‘ইউজার ফি’ (রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ নেওয়া টাকা) বণ্টন নিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ শুরু হয়েছে। তিন বছর পর এই টাকা বণ্টনের নির্দেশ দেওয়ার প্রায় তিন মাস পর আবার তা স্থগিত করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
আগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর কয়েকটি হাসপাতালে ওই খাতে জমা হওয়া টাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টনও করা হয়েছে। কিন্তু নতুন স্থগিতাদেশের কারণে অন্য হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ওই টাকা পাননি।
জানা গেছে, বিদ্যমান নিয়মে কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ইউজার ফির অংশ পান। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের পর সে অনুযায়ীই টাকা বণ্টন হয়েছে। কিন্তু বণ্টনের এই ব্যবস্থায় আপত্তি ওঠে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে। এর পরই বণ্টন আবার স্থগিত করে দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে ইউজার ফির অংশ বাবদ জমা হওয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি।
ইউজার ফির অংশ চেয়ে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের নার্স, কর্মচারীদের একাংশ আন্দোলনও করছেন। তাঁরা পরীক্ষা-নিরীক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মচারী নন। দাবি মেনে নেওয়ার জন্য তাঁরা আগামী সোমবার পর্যন্ত চূড়ান্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। এই বণ্টনব্যবস্থা ও বণ্টন স্থগিত করা নিয়ে ঢাকা মেডিকেল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি হাসপাতালসহ রাজধানীর বাইরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা ও সদর হাসপাতালেও অসন্তোষ চলছে।
ইউজার ফি: সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনা মূল্যে হলেও রোগীর দেওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ ফি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা হতো। ১৯৮৪ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক স্মারকে জানায়, রোগীদের দেওয়া টাকার ৫০ শতাংশ সরকারি খাতে জমা হবে। বাকি ৫০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে পদ অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে। তখন থেকে ২০১০ সালের প্রথম দিকে এই বণ্টন স্থগিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা এভাবে টাকা পেয়েছেন।
ওই নিয়ম অনুযায়ী, প্রধানত পরীক্ষাগার (প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, হিস্টোপ্যাথলজি, ব্লাড ট্রান্সফিউশন), এক্স-রে (রেডিওলজি ও ইমেজিং) এবং রেডিওথেরাপি—এসব সেবাসংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর অধ্যাপক থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সবাই ইউজার ফির অংশ পেতেন।
কাগজপত্রে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে ৪৭০টি খাত থেকে রোগীরা অর্থের বিনিময়ে সেবা পায়। সব খাতে সেবাদানকারীর স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নেই। যাদের ঝুঁকি নেই তাদের এই টাকা দেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু প্রায় তিন বছর ওই টাকা বণ্টন বন্ধ থাকায় এ খাতে বিপুল অর্থ জমা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মূল বেতনের চেয়ে ইউজার ফি থেকে পাওয়া অর্থের পরিমাণ বেশি। তাই ইউজার ফির ভাগ পান না—এমন একটি অংশের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ আছে। তাদের দাবি, ইউজার ফি হাসপাতালের সব চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে পদ অনুযায়ী বণ্টন করতে হবে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই টাকা নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না। তবে এখন টাকার পরিমাণ বেশি হওয়ায় এতে ভাগ বসাতে চাইছেন অন্যরা।
একই হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন টেকনোলজিস্ট বলেন, হাসপাতালে কিছু মানুষকে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। যেমন এক্স-রে বিভাগে যাঁরা দীর্ঘদিন কাজ করেন, তাঁদের ক্যানসারসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ঝুঁকি নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, সরকার ইউজার ফি তাঁদের মধ্যে বণ্টনের কথা বলেছিল।
সূত্র জানায়, ইউজার ফির অর্ধেক হিসাবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টনের জন্য হূদরোগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে দুই কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ঢাকা মেডিকেলে আছে তিন কোটি ৯৮ লাখ টাকা।
আইনি লড়াই: ২০১০ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ নামের সংগঠনের করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ইউজার ফি বণ্টন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। এর পর থেকে এ বাবদ নেওয়া অর্থের পুরোটাই সরকারি কোষাগারে জমা হয়। সরকারপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই স্থগিতাদেশ স্থগিত করেন। এরপর চলতি বছরের ৫ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আগের মতো সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে ইউজার ফি বণ্টনের জন্য চিঠি দেয়।
এ-সংক্রান্ত চিঠি পাওয়ার পর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ খাতে জমা হওয়া টাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দিয়েছে। ওই হাসপাতালের উপপরিচালক উত্তম বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, আগে যাঁদের এই টাকা দেওয়া হতো তাঁদেরই দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেও একইভাবে বণ্টন হয়েছে। খুলনা মেডিকেলসহ আরও বেশ কিছু সরকারি হাসপাতালে একইভাবে টাকা দেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল ও হূদরোগ হাসপাতালে বিরোধ দেখা দেওয়ায় মন্ত্রণালয় প্রথমে কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে বণ্টন বন্ধ রাখতে বলে। পরে ১৪ জুলাই সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে এই অর্থ বণ্টন স্থগিত রাখার লিখিত নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশে ক্ষুব্ধ হয়েছেন যাঁরা, এত দিন ইউজার ফির অংশ পাচ্ছিলেন তাঁরা। হূদরোগ হাসপাতালের একজন টেকনোলজিস্ট প্রথম আলোকে বলেন, ‘এতকাল যাঁরা এই টাকা পেয়েছেন, তাঁদেরই টাকা দিতে হবে। অন্যদের দিতে হলে নতুন বিধিবিধান করে দিতে হবে।’
এদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের একাংশকে ওই টাকা দেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের স্থগিত রাখার চিঠি পেয়ে অন্যদের দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে হাসপাতালে অসন্তোষ চলছে।
তাঁরা জানেন না: এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার এবং আবার স্থগিত করার বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।’
তবে মন্ত্রণালয়ের ২ মার্চের স্মারকে মহাপরিচালকের মাধ্যমে সব সিভিল সার্জনকে ইউজার ফি বণ্টন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি জানাতে বলা হয়েছিল।
অবশ্য স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, টাকা বণ্টনের সব ধরনের উদ্যোগ স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় শিগগির এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বেশ কিছু হাসপাতালে ইতিমধ্যে টাকা বণ্টন হওয়ার বিষয়টি তিনিও জানেন না বলে জানান।
সূত্র - প্রথম আলো

