চারতলা ভবনটি ধবধবে সাদা। সামনে এক চিলতে খালি জায়গা। সেখানে শামিয়ানা টানিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। উপলক্ষ, দেশি পাটের জীবনরহস্য বা জিন নকশা (জিনোম সিকোয়েন্সিং) উন্মোচনের পূর্বাপর জানানো।মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছিলেন গবেষক দলের সদস্যরা। সঞ্চালক ও মূল বক্তা বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। তাঁর নেতৃত্বেই পেয়েছে বাংলাদেশ এ সাফল্য। বাঁ হাত উঁচু করে শ্বেতশুভ্র ভবনের দিকে সাংবাদিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়ে তিনি বললেন, দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের সাক্ষী হয়ে রয়েছে ওই ভবনটি। গত রোববার গণভবনে এই সাফল্যের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।জাতীয় সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রাঙ্গণেই সাদা ভবনটির অবস্থান। নাম জৈবপ্রযুক্তি ভবন। এটি এখন বাংলাদেশে জিনোম গবেষণার আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে। কারণ, এখান থেকেই উঠে এসেছে একের পর এক সাফল্য। ২০১০ সালে তোষা পাট, তারপর ২০১২ সালে উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর ছত্রাকের জীবনরহস্য উন্মোচন। সব কটি গবেষণারই নেতৃত্বে ছিলেন মাকসুদুল আলম।গতকাল সোমবার আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলন শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য জিনোম গবেষণার সেই আঁতুড়ঘরটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ঘুরিয়ে দেখানো হয় গবেষণাকেন্দ্রটির বিভিন্ন কক্ষ। জিনোম গবেষণার মতো জটিল বিষয় নিয়ে করা সাংবাদিকের নানা প্রশ্নের উত্তর বেশ সহজভাবেই বুঝিয়ে দেন মাকসুদুল আলম ও তাঁর দল। গবেষণা স্বত্বের (পেটেন্ট) আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তিন তরুণ আইনজীবীও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।সাংবাদিকদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও প্রশ্ন ছিল, কবে নাগাদ এসব গবেষণার ফলাফল দেশের কৃষকদের হাতে পৌঁছানো যাবে? দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে কত সময় লাগবে? উত্তরে গবেষক দলের অন্যতম সদস্য মোহাম্মদ সামিউল হক বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কৃষকের জন্য পাটের উন্নত জাত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। আরও তাড়াতাড়ি জাত উদ্ভাবন সম্ভব কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে মাকসুদুল আলম বলেন, ‘আমরা আরও আগে করার চেষ্টা করব, কিন্তু আমরা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সময় হাতে রেখেছি।’ বললেন, ‘আমরা কী করছি, তা সব সময় নজর রাখছে আমাদের প্রতিযোগী দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু এখন আমরা বলতে পারি, আমাদের ধরা খুব মুশকিল।’
একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, দেশে বর্তমানে যে পাট উৎপাদিত হয়, তার ন্যায্য মূল্যই কৃষক পাচ্ছে না। আরও উন্নত জাত এলে উৎপাদন বেড়ে গিয়ে কৃষক আরও বিপদে পড়বে কি না। উত্তরটা দেন পাটের ফলিত ও প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক ও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ কামালউদ্দিন। বললেন, ‘সরকার পণ্যের মোড়ক হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে পাটের ব্যবহার নিয়ে ২০১০ সালে যে আইন করেছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে অতিরিক্ত ১৫ লাখ বেল পাটের দরকার হবে। এ ছাড়া বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পলিথিন ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। এতে পাটের আন্তর্জাতিক চাহিদাও বাড়বে। ফলে আমাদের পাটের সুদিন আবার ফিরবে।’
গবেষক দলের অন্যতম সদস্য মনজুরুল আলম বলেন, ‘সরকার এই গবেষণার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে, তার অর্ধেক টাকা খরচ করেই আমরা ছত্রাক ও দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছি। আশা করি, আরও সফলতা নিয়ে আসতে পারব।’ প্রণোদনা বা উৎসাহ না পেয়ে অনেক বিজ্ঞানী দেশ ছাড়ছেন। এ বিষয়ে সরকারের তেমন মনোযোগ নেই উল্লেখ করে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের করা প্রশ্নে মাকসুদুল আলম বলেন, বিজ্ঞানীদের যদি আলু-পটোলের দাম আর পরিবারের চিকিৎসা খরচ নিয়ে চিন্তিত থাকতে হয়, তাহলে তাঁরা গবেষণায় মনোযোগ দিতে পারবে না। বিশ্বের যে দেশগুলো অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়েছে, তারা বিজ্ঞানকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের প্রণোদনা ও উৎসাহ না দিলে আজকের দুনিয়ায় কোনো দেশ এগোতে পারবে না।
সূত্র - প্রথম আলো

