নতুন আম ‘গৌড়মতি’
16 August,13
Posted By: Healthprior21
Viewed#: 13
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন জাতের আমের সন্ধান পাওয়া গেছে। কৃষিবিদেরা দাবি করেছেন, এটি নাবি জাতের (মৌসুমের শেষের দিকে হয়) সুস্বাদু একটি আম। আশ্বিনা ও ল্যাংড়া—এ দুই জাতের আমের মুকুলের প্রাকৃতিক পরাগায়নের মাধ্যমে নতুন জাতটির উৎপত্তি হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। তাঁরা আমটির নাম দিয়েছেন ‘গৌড়মতি’।শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শিয়ালমারা এলাকার এক আমবাগানের একটি গাছে এই জাতের আম পাওয়া গেছে। গাছটির আনুমানিক বয়স ১৬ বছর হবে। দূর থেকে এর পাতা দেখতে আশ্বিনা জাতের আমগাছের মতো। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলে এর পাতা ল্যাংড়া জাতের আমগাছের পাতার মতো দেখা যায়।কৃষিবিদেরা জানান, সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়টাকে আমের মৌসুম ধরা হয়। কিন্তু নতুন জাতের এই আম আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া যায়। দেশের আনাচকানাচে অজানা, অপ্রচলিত ও উন্নত জাতের ফল খুঁজে বের করে তাকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্প কাজ করে থাকে। এ প্রকল্পের পরিচালক এস এম কামরুজ্জামান। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, নতুন এই আম দেখতে অনেকটা ল্যাংড়ার মতো, আবার ঠিক ল্যাংড়াও নয়। ল্যাংড়ার চেয়ে বেশি মিষ্টি। এর মিষ্টতা অর্থাৎ টোটাল সলিউবল সুগার (টিএসএস) ২১ দশমিক ৭৫ থেকে ২৫ শতাংশ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত সুস্বাদু জাত ল্যাংড়ার মিষ্টতা ১৭ থেকে ১৯ শতাংশ এবং ক্ষীরশাপাতির মিষ্টতা ১৯ থেকে ২০ শতাংশ—এই তথ্য জানিয়ে কামরুজ্জামান বলেন, গৌড়মতি জাতের আমের ভক্ষণযোগ্য অংশও বেশি। এর ভক্ষণযোগ্য অংশ প্রায় ৯৩ শতাংশ; যেখানে অন্যান্য সুস্বাদু আমের ভক্ষণযোগ্য অংশ ৮০ থেকে ৮২ শতাংশ। গৌড়মতি আমের আঁটি ও খোসা দুই-ই পাতলা। তিনি বলেন, ল্যাংড়া আমে একটু টকভাব থাকলেও এই জাতের আমে তা নেই। পাকলে হলুদাভ সঙ্গে সিঁদুরে রঙের মিশেলে আকর্ষণীয় দেখায়। এর ঘ্রাণও চমৎকার। সম্ভাবনাময় এই আমের প্রতিটির ওজন ২৫০ থেকে ৩৫০ গ্রাম।
এস এম কামরুজ্জামান বলেন, তাঁদের ধারণা প্রকৃতিতে দৈবভাবে (Chance Seedling) ল্যাংড়া ও আশ্বিনার মিলনের মাধ্যমে এই জাতের সৃষ্টি হয়েছে। আশ্বিনা থেকে নাবি জাতের বৈশিষ্ট্য ও ল্যাংড়া থেকে রং, আকৃতি, স্বাদসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পেয়েছে এই জাতটি। তিনি বলেন, তাঁদের জানামতে, নাবি জাতের এত সুস্বাদু আম আর নেই। তাই নাবি জাতের আম উৎপাদনে এ জাতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আমটির পরিচিতিকরণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আগামীকাল ১৭ আগস্ট ওই বাগানে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে আম উৎপাদন এলাকার প্রায় ২০টি হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ ও আমচাষিরা অংশ নেবেন। উপস্থিত থাকবেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, খাদ্যশস্য বিভাগের পরিচালক ও কৃষিবিদেরা।
নতুন আমের নামকরণ প্রসঙ্গে কৃষিবিদেরা জানান, বাংলার প্রাচীন জনপদ গৌড় অঞ্চল থেকে ‘গৌড়’ আর মূল্য বিবেচনায় ‘মতি’ শব্দটি নিয়ে নাম দেওয়া হয়েছে ‘গৌড়মতি’।
বাগানের মালিক বরেন্দ্র অঞ্চলের একজন স্কুলশিক্ষক। বাগানে ৩৩টি আমগাছ রয়েছে। তার মধ্যে এটিই কেবল আলাদা জাতের। বাগানের মালিক নিজেই জানতেন না এ গাছটির আম এত সুস্বাদু। কারণ, আগেই বাগান বিক্রি করে দিতেন তিনি। এ আমের স্বাদই নেওয়া হয়নি তাঁর।
পুরো মৌসুমের জন্য বাগানটি কিনেছেন শিবগঞ্জের বালিয়াদিঘি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ‘আমি ওই গাছের আমের আলাদা আকার-আকৃতি দেখে গাছে সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও ভিটামিন প্রয়োগ করে বিশেষভাবে পরিচর্যা করি। কৌতূহলবশত মৌসুমের শেষ সময় পর্যন্ত গাছে আম টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। পরে খেয়ে দেখি এর স্বাদ ল্যাংড়ার চেয়েও ভালো।’ তিনি বলেন, ‘গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ১৬ মণ আম বিক্রি করি ১১ ও ১২ হাজার টাকা মণ দরে। এবার ফলন হবে ৮ থেকে ১০ মণ। আমিও আগাম ফল বিক্রি করে দিয়েছি আরেক ক্রেতার কাছে ৬০ হাজার টাকায়।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ সাইফুর রহমান জানান, লোকমুখে আমটির স্বাদের কথা শুনে দুই বছর ধরে গাছটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। হর্টিকালচার সেন্টারে আমটির গুণাগুণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। তিনি জানান, গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর গাছটি থেকে শেষবার আম পাড়া হয়। এবার চট্টগ্রামের এক আম ব্যবসায়ীর কাছে মণ দরে আগাম বিক্রি করা হয়েছে। গত বছর এই গাছে ২৬ মণ আম পাওয়া গেছে। এ বছরও ভালো ফলন হয়েছে। ইতিমধ্যে ওই গাছে বেশ কিছু কলম তৈরি করা হয়েছে।
সূত্র - প্রথম আলো