বাংলাদেশে মাছের উত্পাদন আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু আমাদের বিশুদ্ধ প্রোটিনের উত্স এবং তার চাষযোগ্য জলাভূমিকে আমরা যেভাবে অবক্ষয় করে চলেছি, তাই এই বিশুদ্ধতা মাত্রা আজ বড়ই প্রশ্নবিদ্ধ। ফরমালিনবিহীন মাছ পাওয়া এখন আমাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়াও মাছের মাংসে নিষিদ্ধ নাইট্রোফিউরান, ক্লোরামফেনিকল, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবস্ট্যান্স, অ্যানথালমিনটিক্স, মাইকোটক্সিন, অর্গানোক্লোরাইড পেস্টিসাইড এবং বিষাক্ত ভারী ধাতুসহ অন্যান্য উপাদান পাওয়া গেছে। এক সময় বাংলাদেশে ৭শ'র ওপর নদ-নদী ছিল। বর্তমানে ২৩০টি নদ-নদীর যে তথ্য পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক পাওয়া যায় তার মধ্যে ১শ'র কাছাকাছি সংখ্যক নদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখা গেছে। মাছে-ভাতে বাঙালি খ্যাত জাতিটি সত্যিই মাছের সংকটে ভুগছে। কেননা নদ-নদী বিলীন হয়ে যাওয়া, জলাভূমির অস্তিত্ব সংকট ও সংকোচন, দেশীয় ২৩০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১শ'র কাছাকাছি প্রজাতির সংকটাপন্ন অবস্থা, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মাছের চাহিদা ইত্যাদি কারণে মত্স্যসম্পদ আজ কঠিন সংকটের মুখে পতিত। এ অবস্থা হতে উত্তরণের নিমিত্তে সরকারসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার উত্সাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্রতি বছর জুলাই-আগস্ট মাসে ৭ দিনব্যাপী "মত্স্য সপ্তাহ" পালন করে থাকেন। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও সরকার এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন ২-৮ জুলাই এই মত্স্য সপ্তাহ উদযাপন করছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো "মাছে মাছে ভরবো দেশ, গড়বো সোনার বাংলাদেশ" যা আজ ও আগামী দিনের বাংলাদেশের মানুষের জন্য খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। আমাদের মাছের সংকট উত্তরণের জন্য এ ধরনের প্রতিপাদ্য বিষয় আমাদেরকে শুধু উত্সাহিত করে না, বরং এ সম্পর্কে জানা, বোঝা ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে উদ্দীপ্ত করে। তবে আমাদের মত্স্য সেক্টরকে উন্নত বিশ্বের ন্যায় শিল্পে রূপান্তরিত করতে সরকার এবং উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি মত্স্য বিজ্ঞানীদের আরো উন্নত জাতের মাছের আবিষ্কার ও চাষ পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে।
বাংলাদেশে মাছ উত্পাদনের এখনো অবারিত সুযোগ রয়েছে। এদেশে অভ্যন্তরীণ ৪৭.০৪ লাখ হেক্টর জলায়তনসহ সামুদ্রিক জলাশয়ে বর্তমানে ৩০.৬১ লক্ষ মেট্রিক টন মাছ উত্পাদন হচ্ছে, যা সহজেই দ্বিগুণ হতে তিনগুণ কিংবা তারও অধিক উত্পাদন করা সম্ভব। এদেশে পুকুর-দীঘিতে কার্প জাতীয় মাছের বর্তমান গড় উত্পাদন মাত্রা ১২ কেজি/শতাংশ, তেলাপিয়া কিংবা পাঙাশের গড় উত্পাদন ২৫ কেজি/শতাংশ। বর্তমানে আমাদের দেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তেলাপিয়ার সর্বোচ্চ গড় উত্পাদন ৪৫-৫০ কেজি/শতাংশ/ক্রপ এবং পাঙাশের গড় উত্পাদন ৮০-১০০ কেজি/শতাংশ/ক্রপ। অথচ থাইল্যান্ড কিংবা ভিয়েতনামে তেলাপিয়া ও পাঙাশের গড় উত্পাদন যথাক্রমে ১,০০০-১,২০০ কেজি/শতাংশ/ক্রপ এবং ২,০০০-২,৫০০ কেজি/শতাংশ/ক্রপ। আমাদেরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এসব মাছের উত্পাদন বাড়ানোর। বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ফিশ-বাংলাদেশ ইউএসএইআইডি'র অর্থায়নে বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলায় পাঙাশের সুপার ইনটেনসিভ অ্যাকুয়াকালচার পদ্ধতির একটি পাইলট প্রকল্প অনেক দূর এগিয়েছে, যেখানে ১,০০০-১,২০০ কেজি/শতাংশ/ক্রপ উত্পাদন হবে বলে এফটিএফ অ্যাকুয়াকালচারের বিশেষজ্ঞগণ আশা করছেন। বাংলাদেশে এই ধরনের চাষ পদ্ধতি এই প্রথম, যা আগামী ডিসেম্বর ১৩'র মধ্যে ক্রপ সাইকেলটি শেষ হবে। ফলে দেশে মত্স্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে এক নতুন বিল্পবের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আমাদের দেশের ছোট মাছগুলো বিশুদ্ধ প্রোটিনের এক অনন্য উত্স। মলা, দারকিনা, ঢেলা, পুঁটিসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট প্রজাতির মাছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন ও মিনারেলস পাওয়া গেছে, যা বড় মাছের তুলনায় কয়েকশ' গুণ বেশি। এসব মাছ ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-এ, আয়রন, জিঙ্ক, ফসফরাস, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডসহ আরো অনেক ধরনের অনুপুষ্টি বিদ্যমান। গবেষণায় জানা গেছে, সকল ধরনের প্রাণিজ উেসর মধ্যে ভিটামিন-এ'র প্রধান পাঁচটি উত্স ক্রমান্বয়ে মুরগির কলিজা, মলা মাছ, চান্দা মাছ, দারকিনা মাছ ও তিতপুঁটি। আয়রনের প্রধান পাঁচটি উত্স ক্রমান্বয়ে দারকিনা মাছ, মুরগির কলিজা, চাপিলা মাছ, মলা মাছ এবং সিলভার কার্প মাছ । জিঙ্ক-এর প্রধান পাঁচটি উত্স যথাক্রমে দারকিনা মাছ, তিতপুঁটি, গরুর মাংস, টেংরা মাছ এবং মুরগির কলিজা । এই গবেষণা হতে আমরা দেখতে পাই, ছোট ছোট মাছগুলো আমাদের বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। শিশুদের মেধা ও মানসিক বিকাশে ছোট মাছের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।
আমাদের দেশের মত্স্যসম্পদ বৃদ্ধির যে অবারিত সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে তা কাজে লাগাতে পারলে আমাদের দেশের মানুষের প্রতিবছর স্বাস্থ্য ও চিকিত্সা বাবদ কোটি কোটি টাকার যে অপচয় হয় কিংবা মা ও শিশু অকালে ঝরে যাওয়ার যে গতি- প্রকৃতি তা দ্রুতই কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব। মানুষের সুস্থতার নিশ্চয়তায় নিরাপদ খাদ্য ও বিশুদ্ধ প্রোটিনের একমাত্র উত্স মাছ। মত্স্য সপ্তাহের প্রতিপাদ্য বিষয়ের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই:মাছের উত্পাদন বাড়ুক, নিরাপদ মাছের সরবরাহ নিশ্চিত হোক এবং বিশুদ্ধ প্রোটিনের প্রতি মানুষের সচেতনতা দিন দিন বৃদ্ধি পাক এমনটিই হোক আজকের দিনের প্রত্যাশা।
সূত্র -দৈনিক ইত্তেফাক

