ঈদের দিনটা কেঁদেকেটেই কাটালেন মাসুদা বেগম। সাভারের রানা প্লাজা ধসে নিজে আহত হয়েছেন। তবে তাঁর এই কান্না নিজের জন্য নয়, তিনি কাঁদছেন স্বামী আলতাফ হোসেনের জন্য। ওই ভবনধসে আলতাফ মারা গেছেন। শুধু ঈদের দিন কেন, সারা জীবনই এই বেদনা মাসুদাকে কুরে কুরে খাবে। বুকে-পেটে আঘাত পেলেও তিনতলায় কাজ করা মাসুদা ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছিলেন। কিন্তু সাততলায় কাজ করা আলতাফ আটকে ছিলেন। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে এসে ভবনের ভেতরে ঢুকে আটকে পড়া স্বামীকে দেখেও এসেছিলেন মাসুদা। স্বামীর মুখে পানিও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি।দেশের উত্তর প্রান্তে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার বলিধারা গ্রামে বাড়ি আলতাফের। ঈদের দিন সন্ধ্যায় এই বাড়িতেই কথা হয় মাসুদার সঙ্গে। এই বলিধারা গ্রামেরই শিল্পী আক্তার ও আঞ্জু বেগম নামের আরও দুই পোশাককর্মী নিহত হয়েছেন রানা প্লাজায়। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলো ঈদের দিন কাটিয়েছে শুধুই কষ্টে। ঈদের দিন শুক্রবার সন্ধ্যায় বলিধারা গ্রামে গিয়ে আলতাফের প্রসঙ্গ তুললেই লোকজন বাড়ি দেখিয়ে দিল। বাড়িতে ঢুকেই দেখা মিলল আলতাফের মা আয়েশা বেগম আর স্ত্রী মাসুদা বেগমের। খালি গায়ে থাকা আলতাফের ১০ বছরের ছেলে মাসুদ রানা আর আট বছরের মেয়ে রূপা দৌড়ে গিয়ে জামা পরে এল। জামাগুলো গত বছরের ঈদে বাবার কিনে দেওয়া। এই ঈদে তাদের জন্য কিছুই কেনা হয়নি।
ছেলেকে দেখিয়ে মাসুদা বললেন, জন্মের পর থেকেই ছেলের হূদেরাগ ধরা পড়ে। যথাসাধ্য চেষ্টা করেও ছেলের চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না আলতাফ আর মাসুদা। তাই গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসের দিকে দুজনেই স্থানীয় একজনের সহায়তায় সাভারের রানা প্লাজায় দুটি পোশাক কারখানায় কাজ নেন। ছেলেমেয়েকে দাদা-দাদির কাছে রেখে তাঁরা সাভারে যান। স্বামী-স্ত্রী মিলে মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা আয় করতেন। তা থেকে ১০ হাজার টাকাই পাঠাতেন বাড়িতে।
২৪ এপ্রিল সকাল সাড়ে নয়টায় ভবনধস হয়। বেলা একটার দিকে উদ্ধার পান মাসুদা। বুকে ও পেটে আঘাত পাওয়া মাসুদাকে নিয়ে যাওয়া হয় এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু স্বামীর চিন্তায় অস্থির হয়ে দুই ঘণ্টা পর হাসপাতাল ছেড়ে আবারও ধ্বংসস্তূপের সামনে আসেন মাসুদা। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিলেন না স্বামীকে। সন্ধ্যা সাতটার দিকে অজ্ঞান হয়ে যান আহত মাসুদা। স্থানীয় লোকজন তাঁকে ধরে মজিদপুরের ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। সেখানে রাত আটটার দিকে মাসুদার ফোনে একটি কল আসে। ধসে পড়া ভবনের ভেতরে আটকে পড়া একজন শ্রমিক ফোনটি করেছেন। তিনি মাসুদাকে বলেন, হাতে-পায়ে বিম চাপা অবস্থায় আটকে আছেন আলতাফ। সেখান থেকে তিনি শুধু বারবারই স্ত্রী মাসুদার নাম বলছেন। আটকে পড়া ওই শ্রমিক মাসুদাকে অনুরোধ করেন, তাঁকে ও আলতাফকে উদ্ধারের জন্য।
মাসুদা বলেন, ‘ফোন পায় মুই তো পাগল হয়ে গেনু। ওইঠেকার (ওখানকার) একটা লোক ধরৈ রানা প্লাজায় আসিনু। কিন্তু মোক ভিতরোত ঢুকবার দিছিল না। মুই একটা আর্মিও পায়ে ধরে বসলাম। কহিনু ভাই, আমার স্বামী বাঁচি আছে। কথা কহছে। তুমরা ওক বাঁচান।’
মাসুদা জানান, এরপর ওই সেনাসদস্যের সহায়তায় দুজন উদ্ধারকর্মী মাসুদাকে ধসে পড়া ভবনের ভেতরে নিয়ে যান। ফোনের নির্দেশনা অনুযায়ী অবস্থানটি জানান উদ্ধারকর্মীদের। সেখানে তিনি স্বামীর নাম ধরে ডাকাডাকি করে সাড়াও পান। এরপর অনেক কষ্টে স্বামী আলতাফের কাছাকাছি যেতে সক্ষম হন। আলতাফের ডান হাত আর বাঁ পা হাঁটু পর্যন্ত বিমের নিচে আটকে ছিল। স্ত্রীর গলা শুনেই কাঁদতে শুরু করেন আলতাফ।
মাসুদা বলেন, ‘মুই কহিনু তোমরা না কান্দেন। তোমাক বাইর করবার হলে হাত-পা কাটা নাগবে। তোমরা অনুমতি দাও।’ আলতাফ কেঁদে বলেন, ‘হাত-পা কাটপার হলি কাট। মুই ভিক্ষা করি খাম। তাও ছাওয়ালাক তো দেখপার পারিম।’
মাসুদা জানান, উদ্ধারকর্মীরা মাসুদাকে বের হয়ে যেতে তাড়া দিচ্ছিলেন। তখন আলতাফ বলেন, তাঁর মুখে একটু পানি দিয়ে যেতে। মাসুদা মুখে পানি দিয়ে দ্বিতীয়বার আবার আসার আশ্বাস দেন। আলতাফ বলেন, ‘তুই নিচে থাকপি। আমাক উদ্ধার করলে আমি তোর সঙ্গে কথা বলবার চাই।’
এরপর আর মাসুদা বাড়ি ফিরে যাননি। স্বামীর জন্য কলা-পাউরুটি আর আপেল কিনে নিচেই বসে ছিলেন। স্বামীকে উদ্ধারের জন্য অনেকের হাত-পা ধরেছেন। কিন্তু পরদিন (২৫ এপ্রিল) রাতেই মারা যান আলতাফ। শুক্রবার উদ্ধার করা হয় তাঁর মৃতদেহ।
মাসুদা যখন এ গল্প বলা শেষ করলেন, ততক্ষণে কাঁদছে বাড়িসুদ্ধ লোক। বাড়ির লোকের ডুকরে কাঁদার শব্দ শুনে জড়ো হয় প্রতিবেশীরা। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলেন মাসুদা। বলছিলেন, ‘হামার ছেলেমেয়ে দুটির কী হবি।’
আলতাফের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন জানান, আলতাফের লাশ নেওয়ার সময় ২০ হাজার টাকা আর পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এক লাখ টাকা পেয়েছে পরিবারটি।
শিল্পীর সংগ্রামী জীবন: এখান থেকে অনেক কষ্ট করে মেয়েটাকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়েছেন বলিধারা জওগাঁ গ্রামের রিকশাচালক ফাইজুল ইসলাম। স্নাতকে (ডিগ্রি) ভর্তি হওয়ার পরে মেয়ে শিল্পী আক্তার (২৩) বাবার কষ্ট লাঘবের জন্য গ্রামের এক পরিচিতের সহায়তায় কাজ নিয়েছিলেন সাভারের রানা প্লাজার একটি পোশাক কারখানায়। কারখানায় কাজের ফাঁকে ডিগ্রি পাসের পরিকল্পনা ছিল শিল্পীর। আর বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে ডিগ্রি পাস করলে একটা চাকরি করবে, এরপর ভালো দেখে একটা বিয়ে দেবেন।
কিন্তু এই পরিবারটির সব স্বপ্নও যেন রানা প্লাজার নিচে চাপা পড়ে গেল। গত শুক্রবার জওগাঁ গ্রামের নিজের বাড়িতে কথা হয় ফাইজুল ইসলামের সঙ্গে। বাঁশের বেড়া আর টিনের ছাউনির ঘর। টিনের চালে কুমড়াগাছের লতা। ঈদের কোনো আয়োজন নেই বাড়িতে। যতবার কেউ মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করেন, ততবারই কাঁদেন ফাইজুল আর তাঁর স্ত্রী শেফালী বেগম।
বাবা ফাইজুল জানান, এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে শিল্পীই ছিল বড়। ছেলে সোহেল স্থানীয় বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। মেয়েটার বড় হওয়ার অনেক ইচ্ছে ছিল, কষ্টও করতে পারত অনেক। এ কারণে চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও মেয়েটা উচ্চমাধ্যমিক পাস করতে পেরেছে। অনেকবারই ওর পড়া বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু ওর ইচ্ছের কাছে সবই হার মেনেছে। সবাই ভেবেছিল শিল্পীই পারবে পরিবারটির অবস্থা পরিবর্তন করতে। স্কুলের শিক্ষকেরা বলতেন, ওর ইচ্ছে আছে, ওর পড়া বন্ধ করবেন না। ও অনেক দূর যাবে।
কথা শেষ করেই কেঁদে ফেলেন বাবা। মেয়েটি তাঁর সত্যিই অনেক দূরে চলে গেছে। পোশাক কারখানায় কাজের ফাঁকেই মেয়েটি ডিগ্রি প্রথম বর্ষ শেষ করেছিল।
ফাইজুল জানান, ২৪ এপ্রিল এলাকার একজন পরিচিত টেলিভিশনে খবর দেখে এসে ফাইজুলকে জানান, রানা প্লাজা ধসে পড়েছে। সন্ধ্যায় পাঁচ হাজার টাকা ধার করে বাসে ওঠে সাভার যান তিনি। গ্রামেরই একটি ছেলে গাজীপুরের পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তাঁকে সঙ্গে করে দিনভর মেয়ের খোঁজ করেন ফাইজুল। আর রাতে গাজীপুরে গিয়ে থাকেন। এক সপ্তাহের মধ্যেই পকেটের টাকা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু মেয়ের খোঁজ মেলে না। গ্রামে ফিরে আসেন ফাইজুল। গ্রামের মানুষের কাছ থেকে সাহায্য হিসেবে কিছু টাকা তুলে আর ধার করে সাত হাজার টাকা নিয়ে আবারও যান সাভার।
৯ মে তাঁর গ্রামের একজন ফাইজুলকে ফোন করে বলেন, শিল্পীর মোবাইল নম্বর খোলা আছে। শিল্পীর নম্বর থেকে তাঁর ফোনে কল এসেছিল। তখনই মেয়ের নম্বরে ফোন করেন তিনি। একজন নারী ফোন ধরেন। নারী কণ্ঠ শুনে তিনি ভেবেছিলেন শিল্পী বেঁচে আছে। ফাইজুল বলেন, ‘হামি বললাম শিল্পী, তুই কই। ওপার থেকে নারী কণ্ঠ বলে, আমি শিল্পী না। শিল্পীর লাশ মিলেছে। তার কাছ থেকেই মিলেছে এই মোবাইল ফোন।’
অধরচন্দ্র স্কুলের মাঠে ছুটে যান ফাইজুল। সেখানে তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় মেয়ের লাশ আর ২০ হাজার টাকা। কান্নায় ভেঙে পড়েন ফাইজুল। বলেন, ‘লাশ তো না, কঙ্কাল। মেয়েটার আমার লম্বা লম্বা চুল ছিল। পায়ে আঙটি পরত। এসব দেখেই শুধু চেনা যায়।’
শিল্পীর মা শেফালী বলেন, মেয়ের বদলে সরকার এক লাখ টাকা দিয়েছে। তাই দিয়ে ছেলের জন্য কিছু জমি চাষাবাদের চুক্তি নিয়েছেন।
মান্নানের সবই গেল: বলিধারার বগুড়াপাড়া গ্রামের আবদুল মান্নানের মেয়ে আঞ্জু আক্তার প্রায় ১৭ বছর পোশাক কারখানায় কাজ করেছেন। দুই মেয়ের মধ্যে আঞ্জু ছোট। মান্নান বলেন, ‘মোর কুনো ব্যাটা নাই। মোর ছোট বেটিই ব্যাটার সব দায়িত্ব নিছিল। ওই রানা (রানা প্লাজার মালিক) মোর সবই খাইল।’
বিয়ের কয়েক বছর পরই স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় আঞ্জুর। ছেলে রাজু আর মেয়ে মৌসুমীকে বাবা-মায়ের কাছে দিয়ে তিনি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। মাসে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা পাঠাতেন বাবার কাছে। সেই টাকাতেই চলত পুরো পরিবার। প্রতিবার ঈদে ছেলেমেয়েসহ বাবা-মা ও পরিবারের অন্যদেরও জামা-কাপড় দিতেন আঞ্জু। কিন্তু এবার কোনো আয়োজন ছিল না পরিবারটির। আঞ্জুর মা আয়েশা আক্তার শুধু নাতি-নাতনিদের জন্য কিছু রান্না করেছেন।
৬৫ বছর বয়সী আবদুল মান্নান জানেন না মেয়ে আঞ্জু কোন কারখানায়, কত তলায় কাজ করতেন। প্রতিবেশী একজনের কাছে খবর পেয়ে তিনি ঢাকায় রওনা হন ২৫ এপ্রিল। কিন্তু বগুড়া পর্যন্ত গেলেই জানতে পারেন মেয়ে মারা গেছে। গ্রামেরই তাঁর দূর সম্পর্কের এক ভাতিজা লাশ নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছে। দাফনের জন্য ২০ হাজার আর পরে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তাঁরা এক লাখ টাকা পেয়েছেন বলে জানান মান্নান।
বৃদ্ধ এই বাবা বলেন, আঞ্জুর ছেলেমেয়ে দুটোকে মানুষ করার দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে। এই বয়সে তিনি কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
সুত্র - প্রথম আলো

