সন্দেহভাজন হেফাজত কর্মীর হামলায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আরিফ রায়হান মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আরিফ বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়তেন। তিনি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন।
নিহত আরিফ বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের একটি কক্ষে থাকতেন। গত ৯ এপ্রিল ওই হলের এক ছাত্র তাঁকে কুপিয়ে দ্রুত পালিয়ে যান। এর পর থেকেই তিনি অচেতন অবস্থায় হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।
আরিফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে তাঁর স্বজন ও বন্ধুবান্ধব হাসপাতালে ছুটে যান। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। হাসপাতাল থেকে লাশ বুয়েটে আনার পর সেখানেও এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বুয়েটে জানাজায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আরিফের বাবা, ভাইসহ আত্মীয়স্বজন অংশ নেন। জানাজার পর লাশ পিরোজপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
আরিফের ওপর হামলার ঘটনায় চকবাজার থানায় তাঁর ভাই বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মামলাটি তদন্ত করছে। পুলিশ এ ঘটনায় বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মেজবাহকে আটক করে। এ মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
ডিবির কর্মকর্তারা জানান, পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে মেজবাহ স্বীকার করেন, গত ৬ এপ্রিল ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে আসা লোকজনকে খাবার সরবরাহ করায় বুয়েটের একটি হলের মসজিদের ইমামকে মারধর করে পুলিশে দিয়েছিলেন আরিফ ও তাঁর বন্ধুরা। এ কারণেই তিনি আরিফের ওপর এ হামলা চালান। ডিবি জানায়, মেজবাহ স্বীকার করেন তিনি হেফাজতে ইসলামের সক্রিয় সমর্থক। গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
তবে হামলাকারী ছাত্রের ভগ্নিপতি আশরাফুজ্জামান গতকাল প্রথম আলোকে জানান, মেজবাহর মামলা নিয়ে তাঁরা কিছুই করবেন না। তাঁদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের আইনি লড়াইয়ে গিয়ে তাঁদের কোনো লাভ হবে না।
এদিকে বুয়েটের প্রশাসনিক তদন্তেও এ ঘটনার জন্য মেজবাহকে দায়ী করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া ওই মসজিদের ইমামকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
বুয়েটের উপাচার্য এস এম নজরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, এটা মর্মান্তিক ঘটনা। একজন শিক্ষার্থীকে আরেকজন শিক্ষার্থী এভাবে আঘাত করে মেরে ফেলতে পারে, তা ভাবা যায় না। আরিফের উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান। উপাচার্য বলেন, আরিফের আত্মার মাগফিরাত কামনার জন্য আগামী শুক্রবার বুয়েটের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ আসর দোয়া ও মিলাদের আয়োজন করা হয়েছে।
পিরোজপুর প্রতিনিধি জানান, হেফাজতের কর্মীদের হামলায় বুয়েটের ছাত্র আরিফ রায়হান নিহত হওয়ার খবরে তাঁর গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুরে শোকের ছায়া নেমে আসে। আরিফ উপজেলার মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের তারাবুনিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী আলী আজমের ছোট ছেলে। মা শাহানারা বেগম সরকারি চাকরিজীবী। আরিফের ভাই রিয়াদ মোর্শেদ ঢাকায় শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে কর্মরত।
গতকাল জানাজা শেষে মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের তারাবুনিয়া গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে আরিফকে দাফন করা হয়।
সূত্র - প্রথম আলো

