খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
গতকাল সোমবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’-এর খসড়ায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের জানান, ১৯৬৯ সালের ‘পিওর ফুড অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, আইনের আওতায় ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য প্রতিষ্ঠান’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হবে, যার কাজ হবে খাদ্যপণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ সমন্বয় করে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হবে ওই আইনের মাধ্যমে। এর আওতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ফৌজদারি আদালতে বিভিন্ন অপরাধের বিচার করা হবে, যার মধ্যে বিভিন্ন ধারায় দুই বছর থেকে সাত বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে দ্বিগুণ শাস্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ওই আইনে। এ ছাড়া পাঁচ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানারও বিধান থাকছে।
খাদ্য নিয়ে মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিলে দুই বছর, নিবন্ধন ছাড়া খাদ্যপণ্য বিপণন করলে দুই বছর এবং ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত কাউকে দিয়ে খাদ্য বিক্রি করলে তিন বছর কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
সচিব জানান, ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য প্রতিষ্ঠান’ কর্তৃপক্ষকে দিকনির্দেশনা দিতে ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করা হবে, যার প্রধান থাকবেন খাদ্যমন্ত্রী। নিরাপদ খাদ্যমান নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের একটি কারিগরি কমিটি ও কারিগরি প্যানেল থাকবে বলেও মন্ত্রিপরিষদের সচিব জানান।
আবারও শ্রম আইন সংশোধন: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা স্থগিতের পর সম্প্রতি অনুমোদিত শ্রম আইনের খসড়া আরও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় (আইএলও) দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন। তিনি জানান, সরকার এই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর কলকারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
সচিব বলেন, সরকার আশা করছে, শ্রম আইনের আরও উন্নয়ন ঘটলে বাংলাদেশকে প্রদত্ত জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রিফারেন্স (জিএসপি) প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা বাতিল করেনি, স্থগিত করেছে। তাই শ্রম আইন, ২০০৬-এর সংশোধনী আবারও পর্যালোচনা করা হবে। প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন না করায় গত ২৭ জুন বাংলাদেশের পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে সংশোধিত শ্রম আইন পুনরায় যাচাই-বাছাই করে সংসদে উত্থাপনের নির্দেশ দেয়েছেন। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টি আরও যুগোপযোগী করে তাঁরা আগামী দুই মাসের মধ্যে জিএসপি স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের চেষ্টা করবেন।
মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য আইন: বিকল্প শিশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহূত যেকোনো ধরনের কৌটাজাত বা প্যাকেটজাত গুঁড়া দুধ, কৃত্রিম শিশুখাদ্য ব্যবহারের সরঞ্জামের জন্য বিজ্ঞাপন তৈরি, প্রদর্শনী, বিতরণ, প্রচার বা প্রকাশ করলে শাস্তি হবে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও উহার ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন, নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি) আইন, ২০১৩’ শীর্ষক ওই আইনে নিবন্ধন ছাড়া শিশুখাদ্য প্রক্রিয়াজাত করা যাবে না। এ ছাড়া প্যাকেটজাত বা কৌটাজাত শিশুখাদ্য আমদানি, বিতরণ, সংরক্ষণ ও বিক্রির চেষ্টা বা বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা যাবে না বলেও আইনে বিধান রাখা হয়েছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটির খসড়া চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পেয়েছে। আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি পুনরায় আবার একই অপরাধ করেন, তাহলে সর্বোচ্চ যে দণ্ড রয়েছে, তার দ্বিগুণ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। নতুন আইনে প্রতিষ্ঠানকেও শাস্তির আওতায় আনার বিধান রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, এ আইনের ফলে মায়ের দুধের যে কোনো বিকল্প হয় না, সে বিষয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়বে। এ ছাড়া শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে আগ্রহ বাড়বে। এ ছাড়া আইনটির ভালো দিক হচ্ছে, এতে বিকল্প শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনের সভাপতি এস কে রায় প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানের আইনটিতে আন্তর্জাতিক নীতিমালার প্রায় বেশির ভাগ ধারাই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী জরুরি ও দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায়ও কেউ বিকল্প শিশুখাদ্য বিতরণ করতে পারবে না। শিশুখাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া বা পাওয়ার ক্ষেত্রেও আইনে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুগান্তকারী এই আইন যাতে দ্রুত জাতীয় সংসদে পাস হয়, তার দাবি জানান এস কে রায়।
সূত্র - প্রথম আলো

