মুখ বুজে এত দিন সহ্য করেছেন নির্যাতন। অনেকবার হয়তো মনে হয়েছে, কাকে বলব এসব কথা? সেই বন্ধু বা কাছের মানুষ কে, সেটি ভেবে পাচ্ছিলেন না। ঠিক এ রকম পরিস্থিতিতে একটি ফোন নম্বর হতে পারে আপনার কাছের বন্ধু। বাড়িয়ে দেবে সহায়তার হাত। সেই নম্বরটি হলো ১০৯২১।
২০১২ সালের ১৯ জুন থেকে জাতীয় হেল্পলাইন সেন্টার এই সেবা চালু করেছে। বাংলাদেশ সরকার ও ডেনমার্ক সরকারের যৌথ উদ্যোগে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল কর্মসূচির আওতায় নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে নম্বরটি চালু করা হয়েছে। ঢাকার ইস্কাটনে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কার্যালয়ে এ সেন্টার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ১০৯২১ নম্বরটি হেল্পলাইন হিসেবে দেয়, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে এই নম্বরে ফোন করা যায়।
কোনো মুঠোফোন বা টেলিফোন থেকে ১০৯২১ নম্বরে ডায়াল করে যিনি ফোন ধরবেন তাঁকে জানাতে হবে নির্যাতনের কথা। টেলিফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি এরপর থানা ও পুলিশকে জানানোসহ যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
শুধু নিজে নির্যাতনের শিকার হলেই নয়, আশপাশের কাউকে নির্যাতনের শিকার হতে দেখলে বা শুনলেও সে তথ্য জানিয়ে দিতে পারবেন নম্বরে। এ ক্ষেত্রে তথ্যদাতার নাম পরিচয় সতর্কতার সঙ্গে গোপন রাখা হবে। নির্যাতনের শিকার হলে কোথায় যেতে হবে, ঠিক এই ধরনের নির্যাতনের জন্য কোন আইনি সহায়তা নিতে হবে ইত্যাদি পরামর্শও জানা যাবে নম্বরটিতে। শুধু পরামর্শ নয়, বিনা মূল্যে পাওয়া যায় কাউন্সেলিং সেবাও।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক আবুল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে হেল্পলাইন সেন্টারে নারী-পুরুষ মিলে কাজ করছেন নয়জন। সারা রাত নারীদের দিয়ে কাজ করানো কঠিন। নির্যাতনের শিকার নারীরা নারী সহায়তাকারীর সঙ্গে কথা বলতে চান। আরও বেশি জনবল হলে আমরা ২৪ ঘণ্টা এই সেবা দিতে পারব।’
বর্তমানে সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সেন্টার থেকে সেবা দেওয়া হচ্ছে।এরপর চট্টগ্রাম এবং সিলেটের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে কর্মরত ব্যক্তিদের কাছে টেলিফোন চলে যায়, তারপর তাঁরাই সহায়তা করেন।
এসবের মধ্যে কতটি ফোনে সেবা দেওয়া হলো তার হিসাব রাখা হচ্ছে। দেখা যায়, গড়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি টেলিফোন আসে। বেশির ভাগ অভিযোগের মধ্যে থাকছে ছবির অপব্যবহার, স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে, প্রেমিকের প্রতারণা, ভাই কর্তৃক বোনকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি। অনেকে আবার সেবা চান না। তাঁরা মনের কথাটুকু বলেই নিজেকে হালকা করেন।
নির্যাতনের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী সেবা দেওয়া হয়। গত বছরের ১৯ জুন থেকে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত নম্বরটির মাধ্যমে নয় হাজার ৯৪৫ জনকে বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েটিই ফোন করে বিয়ে বন্ধের কথা বলে। যে সময় ফোন করে, তখন হয়তো হাতে আর বেশি সময় নেই। কেন্দ্র থেকে তৎক্ষণাৎ সংশ্লিষ্ট থানা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়সহ অন্যান্য জায়গায় বিষয়টি জানানো হলে বিয়েটি বন্ধ করা সম্ভব হয়। আবার যাঁরা বিভিন্ন জায়গায় নিজেরাই যোগাযোগ করতে পারবেন, তাঁদের টেলিফোন নম্বর দিয়ে সহায়তা করা হয়। কথা বলতে বলতে সংযোগ কেটে গেলে বা ফোন করার টাকা না থাকলে কেন্দ্র থেকেই সেই ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এসব তথ্য জানা গেল হেল্পলাইন সেন্টারের প্রধান সমন্বয়কারী শায়লা ইয়াসমীনের কাছ থেকে।
সেন্টারে গিয়ে জানা গেল, কয়েক মাস আগে চাঁদপুরে মাত্র চার বছরের মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে মা দিশেহারা হয়ে পড়েন। নম্বরটিতে ফোন করতে কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে যায়। সেই মাকে মেয়েকে গোসল না করাতে, কাপড় না ধুতে পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে মা এ কাজগুলো করে ফেলেছেন। পরে মেয়েকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে বলা হয়। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করে মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে সহায়তা দেওয়া হয় সেই মাকে। মামলাটি এখনো ফলোআপ করা হচ্ছে কেন্দ্র থেকে। সেই মা পরে ফোন করে জানিয়েছিলেন, দিশেহারা মুহূর্তে কেন্দ্র থেকে পাওয়া পরামর্শ এবং সেবা খুব কাজে দিয়েছে।
এখানে কর্মরত ব্যক্তিরা সারা দিন ধরে মানুষের নির্যাতনের কথা শোনেন। হয়তো একটা সময়ে তাঁরা ক্লান্তও বোধ করেন। কিন্তু যখন তাঁদের মাধ্যমে সঠিক ব্যবস্থার কারণে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিটি প্রতিকার পান, এই ক্লান্তি তখন আনন্দে পরিণত হয়।
সূত্র - প্রথম আলো

