যে কোন বাঙালি নারীর কাছে সোনার অলঙ্কার অত্যন্ত লোভনীয়। সোনা নিয়ে অনাসৃষ্টিও কম হয় না। সোনা নিয়ে দর কষাকষিতে যে কত বিয়ে ভেঙে গেছে, তার কোন হিসেব নেই। আবার সোনার জন্য ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি এমনকি হত্যার মতো অপরাধও ঘটে চলেছে অহরহ। সকলের আদরণীয় সেই সোনার গয়না তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় এসিড। আর এতেই যত বিপত্তি।
সোনা থেকে খাঁদ বের করার জন্য এটিকে পোড়ানো হয় নাইট্রিক এসিড দিয়ে। আর সোনার সৌন্দর্য্য বাড়ানোর জন্য এতে ব্যবহার করা হয় সালফিউরিক এসিড। নাইট্রিক এসিড দিয়ে সোনা খাঁটি করার সময় যে ধোঁয়া বের হয়, তা বাতাসের সাথে মিশে বিষাক্ত অম্লীয় বাষ্পে রূপ নেয়। নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডযুক্ত ঐ বাতাস শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এতে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হূদরোগসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। এসিডের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় চালের টিন, এমনকি লোহাও বিনষ্ট হয়। পুকুরের মাছ মরে যায়। এমনটিই ঘটছে নাটোর পৌরসভার লালবাজার, কাপুড়িয়াপট্টি, পিলখানাসহ কয়েকটি মহল্লায়। এই এলাকায় অর্ধ শতাধিক সোনার দোকান আছে। নাটোর স্বর্ণকার কারিগর সমিতির সভাপতি ইন্দ্রকুমার সরকার জানান, সোনার কাজে যে এসিড ব্যবহার করা হয় তার ধোঁয়ায় শরীরের কিছু সমস্যা হয়। চালের টিনও ফুটো হয়ে যায়।
এসিড বিক্রির জন্য নাটোরে চারটি দোকানকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এসিডের ক্রেতা ৬৫জন স্বর্ণ ও ব্যাটারি ব্যবসায়ী এবং ৫৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসিড বিক্রেতা চলনবিল ট্রেডার্সের মালিক ইউসুফ আলী জানান, তার দোকানে সালফিউরিক, নাইট্রিক, কার্বলিক, হাইড্রোক্লোরিক প্রভৃতি এসিড আছে। লাইসেন্স ছাড়া কোন ক্রেতার কাছে এসিড বিক্রি করা হয় না। স্বর্ণকারেরা কেবল নাইট্রিক ও সালফিউরিক এসিড কেনেন।
নাটোরে সোনার কারখানা স্থাপনের আগে বা পরে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কোন অনুমতি নেয়া হয়নি। অধিকাংশ স্বর্ণ ব্যবসায়ী ভ্যাট ও আয়কর দেন না। যে কয়েকজন দেন তাও পরিমাণে অনেক কম।
নাটোর নবাব সিরাজউদ্দৌলা সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম জানান, নাইট্রিক এসিডে নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড আছে, যা মানবদেহ ও পবেশের জন্য ক্ষতিকর। সালফিউরিক এসিডেও প্রায় একই রকম ক্ষতি হয়। এর প্রভাবে মানুষের শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ছাড়াও হার্টের সমস্যা হতে পারে। নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালের চিকিত্সকদের প্রায় সকলেই একই মত প্রকাশ করেছেন।
নাটোর শহরের লালবাজার, কাপুড়িয়াপট্টি ও পিলখানা ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে বহুতল বিশিষ্ট বেশ কিছু ভবন রয়েছে। এই মহল্লার মানুষ সোনার কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার জন্য কিছুদিন পূর্বে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। এ ব্যাপারে নাটোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাফরউল্লাহ জানান, এলাকার জনসাধারণ সোনার কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সুবিধাজনক স্থান ও নিরাপত্তাজনিত কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
নাটোর জেলা জুয়েলারি মালিক সমিতির সভাপতি স্বপন কুমার পোদ্দার এসিডের ব্যবহার ও এর ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করে জানান, কারখানাগুলোতে লম্বা পাইপ দিয়ে ধোঁয়া বের করে দেয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দোকান ও কারখানার জন্য লাইসেন্স নেয়া হয়েছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেই।
সূত্র - দৈনিক ইত্তেফাক

