আট বছরে মারা গেছেন ১৮ জন মাদকাসক্ত। অসুস্থ হয়ে এখনো যাঁরা বারান্দায় পড়ে আছেন, তাঁদেরই উঠানে জ্বলছে চোলাই মদের ভাঁটি। মাদকের সূতিকাগার খ্যাত রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নুননগর গ্রামের লোকজন এখন বাঁচতে চান। কিন্তু তাঁদের পরিবারপ্রতি ১৫-২০টি মামলা। আর মহাজনি ঋণের দায়ে তাঁরা মাদকের কাছে বাঁধা পড়ে আছেন। বিকল্প কর্মসংস্থান আর মামলা থেকে রেহাই পেলে পেশা ছেড়ে দিতে চান তাঁরা।
স্থানীয় লোকজন জানান, উপজেলার আড়ানী ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ এখন চোলাই মদে আসক্ত। প্রতিদিন এই গ্রামগুলোতে চোলাই মদ পানের আসর বসে। বাঘার বিভিন্ন গ্রাম থেকেও লোকজন এই আসরে যোগ দিতে আসেন।
স্থানীয় লোকজন আরও জানান, চোলাই মদ তৈরি, বিক্রি ও পান করে গত আট বছরে নুননগর ও তার আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ১৮ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া প্রায় বাড়িতেই অসুস্থ মাদকাসক্ত রয়েছেন। অসুস্থ অনেকের আবার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছে।
১২ আগস্ট সরেজমিনে নুননগর গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৩৫ বছর আগে গ্রামের সমশের ডাক্তার ও খোরশেদ নামের দুই ব্যক্তি প্রথমে চোলাই মদ তৈরি শুরু করেন। তাঁদের দেখাদেখি গ্রামের লোকজন ঝুঁকে পড়েন এই ব্যবসায়। বাড়ি বাড়ি তৈরি হয় চোলাই মদের ভাঁটি। নুননগরের পাশাপাশি এই ব্যবসা পাশের গ্রাম শাহাপুর ও ঝিনাতেও ছড়িয়ে পড়ে। চোলাই মদের পাশাপাশি এখন এই এলাকায় ঢুকে পড়েছে গাঁজা ও হেরোইনের ব্যবসা।
নুননগরে আবদুল হান্নানের বাড়িতে ঢুকতেই গন্ধে নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার জোগাড়। হান্নান জামার বোতাম খুলে দেখালেন। বুকের হাড়গুলো গোনা যায়। বললেন, তিনি খালি পেটেই মদ খেতেন। কয়েক বছর পরই যক্ষ্মা হয়ে গেল। চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হয়েছেন। কদিন হলো নেশা ছেড়েছেন। কোনো কাজ করতে পারেন না। ছেলে ভ্যান চালান, তা দিয়ে সংসার চলে। তাঁর উঠানে প্রচুর পরিমাণে কোলা (বড় মাটির পাত্র) স্তূপ করে রাখা। উঠানের এক পাশের ছোট্ট ঘর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, দুটি চুলায় চোলাই মদের হাঁড়ি চাপানো। প্রতিটি চুলায় তিনটি করে হাঁড়ি চাপানো। ওপরে ও নিচে সিলভারের হাঁড়ি, মাঝে একটি মাটির হাঁড়ি।
পাশের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একইভাবে জ্বলছে দুটি চুলা। চুলায় একজন নারী শ্রমিক জ্বাল দিচ্ছিলেন। তিনি বাড়ির গৃহিণী মনোয়ারা বেগম (৫০)। তাঁর স্বামীর নামে মাদকের ১৭টি মামলা রয়েছে। তাঁর নিজের নামে তিনটি ও ছেলের নামে একটি মামলা রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে মামলায় হাজিরা দিতে হয়। টাকা জোগাড় করার জন্য মহাজন ও বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। প্রতি সপ্তাহে এক হাজার টাকা কিস্তি টানতে হয়। এখন এই কাজ করা ছাড়া বাঁচার উপায় নেই।
মনোয়ারার জামাতা সেন্টু এসে বলেন, ‘মামলার দায়িত্ব যদি আপনারা নেন, আর বিকল্প কর্মের ব্যবস্থা হলে আমরা এসব আর করব না।’ তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কম বয়সী এক নারী বলেন, ‘আমার স্বামী নাই। দুইটা নাবালক সন্তান আছে। পেট চলে না, তার পরও মামলা। আমি কী করব?’ একইভাবে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেন একদল নারী। সবার একই কথা।
ওই বাড়ি থেকে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পর এই প্রতিবেদকের মুঠোফোনে মাদক পল্লি থেকে একজন ফোন করে বলেন, মামলা চালানোর খরচ ছাড়াও পুলিশকে নিয়মিত টাকা দিয়ে আসতে হয়। দেরি হলে এসে চুলা ভেঙে দিয়ে যায়। মামলা দেয়। অনেক কষ্টে তাঁদের দিন কাটে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক জোহা এম এম হোসেন বলেন, চোলাই মদ একটি অপরিশোধিত পানীয়, যা পান করার কারণে লোকজন নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।
বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, প্রতি সপ্তাহে তিনি ওই গ্রামে অভিযান চালান। ভাঁটি ভেঙে দেন। পাঁচ-সাতটি করে মামলা দেন। অবশ্য মুঠোফোনের কারণে পুলিশ যাওয়ার বিষয়টি তাঁরা আগেই টের পেয়ে যান। তখন গিয়ে আর কোনো আলামত পাওয়া যায় না। তিনি আরও বলেন, তাঁদের সামাজিকভাবে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।
সূত্র - প্রথম আলো

