তিনি জানান, এফডিএর কাছে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও কিছু নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার অনুরোধও করা হয়েছে।
ভোক্তাদের উদ্দেশ করে প্রচারিত এফডিএর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যার কাছে প্রাণের যত গুঁড়া হলুদ রয়েছে, সেগুলো যে দোকান থেকে কেনা হয়েছে সেখানে ফেরত দিয়েছে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ওই সব পণ্য কিনতে যত ডলার খরচ হয়েছিল, তা ভোক্তাদের ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে এফডিএ।
প্রাণের খাদ্যপণ্য নিয়ে আলোচনা এবারই প্রথম নয়। যথাযথ গুণগত মান অনুসরণ না করে পণ্য উৎপাদন করায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রাণের আট ধরনের ফ্রুট ড্রিংকসের সার্টিফিকেশন মার্কস (সিএম) লাইসেন্স বাতিল করে বিএসটিআই। এ ছাড়া গত জুনে কাঁচা আমে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিন মেশাতে গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রাণের দুই কর্মকর্তাকে দণ্ডিত করেন। সে সময় প্রাণের কেনা এক লাখ ৯০ হাজার টন আমও ধ্বংস করেন আদালত।
বিএসটিআইয়ের চিঠি ও প্রাণের জবাব: যুক্তরাষ্ট্রে গুঁড়া মসলায় মাত্রাতিরিক্ত সিসা থাকার বিষয়ে প্রাণের ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে এরই মধ্যে চিঠি দিয়েছে বিএসটিআই। গতকাল সোমবার বিএসটিআইয়ের চিঠির জবাব দিয়ে প্রাণ বলেছে, প্রাণের গুঁড়া হলুদ বিএসটিআই, বিসিএসআইএরসহ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্প্রতি পরীক্ষা করানো হয়েছে। কোনো পরীক্ষাতেই প্রাণের গুঁড়া হলুদে ক্ষতিকর মাত্রায় সিসা বা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি। সে কারণে প্রাণের গুঁড়া মসলা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মানসম্পন্ন। বিএসটিআই যেন স্থানীয় বাজার থেকে গুঁড়া হলুদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে সে অনুরোধ জানানো হয়েছে প্রাণের চিঠিতে।
সূত্র - প্রথম আলো

