রাজধানীসহ সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ ব্লাড ব্যাংক। বিপজ্জনক পেশাদার রক্তদাতা (ডোনার) কিংবা মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের রক্ত কিনে ওই ব্লাড ব্যাংকগুলো। আর বিভিন্ন রোগীকে দেয়া হচ্ছে জীবাণুবাহী দূষিত রক্ত। এতে রোগীর জীবন রক্ষাতো হয়ই না উল্টো সারাজীবন বহন করতে হচ্ছে নতুন নতুন রোগ। শুধু রাজধানীতেই অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা শতাধিক। দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বিভিন্ন সভা-সেমিনারসহ গণমাধ্যমের মাধ্যমে মানুষজনকে সতর্ক করে বলেছেন, পেশাদার রক্তদাতা ও মাদকাসক্ত রক্তদাতাদের রক্তে এইডস, হেপাটাইটিস বি ও সিসহ জটিল ব্যাধির জীবাণু থাকতে পারে। তাই রক্ত নেয়ার আগে ভেবে দেখতে বলেছেন রক্ত নিরাপদ কিনা?
সারাদেশে এসব ভুয়া ব্লাড ব্যাংকতো আছেই, খোদ রাজধানীতে স্বাস্থ্য প্রশাসনসহ বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে অবৈধ রক্ত কেনাবেচা। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও দেখে না দেখার ভান করছে। অভিযোগ আছে, ওইসব অবৈধ ব্লাড ব্যাংক থেকে স্থানীয় প্রশাসন, একশ্রেণীর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিচ্ছে নিয়মিত মাসোহারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায় যে, রাজধানীসহ সারাদেশে ৭২টি বৈধ বেসরকারি ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। আর অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের সংখ্যা ৫ শতাধিক।
সেখানে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সংগ্রহ করা হয় রক্ত। রক্ত সংরক্ষণের জন্য নেই ব্যবস্থা। এমনকি রক্তদাতার শরীরে কোন রোগ জীবাণু আছে কিনা তাও পরীক্ষা করা হয় না।
এদিকে গতকাল বুধবার র্যাব-৭-এর উপ-অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার মো. নাজমুল হকের সহায়তায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট চট্টগ্রামের চকবাজার এবং জিইসির মোড়ে চট্টগ্রাম সিটি ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চালায়। কোন বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই চালু হয়েছে এ ব্লাড ব্যাংক। পেশাদার ডোনার ও মাদকাসক্তদের কাছ থেকে রক্ত কিনে শংকটাপন্ন রোগীদের কাছে বিক্রি করছিল তারা। এই ব্লাড ব্যাংকের পাশেই অবস্থিত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল। ওই হাসপাতালের রোগীদের এখান থেকে রক্ত দেয়া হচ্ছে। এছাড়া আশপাশের বেসরকারি ও সরকারি হাসপাতালে ওই বিপজ্জনক ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত বিক্রি করার প্রমাণ পায় মোবাইল কোর্ট। অভিযানের সময় দুই মাদকাসক্ত যুবকের দেহ থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে দেখেছে মোবাইল কোর্ট। প্রতি ব্যাগ রক্ত দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা করে ওই ব্লাড ব্যাংক ক্রয় করে। রোগীদের কাছে ওই রক্ত বিক্রি করা হয় ৫শ থেকে এক হাজার টাকায়।
মাদকাসক্ত যুবকরা মোবাইল কোর্টকে জানায়, নেশার টাকা যোগাতে তারা রক্ত বিক্রি করছে। মোবাইল কোর্ট অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের মালিক মাজিদুল ইসলাম রুবেল ও স্বরূপলামকে দুই বছর করে কারাদণ্ড এবং দেড় লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও তিন মাস কারাদণ্ড দেয়। এছাড়া বিপজ্জনক রোগীকে রক্ত দেয়ার ঘটনায় মোবাইল কোর্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের তিন পরিচালক মো. সেকেন্দার, ডা. মো. আব্দুল হালিম ও ডা. ফরিদুল আলমকে ১ লাখ টাকা করে জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাস করে কারাদণ্ড দেয়। এর আগে রাজধানীর বেশ কয়েকটি অবৈধ ব্লাড ব্যাংকে অভিযান চালিয়ে পেশাদার ডোনার ও মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীদের রক্ত ক্রয় করে রোগীদের কাছে বিক্রির প্রমাণ পায় মোবাইল কোর্ট। সেসময় ১৫ জন মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণী মোবাইল কোর্টকে জানায় যে, নেশার টাকা যোগাতে তারা রক্ত বিক্রি করছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (মেডিক্যাল এডুকেশন) ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (হাসপাতাল) অধ্যাপক ডা. এমএ হান্নান বলেন, ঢাকার বাইরে অবৈধ ব্লাড ব্যাংকের বাণিজ্য বন্ধ করা সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় পরিচালকদের দায়িত্ব। তাদের ব্যর্থতার কারণে অবৈধ রক্ত ব্যবসা প্রকাশ্যে চলছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি অবৈধ ব্লাড ব্যাংক বন্ধ করা হয়েছে। অবৈধ রক্ত ব্যবসা বন্ধে অধিদফতরে গঠিত ভিজিলেন্স টিমকে আরও জোরদার করা হবে বলে তিনি জানান।
বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের বেশির ভাগ কেনাকাটা, বদলি ও নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে তাদের নজর দেয়ার সুযোগ নেই বলে মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা জানান।
খ্যাতিমান লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মবিন খান বলেন, পেশাদার ডোনারের রক্তে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ২৯ ভাগ ও সি ভাইরাস ৬ ভাগ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের অনেকের রক্তে এইচআইভি ভাইরাসও পাওয়া গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ভাইরোলজি বিভাগের ভাইরোলজিস্ট ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সীও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, পেশাদার ডোনার ও মাদকাসক্তদের সংখ্যা ২০০৭ সালের চেয়ে এখন অনেক বেশি।
সূত্র - দৈনিক ইত্তেফাক

