ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে সঠিক ও পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পায় না রোগীরা। সম্পদের অপ্রতুলতার কথা বলে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া অযৌক্তিক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ঢাকা মেডিকেলের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এখনো অটুট আছে।
‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: সুশাসনের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণায় টিআইবি দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এসব কথা বলেছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, সেবা পাওয়ার জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে নানা পর্যায়ের কর্মীদের অর্থ দিতে হয়। শয্যা (১০০-৩০০ টাকা), নবজাতকের খোঁজ (৫০-৩০০ টাকা) নবজাতক বাড়ি নেওয়া (১০০-১০০০), ট্রলি (৫০-২০০) রোগী স্থানান্তর (৫০-১০০), দ্রুত রক্ত পরীক্ষা (৫০-৩০০), দ্রুত এক্স-রে (১০০-৩০০), সারি ভেঙে এমআরআই করাতে (৫০০-১০০০), ক্যাথেটার পরাতে (৫০-১০০), গেট পাস পেতে (২০ টাকা) অর্থ নেওয়া হয়।
টিআইবি ২০০৬ সালে ঢাকা মেডিকেলের সুশাসন নিয়ে গবেষণা করেছিল। বর্তমান গবেষণার উদ্দেশ্য এই প্রতিষ্ঠানে সুশাসনের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা এবং সমস্যা উত্তরণের সুপারিশ করা। গবেষণার জন্য এপ্রিল ২০১০ থেকে আগস্ট ২০১৩ পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু চিকিৎসক ঠিক সময়ে হাসপাতালে আসেন না, রোগীকে ব্যক্তিগত চেম্বারে যেতে ও নির্দিষ্ট স্থানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বলেন। জরুরি প্রয়োজনে আয়া বা নার্সদের পান না রোগীরা। হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় অবকাঠামো কম, জনবল অপ্রতুল। টিআইবি বলছে, দেশের এই সেরা চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ঢাকা মেডিকেল যে বহুমাত্রিক সেবা দেয়, দেশের আর কোনো হাসপাতাল তা দিতে পারে না। তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে যে দুর্নীতি আছে তার সুবিধাভোগী আমলা, চিকিৎসক ও কর্মচারীদের একটি অংশ।
শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নাজমুন নাহার ২৪ বছর ঢাকা মেডিকেলে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, জরুরি চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে ঢাকা মেডিকেল অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
বার্ন ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন বলেন, মানুষ মনে করে কোনো হাসপাতালে সেবা না পেলেও ঢাকা মেডিকেলে তা পাওয়া যাবে। হাসপাতালের পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কোনো রোগীকে আমরা বিমুখ করি না। এটা ঢাকা মেডিকেলের বড় শক্তি।’ তিনি বলেন, বরাদ্দ করা শয্যার চেয়ে বেশি রোগী এখানে ভর্তি থাকে। রোগীদের ৯৮ শতাংশ ওষুধ হাসপাতাল থেকে সরবরাহ করা হয়। ১০০ শতাংশ রোগী খাবার পায়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ বলেন, ঢাকা মেডিকেলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে অনিয়ম যৌক্তিক হতে পারে না।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক সাংবাদিক বলেন, টিআইবির গবেষণায় অনিয়মের যে চিত্র ফুটে উঠেছে বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও খারাপ। যন্ত্রপাতি ও ওষুধ কেনার অনিয়ম এতে নেই। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসকদের পদায়ন ও পদোন্নতিতে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের বিষয়টিও গবেষণায় উঠে আসেনি।
সূত্র - প্রথম আলো

