রাজধানীর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের মধ্যে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী ব্যাপক সংঘর্ষে দু’পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হয়েছে। শিক্ষার্থী-কর্মচারী সংঘর্ষের সময় হাসপাতালের পুরাতন ও নতুন ভবনের প্রশাসনিক দপ্তর, অপারেশন থিয়েটার (ওটি), চক্ষু বিভাগ, জরুরি বিভাগ, নাক কান গলা বিভাগ, অর্থোপেডিক্স বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে নির্বিচারে ভাঙচুর ও হামলা চালায় উভয় পক্ষ। এতে পুরো হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসা কার্যক্রম। প্রাণভয়ে অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। সংঘর্ষ চলাকালে কেউ কেউ বিভিন্ন কক্ষে অবরুদ্ধ থাকেন দীর্ঘ সময়। একপর্যায়ে রোগীর স্বজনরা তাদের রোগীদের নিয়ে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছেড়ে পার্শ্ববর্তী মিটফোর্ড হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যায়। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা অনেকেই অভিযোগ করেন, সংঘর্ষের সময় ইন্টার্নি চিকিৎসকরা জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেয়া রোগীদের বের করে দেন। তাতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েন তারা। দুপুরে জাতীয় পার্টির স্থানীয় (ঢাকা-৬) সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে উভয় পক্ষকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। হাসাপাতালের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষানবিস চিকিৎসকের সঙ্গে ওই হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর এক কর্মচারীর ‘অসদাচরণকে’ কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত হয়। গত বৃহস্পতিবার ভোরে হাসপাতালের পুরাতন ভবনের চতুর্থতলার নারী ইন্টার্নি চিকিৎসকের কক্ষে তিনজন দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী জামিল ওই কক্ষে প্রবেশ করে অশোভন আচরণ করে। এ সময় ইন্টার্নি চিকিৎসকরা চিৎকার করেন। তাদের চিৎকার শুনে সহকর্মীরা ছুটে এসে রাজীবসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী জামিলকে মারধর করে হাসপাতালের পরিচালক বরাবর অভিযোগ দাখিল করেন। এরই জের ধরে ওয়াসিম নামের এক ইন্টার্নি চিকিৎসককে বাবুল নামে এক কর্মচারী মারধর করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াসিম তার সহযোগীদের নিয়ে কর্মচারীদের সঙ্গে প্রথমে কথা কাটাকাটি ও পরে হাতাহাতিতে লিপ্ত হন। ইন্টার্নি চিকিৎসকের গায়ে হাত তোলার প্রতিবাদে শনিবার সকালের মধ্যে এর সমাধানের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। ঘটনার যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়ায় গতকাল সকালে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ও হাসপাতালের পরিচালকের অপসারণ দাবি করে কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও ভাঙচুর শুরু করেন। এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত কর্মচারীদের ওপরও হামলা করেন তারা। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী বাবুল খান, তাজুল ইসলাম, এরশাদ, মোস্তফা, সুমন, সাইফুল গুরুতর আহত হয়। তাদের মিটফোর্ড হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এছাড়া শিক্ষার্থী রুবেল, মুনতাসির, মুরাদ, আজিজসহ ৫জন আহত হন। এদেরকেও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। ঘটনার মীমাংসার জন্য প্রথম দফা বৈঠকের পর বেলা দু’টায় মেডিকেল কলেজের পরিচালনা বোর্ড কর্তৃপক্ষ ও মেডিকেল কলেজের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ। এ সময় তিনি বলেন, যে ঘটনার সূত্র ধরেই সংঘর্ষ হোক না কেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি সুষ্ঠু সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। তবে দুই দিনের মধ্যেই সমস্যার সমাধান হবে বলে তিনি জানান। হাসপাতালের পরিচালক ক্যাপ্টেন (অব.) ডা. এমএ আবদুস সালাম সাংবাদিকদের বলেন, বৃহস্পতিবার ঘটনার সূত্রপাত হলেও সমাধানে পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় হাসপাতালের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। চিকিৎসা সেবাও ব্যাহত হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম যথারীতি চলবে। দুই দিনের মধ্যেই বিষয়টির মীমাংসার জন্য সময় নেয়া হয়েছে। এদিকে সংঘর্ষে চিকিৎসাধীন হাসপাতালের রোগীদের অনেকেই আতঙ্কে হাসপাতাল ত্যাগ করে চলে যান। জুরাইন থেকে স্ত্রী রিতার সিজারিয়ান অপারেশন করাতে আসা মো. সিদ্দিক জানান, এখানে চিকিৎসা করানো নিরাপদ মনে করছি না। স্ত্রীকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী কোন হাসপাতালে চলে যাচ্ছি। শিরিন বেগম নামে একজন জানান, ছেলেকে নিয়ে আউটডোরে এসেছিলেন চিকিৎসা সেবা নিতে। সংঘর্ষের সময় দীর্ঘক্ষণ একটি কক্ষে অবরুদ্ধ ছিলেন। চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন। হাসপাতালের এনেসথেসিয়া বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, চিকিৎসক নার্স কেউ নিরাপদ বোধ করছি না। অনেকেই চলে গেছেন। হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শারমীন আক্তার জানান, দু’পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় রোগীর স্বজনদের অনেকেই রোগীদের নিয়ে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগীদের নির্ধারিত ওষুধ ও খাদ্য সরবরাহ করা যায়নি।
সূত্র - দৈনিক মানবজমিন

