বিজ্ঞানীদের কাজে উৎসাহ দিতে বিশেষ প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে প্রায় তিন বছর আগে। ঘোষণাটি ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম শওকত আলীকে প্রধান করে এ বিষয়ে একটি সুপারিশমালাও তৈরি হয়েছিল। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য তৈরি ওই সুপারিশের বয়সও দুই বছর হয়ে গেছে। কিন্তু সেই প্রণোদনা আর আলোর মুখ দেখেনি।
সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে বিজ্ঞানীদের ওই প্রণোদনা আটকে থাকায় প্রতিবছর অনেকেই নিজ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। যোগ দিচ্ছেন বেসরকারি চাকরিতে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের হিসাবে গত এক যুগে ৪০০ কৃষিবিজ্ঞানী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ২০০ জন বিজ্ঞানী মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চাকরি ছেড়ে বেসরকারি সংস্থায় যোগ দিয়েছেন। আর গত দুই বছরে ৩০ জন বিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা চলাকালীন অবস্থায় অবসরে গেছেন।
সরকারের অন্য সংস্থাগুলোর হিসাব যুক্ত করলে এমন বিজ্ঞানীর সংখ্যা কয়েক গুণ হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। তাঁরা বলছেন, পাশের দেশ ভারত, নেপালসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে বিজ্ঞানীদের কাজের সুযোগ করে দিতে চাকরির বয়সসীমা বাড়ানো ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হলেও বাংলাদেশ ব্যতিক্রম হিসেবেই রয়ে গেছে।
এম শওকত আলীর সুপারিশে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীদের চাকরির বয়স বাড়ানো, পদোন্নতির বিশেষ ব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ ও অবসর ভাতার সুবিধা দেওয়া। ওই সুপারিশ নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মধ্যে কয়েক দফা সভা হয়েছে।
২০০৯ সালের ১৩ জুন আওয়ামী লীগের মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকেও বিজ্ঞানীদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এর আগে ১৯৯৭ সালের ১০ আগস্ট জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরিষদের সভায় বিজ্ঞানীদের আলাদা বেতনকাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়। এ জন্য তৎকালীন সাংসদ খন্দকার আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি কমিটিও সুপারিশ করেছিল, কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি।
এ বিষয়ে এম শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিজ্ঞানীদের বিশেষ প্রণোদনা দিলে জাতি হিসেবে আমরা তার সুফল দীর্ঘ মেয়াদে পাব। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের বাড়তি খরচ হলেও তা দেওয়া উচিত।’
প্রণোদনা কেন: বিজ্ঞানীদের প্রণোদনা দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) ২০০৯ সালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। এতে বলা হয়, সাধারণত একজন বিজ্ঞানীর ৫০ বছর পার হওয়ার পর তাঁর পরিপক্বতা আসে। কিন্তু ওই উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর কয়েক বছরের মাথায় তাঁকে অবসরে যেতে হয়। এ থেকে উত্তরণের জন্য উন্নত দেশে বিজ্ঞানীদের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো ও সুবিধা দেওয়া হয়।
কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিজ্ঞানীদের প্রণোদনা দেওয়ার প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে। শুধু কৃষিবিজ্ঞানীরা নন, অন্য বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদেরাও যাতে ওই বিশেষ প্রণোদনা পান, তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছে।’
এ ব্যাপারে বার্কের নির্বাহী চেয়ারম্যান ওয়ায়েস কবীর বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় মেধার খুব সংকট। মেধা ও দক্ষতা যদি আমরা বাড়াতে না পারি, তাহলে আমাদের পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার উপযোগী করে কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব নয়। এ জন্য বিজ্ঞানীদের প্রণোদনা দিতে হবে।
সূত্র - প্রথম আলো

