হুইলচেয়ারে বসে দুই মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন সায়মা (২৮)। দেখলে বোঝা যায় না, কী এক দুঃসহ জীবন যাপন করছেন তিনি।
রানা প্লাজার অষ্টম তলায় কাজ করতেন সায়মা। এখন শরীরের নিচের অংশে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। দুই পা অবশ হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক কর্মের ওপরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই তাঁর। চিকিৎসকেরা বলেছেন, আর কখনো হাঁটতে পারবেন না সায়মা।
সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) চিকিৎসকেরা বলছেন, সায়মা মেরুদণ্ডের আঘাতজনিত সমস্যায় (স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি) আক্রান্ত। এই হাসপাতালে মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া ৩০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে সারা জীবন কাটাতে হবে হুইলচেয়ারে।
হাসপাতালের রেজিস্ট্রার মেহেদি হোসেইন বলেন, সিআরপিতে ১৭ জন মেরুদণ্ডে আঘাত পাওয়া রোগীর অস্ত্রোপচার হয়েছে। তিনজন রোগী মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচারের পর সিআরপিতে এসেছেন। আর ১০ জন রোগীর অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। এই সব রোগীর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।
গত মঙ্গলবার সিআরপির বারান্দায় কথা হয় সায়মার সঙ্গে। পক্ষাঘাতের শিকার সায়মা বলেন, স্বামী ও দুই মেয়ে রয়েছে তাঁর। স্বামী জয়নাব আলী ঘুরে ঘুরে ১০ টাকার হরেক মাল (১০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন প্লাস্টিকের সামগ্রী) বিক্রি করেন। এখন তিনিও প্রশিক্ষণ নিয়ে সিআরপির সাহায্যে একটি দোকান করার পরিকল্পনা করছেন।
এই হাসপাতালেই মেরুদণ্ডের আঘাতজনিত সমস্যা নিয়ে ভর্তি উদ্ধারকর্মী ইউসুফ আলী। তাঁর চার হাত-পাই অবশ হয়ে গেছে। তিনি মাথা ছাড়া শরীরের কোনো অংশই নাড়াতে পারেন না।
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় সবজির ব্যবসা করতেন ইউসুফ। পোশাককর্মী চাচাতো ভাইয়ের কাছে বেড়াতে গত ২৩ এপ্রিল সাভারে আসেন তিনি। ২৪ এপ্রিল সকালে ভবনধসের খবর শুনে ওই ভাইকে খুঁজতে ধ্বংসস্তূপে যান। পরে সেখানে উদ্ধারকাজে লেগে যান। ২৫ এপ্রিল ঘাড়ে ভারী কিছুর আঘাতে ব্যথা পেয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তখন থেকেই চার হাত-পা নড়াতে পারছেন না তিনি। ঢাকা মেডিকেল থেকে ১ মে তাঁকে অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ২৫ মে সিআরপিতে আনা হয়।
চিকিৎসক মেহেদি হোসেইন জানান, মেরুদণ্ডে আঘাতের কারণে ইউসুফের চার হাত-পাই অবশ হয়ে গেছে। শুয়ে থাকতে থাকতে তাঁর পিঠে ঘা হয়ে গেছে। তাঁর সুস্থ হওয়াটা প্রায় অসম্ভব।
মেরুদণ্ডে আঘাতের কারণে স্থায়ী পক্ষাঘাতের শিকার আরেকজন মরিয়ম বেগম (৪১) তাঁর স্বজনেরা। মরিয়মের স্বামী আনোয়ারুল বলেন, ঈদের পর তাঁকে আবারও সিআরপিতে নিয়ে যাবেন, প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য।
আহত মরিয়ম বলেন, দুই ছেলে ও এক মেয়ে তাঁর। বড় ছেলে ও মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ভবনধসে তিনি আহত হওয়ার পর থেকে ছোট ছেলে জুতার কারখানার কাজ ছেড়ে সারা দিন তাঁর সঙ্গেই থাকছেন। স্বামী আনোয়ারুল ঢাকায় রিকশা চালাতেন। তিনিও রিকশা চালানো বাদ দিয়েছেন।
মরিয়ম বলেন, পঙ্গু হাসপাতালে থাকার সময় বিভিন্নজনের কাছ থেকে প্রায় এক লাখ টাকা সাহায্য পেয়েছিলেন। সেই টাকাতেই এখনো পরিবার চলছে। তবে কত দিন এভাবে চলবে, তা জানেন না তিনি।
সূত্র - প্রথম আলো

