বিশৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে চলছে শিশুদের জন্য দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সাসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা শিশু হাসপাতাল। গত ছয় মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সভা হয়নি। বোর্ডের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেছেন গত মার্চে; কিন্তু এখন পর্যন্ত নিয়োগ দেয়া হয়নি নতুন চেয়ারম্যান। এমনকি বোর্ডের চেয়ারম্যান নিয়োগ বিধি কিংবা বোর্ডের মেয়াদকাল কী হবে তাও নির্ধারণ হয়নি। হাসপাতালের কর্মকাণ্ড পরিচালনে নেই কোন অধ্যাদেশ। প্রতিষ্ঠার ৩৯ বছর ধরেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ইচ্ছামতো চলে শিশু হাসপাতালের কার্যক্রম।
শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিত্সাসেবার বৃহত্তর স্বার্থে অধ্যাদেশ গঠনে বহুবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি। এর ফলে যে সরকার আসে তারা তাদের মতো করে হাসপাতালের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। আর সরকার দলীয় চিকিত্সক নেতাদের মর্জির উপর নির্ভর করে শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্মকাণ্ড।
শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. মাহমুদুর রহমান গত ১০ মার্চ পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে পদত্যাগের কারণ ব্যক্তিগত বলে উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু শিশু হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পদত্যাগের ভিন্ন কারণ। স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) স্থানীয় কিছু নেতা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেয়ার জন্য চেয়ারম্যানকে চাপ দিচ্ছিলেন। নেতারা তাকে নানাভাবে হয়রানি করেন ও মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছিলেন। তাদের অনৈতিক দাবি মানতে রাজী হননি চেয়ারম্যান। পরে তিনি শিশু হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে তাদের অন্যায্য দাবির প্রতিবাদ করেছেন বলে জানিয়েছেন কয়েকজন চিকিত্সক। চেয়ারম্যান না থাকায় গত ছয় মাস ধরে বোর্ডের সভা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। হাসপাতাল পরিচালনার মূল দায়িত্ব এই বোর্ডের উপর। ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল প্রফেসর ডা. মাহমুদুর রহমানকে চেয়ারম্যান করে ১৫ সদস্যের শিশু হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ড গঠন করা হয়।
এদিকে, বাত্সরিক ব্যয় নির্বাহে হাসপাতালের অর্থনীতি সংক্রান্ত কমিটি ২৫ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তুত করলেও সভা না হওয়ায় ওই বাজেট পাস করা যায়নি।
চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলে কিংবা চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে বোর্ড কে পরিচালনা কিংবা কে সভাপতিত্ব করবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই। আবার সভায় কতজন সদস্য থাকবে ও কোন পর্যায়ের সদস্য বোর্ডে থাকবেন কিংবা বোর্ডের মেয়াদকাল কত তাও ঠিক করা নেই।
হাসপাতালের পরিচালক ও পদাধিকার বলে বোর্ডের সদস্য সচিব বর্তমানে হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
জানা গেছে, বোর্ডের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করার পর হাসপাতাল পরিচালক দুই দফা স্বাস্থ্য সচিবকে চিঠি দিয়ে চেয়ারম্যান নিয়োগের অনুরোধ জানান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সভা না হওয়ায় হাসপাতাল পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে চিকিত্সা সেবার উপর। হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, চিকিত্সক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পেতে বোর্ডের অনুমোদনের প্রয়োজন। চিকিত্সাসামগ্রী ক্রয় ও বন্টনও বোর্ডের মাধ্যমে করতে হয়। মোট কথা, বোর্ডের অনুমোদনে পুরো হাসপাতালে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। সভা না হওয়ায় হাসপাতাল কার্যক্রম প্রায় অচল বলে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান।
বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিএমএর এক জুনিয়র নেতাকে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব দিলে চিকিত্সকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তারা বলছেন, দেশের প্রখ্যাত চিকিত্সক কিংবা স্বাচিপের কোন জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হোক। এতে এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটির জন্য মঙ্গলজনক হবে। চিকিত্সকদের আপত্তির কারণেই এখনো চেয়ারম্যান নিয়োগ হচ্ছে না।
হাসপাতাল পরিচালক অধ্যাপক ডা. মুনজুর হোসেন বলেন, বোর্ডের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। দ্রুত বোর্ডের কার্যক্রম শুরু না হলে চিকিত্সাসেবায় সমস্যা দেখা দিবে। পরিস্থিতি নিরসনে তিনি মন্ত্রণালয়কে অভিহিত করেছেন বলে জানান।
১৯৭৪ সালে রাজধানীতে শিশুদের চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ এই হাসপাতালটি সর্বশেষ শিশুদের হূদরোগের সকল ধরনের সার্জারি চালু, এনজিওগ্রাম ও ডিএনএ পরীক্ষাসহ অত্যাধুনিক পরীক্ষা নিরীক্ষা ও চিকিত্সা সেবা প্রতিষ্ঠান লাভ করেছে। বর্তমানে হাসপাতালটির বেড সংখ্যা ৫৬০। এটি একটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট।
সূত্র - দৈনিক ইত্তেফাক

