শেফালি বেগম পরিবার নিয়ে থাকেন রাজধানীর পরীবাগের ফুটপাতে। দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ফুটপাতের খুপরি ঘরে থাকেন। হাতিরপুল এলাকার কয়েকটি বাড়িতে তিনি ঘর ধোয়ামোছার কাজ করেন। তাঁর স্বামী যেন থেকেও নেই। দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা থেকে ঢাকায় আসার পর তাঁর স্বামী আরেকটি বিয়ে করেন। দুই বছর আগে এক মেয়ে রুপালি বেগমকে ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সে বিয়ে দেন। বিয়ের এক বছর পর রুপালি মায়ের খুপরি ঘরে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই মা হওয়ায় অপুষ্টির শিকার হয় রুপালি। এতে সে ও তার সন্তান দুজনেরই জীবনসংশয় দেখা দেয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসা শেষে রুপালির সন্তান মারা যায়। চিকিৎসক জানান, অপুষ্ট রুপালি অপুষ্ট শিশুর জন্ম দিয়েছে। আর অপুষ্টির কারণে তার শিশুটি মারা গেছে।
আমাদের দেশে প্রতিবছর শুধু অপুষ্টির কারণে অনেক শিশু মারা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মা অপুষ্টিতে ভোগার কারণে শিশুও অপুষ্টিতে ভোগে। বিশেষজ্ঞরা জানান, অজ্ঞতা, অসচেতনতা, দারিদ্র্যসহ নানা কারণে শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) তথ্যমতে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৪২ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছে।
যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল-এ (২০০৯) বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ শিশু ও ৪০ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। এ ছাড়া সন্তানদানে সক্ষম তিনজন নারীর একজন অপুষ্টির শিকার।
আইসিডিডিআরবির পুষ্টি বিভাগের পরিচালক তাহমিদ আহমেদ জানান, অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কিশোরীদের পুষ্টি-পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। অপুষ্টির শিকার কিশোরী মা হলে সে একটি অপুষ্ট শিশুরই জন্ম দেবে। তিনি আরও জানান, আমাদের দেশে শতকরা ৩০ ভাগ মা অপুষ্টিতে ভুগছেন। এ ছাড়া অনেক কিশোরীর ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়। এতে তাদের অপুষ্ট সন্তান জন্মদানের আশঙ্কা বেশি থাকে। অপুষ্টির শিকার মায়ের নানা জটিলতা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে অপুষ্টির শিকার মায়েরা কম ওজনের শিশু অর্থাৎ আড়াই কেজি ওজনের নিচে শিশুর জন্ম দেন। এই শিশুদের পরবর্তী সময়ে অপুষ্টিতে মৃত্যুর আশঙ্কা বেশি থাকে। তাহমিদ জানান, তবে অপুষ্টিতে শিশুমৃত্যু অনেক কমেছে এবং এতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় ভালো করেছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, অপুষ্টির শিকার মা কম ওজনের সন্তান জন্ম দেন। ওই সন্তান পরে খর্বকায় হয়, তার মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এই পরিস্থিতি কিশোরী বয়সেও অব্যাহত থাকে। কিশোরী মা হলে গর্ভাবস্থায় তার ওজন তেমন বাড়ে না। সেও আরেকটি অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয়। শিশুটি কন্যাসন্তান হলে অপুষ্টির চক্র আর শেষ হয় না। এর সঙ্গে বিভিন্ন বয়সে পর্যাপ্ত খাদ্য, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য পরিচর্যা না পেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। একপর্যায়ে শিশু মারা যেতে পারে।
ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল ও বিশ্বব্যাংকের সিজনাল হাঙ্গার অ্যান্ড পাবলিক পলিসিস বইয়ে বলা হয়েছে, মৌসুমি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা শিশু অপুষ্টির একটি কারণ। বিশ্বব্যাংকের বইটিতে ১৩টি দেশের তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, এসব দেশের দারিদ্র্য ও ক্ষুধার সঙ্গে শিশু অপুষ্টি, শিশুর কম ওজন ও শিশুমৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে।
দেশগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। বইটির অন্যতম লেখক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, দরিদ্র পরিবারে খাদ্য বিতরণে শিশুরা বৈষম্যের শিকার হয়। তবে মৌসুমি ক্ষুধা বা মঙ্গার কারণে শিশুর পুষ্টি বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
বাংলাদেশে ৩০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের মধ্যে ১৮ শতাংশ মানুষ বাস করে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল বলছে, তারা দৈনিক এক হাজার ৮০৫ কিলো ক্যালরির কম খাবার পায়।
অর্থনীতিবিদ ও পুষ্টিবিদেরা বলছেন, সারা বছর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অপুষ্টি দূর হবে না। আর অপুষ্টিতে শিশুর মৃত্যুও কমবে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশের পুষ্টি নিয়ে সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। অনেক সময় অপুষ্টি দূর করতে সরকার যেসব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তা বিভিন্ন কারণে সফল হচ্ছে না। পুষ্টি কার্যক্রম সফল করতে তাই পুষ্টিনীতি ও কর্মসূচি ঢেলে সাজাতে হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইউএসএআইডির গবেষণায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, অপুষ্টির সমস্যা সমাধান করা না গেলে ২০১৫ সালের মধ্যে অতিদরিদ্র ও ক্ষুধা নিরসন, সবার জন্য শিক্ষা, শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা, এইচআইভি বা এইডস, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণের যে লক্ষ্যমাত্রা আছে, তা পূরণ করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও জনমিতি জরিপ, ২০১১ (বিডিএইচএস) অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪১ শতাংশ শিশু বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম বা খর্বাকৃতির , ১৬ শতাংশ শিশু উচ্চতার তুলনায় রুগ্ণ ও বয়সের তুলনায় ওজন কম ৩৬ শতাংশ শিশুর। বিডিএইচএসের ২০০৭ সালের প্রতিবেদনে খর্বাকৃতির শিশুর হার ছিল ৪৩ শতাংশ, উচ্চতার তুলনায় রুগ্ণ শিশু ১৮ শতাংশ ও বয়সের তুলনায় ওজন কম—এমন শিশুর হার ছিল ৪১ শতাংশ।
১৯৯৬-৯৭ থেকে ১৯৯৯-২০০০ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০ শতাংশ হারে অপুষ্টি কমেছে, কিন্তু ২০০০-২০০৭ সাল পর্যন্ত বয়সের তুলনায় কম ওজনের শিশুর সংখ্যা কমেছে ১ শতাংশ হারে। একই সময়ে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা কমেছে ৮ শতাংশ হারে এবং উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের শিশুর সংখ্যা বেড়েছে ৫ শতাংশ হারে।
২০০৮ সালে বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেট নিউট্রিশন সিরিজে গোটা পৃথিবীর ৪৮টি পুষ্টি কর্মসূচি পর্যালোচনা করা হয়। তাতে দেখা যায়, ৩৬টি দেশ ৯০ শতাংশ অপুষ্টির বোঝা বহন করছে। তার মধ্যে বাংলাদেশও আছে।
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের (বিডিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে দেশের পুষ্টি-পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। স্বল্প ওজনের শিশুর সংখ্যা ৩৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ এখনো তিনজনের মধ্যে একজন শিশু এ পরিস্থিতির শিকার। দেশের ৪১ শতাংশ শিশুরই বয়স অনুযায়ী উচ্চতা কম বা খর্বকায়। ২০০৭ সালে ৪৩ শতাংশ শিশু ছিল খর্বকায়। অথচ কোনো কার্যক্রম পরিচালনা না করলেও দশমিক ৫ শতাংশ করে প্রতিবছর এ হার কমার কথা।
২০০৭ সালের ১৭ শতাংশ থেকে ২০১১ সালে শিশুর উচ্চতা অনুযায়ী ওজন কম বা কৃশকায় শিশুর হার হয়েছে ১৬ শতাংশ। দুই থেকে আড়াই বছর পরও যদি কোনো শিশু খর্বকায় থাকে, তবে তার সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়ে। তিন বছর বয়সের মধ্যে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে। খর্বকায় শিশুদের মস্তিষ্ক ঠিক সময়ে বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়। তাদের বুদ্ধি কম হয়। পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারে না। স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। বুদ্ধি কম বলে ভবিষ্যতেও ভালো কিছু করতে পারে না। এই শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। যেসব শিশু খর্বকায় নয়, তাদের চেয়ে এই শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি থাকে তিন থেকে চার গুণ বেশি।
কৃশকায় শিশুদের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা আরও কম থাকে। কৃশকায় এর মাত্রা মাঝারি ও তার নিচে নামলে তখন শিশুরা মারাত্মক অপুষ্টির শিকার হয়, তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে ১০ গুণ। দেশে এ ধরনের শিশু আছে প্রায় ছয় লাখ।
সূত্র - প্রথম আলো

