মিছিলের শুরু গত মার্চের শ্রীলঙ্কা সফরের আগে আগে। শিন বোনের চোটের জন্য সাকিব আল হাসান গেলেনই না শ্রীলঙ্কায়। পায়ের ব্যথা নিয়ে সফরে গিয়েই ফিরে এলেন নাজমুল হোসেন। আরেক পেসার আবুল হাসান আর ব্যাটসম্যান তামিম ইকবালেরও চোট সঙ্গী হলো দেশে ফেরার সময়। পরের মাসে জিম্বাবুয়ে সিরিজেও বয়ে চলল চোট-আঘাতের এই ঝড়।
বাংলাদেশের ক্রিকেট চোট-আঘাতে জর্জরিত আসলে এক-দেড় বছর ধরেই। আর চোট মানেই চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, বিদেশে পাঠানো, সে সঙ্গে বিপুল খরচও। খেলোয়াড়দের উন্নত চিকিৎসার ব্যাপারে কখনোই আপস করা উচিত নয়, বিসিবি সেটা করেও না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠিয়ে এত বেশি খেলোয়াড়ের চিকিৎসা করাতে হয়েছে যে টাকার অঙ্কটা নিয়ে না ভেবে এখন আর উপায় নেই।
২০১০ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে গিয়ে হাতের অস্ত্রোপচার করিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। সেই থেকে শুরু করে গত মাসে অস্ট্রেলিয়ায় হাঁটুর অস্ত্রোপচার করিয়ে আসা নাজমুলের চিকিৎসা খরচসহ শুধু খেলোয়াড়দের বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করাতেই বিসিবির খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের জন্য আবুল হাসানকেও অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হলে এই অঙ্কটা চলে যাবে এক কোটির কাছাকাছি। আবুল হাসানের অস্ত্রোপচার তাই অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মতো ব্যয়বহুল দেশে না করিয়ে ভারত, থাইল্যান্ড কিংবা আশপাশের কোনো দেশে করানো যায় কি না, খোঁজখবর নিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, কম খরচে সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে চিকিৎসার জন্য ভবিষ্যতে হয়তো আর দূরদেশে পাঠানো হবে না ক্রিকেটারদের। বিসিবির ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী কাল বলছিলেন, ‘এটা থেকে আমরা একটা শিক্ষাই নিচ্ছি বলতে পারেন। ভবিষ্যতে হয়তো এসবের জন্য একটা পলিসি করা হবে। যেটার জন্য ভারতে বা ব্যাংককে পাঠালে হয়, সেটার জন্য কেন অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডে পাঠানো হবে, এসব নিয়ে চিন্তার সময় এসেছে।’
অন্যান্য অস্ত্রোপচারের তুলনায় মেরুদণ্ডের অস্ত্রোপচারের খরচ অনেক বেশি। আবুল হাসানকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো হলে শুধু অস্ত্রোপচারের জন্যই লাগবে ২০-২২ লাখ টাকা, সঙ্গে বিমানভাড়া ও আনুষঙ্গিক মিলিয়ে সম্ভাব্য মোট খরচ ৩০ লাখ টাকার মতো। থাইল্যান্ডে করালে লাগবে ১০ লাখের মতো, ভারতে ৮ লাখ ও বাংলাদেশে ৬ লাখ টাকা।
এর আগের সর্বোচ্চ খরচটা ছিল রুবেল হোসেনের কাঁধের অস্ত্রোপচারে। অস্ট্রেলিয়ায় অস্ত্রোপচার করাতে তাঁর জন্য সব মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় ১৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নাজমুলের অস্ত্রোপচারে লেগেছে প্রায় ৬ লাখ টাকা, সাকিবের অস্ত্রোপচারে প্রায় ১০ লাখ টাকা, তামিমের প্রায় ১০ লাখ টাকা, আবুল হাসানের গোড়ালির অস্ত্রোপচারে প্রায় ৫ লাখ টাকা ও শুভাশিষ রায়ের হাঁটুর অস্ত্রোপচারে ৪ লাখ টাকার মতো।
অস্ত্রোপচার যদি না-ও লাগে, বিদেশে গিয়ে শুধু ডাক্তার দেখিয়ে এলেও খরচ হয় ভালোই। কিছুদিন আগে তরুণ পেসার তাসকিনকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো বাবদ যেমন ৩ লাখ টাকা খরচ করেছে বিসিবি। গত এপ্রিলে জিম্বাবুয়ে থেকে ফেরার পথে দক্ষিণ আফ্রিকায় ডাক্তার দেখিয়ে আসেন নাসির আর শফিউলও। দুজনের পেছনে খরচ হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ টাকার মতো।
এখন পর্যন্ত বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসায় বিসিবির সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে মাশরাফি বিন মুর্তজার পেছনে। ২০০২ সাল থেকেই চোট-আঘাতের সঙ্গে লড়তে থাকা এই পেস বোলারের দুই হাঁটুতে এখন পর্যন্ত সাতবার অস্ত্রোপচার হয়েছে। এ ছাড়া পিঠের ব্যথা আর গোড়ালির সমস্যার জন্যও কখনো কখনো বিদেশি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়েছে তাঁকে। বিসিবি সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু মাশরাফির বিদেশে চিকিৎসা বাবদ খরচ হয়েছে এ পর্যন্ত ৫০ লাখ টাকার কাছাকাছি। চিকিৎসা করাতে দেশের বাইরে গেলে হাসপাতাল, ডাক্তার ও যাতায়াত খরচের বাইরে ৫০ ডলার করে দৈনিক ভাতা পান ক্রিকেটাররা, সঙ্গে হোটেল খরচ হিসেবে প্রতিদিন ১০০ ডলার।
ক্রিকেটাররাই ক্রিকেটের প্রাণ। তাঁদের ফিটনেস বা সুস্থতার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ারও প্রশ্ন ওঠে না। তবে একই চিকিৎসা যদি অর্ধেক খরচে কাছের দেশে সম্ভব হয়, তাহলে কেন শুধু শুধু ঢাকা টু মেলবোর্ন-সিডনির বিমান ধরা?
সূত্র - প্রথম আলো

