এবার দেশি মুরগির স্বাদ পাওয়া যাবে ব্রয়লার (মাংস উৎপাদনকারী) মুরগিতে। শুধু তাই নয়, ব্রয়লারের মাংস হবে দেশি মুরগির মতো শক্ত ও সুস্বাদু। এ ছাড়া বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্রয়লার উৎপাদনেও কমবে খরচ, বাড়বে উৎপাদন। এমন গুণাগুণ নিয়ে 'বাউ-ব্রো-হোয়াইট' ও 'বাউ-ব্রো-কালার' নামে উন্নত জাতের ব্রয়লারের দুটি জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের এক দল গবেষক। ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদনে আমাদের নিজস্ব কোনো প্যারেন্ট স্টক না থাকায় বাইরের দেশ থেকে তা আমদানিতে প্রতিবছর ব্যয় হয় প্রায় ৯০ কোটি টাকা। দেশি মুরগির জার্মপ্লাজম ও প্রচলিত উন্নত জাতের সিনথেটিক ব্রয়লারের সমন্বয়ে উদ্ভাবিত নতুন ব্রয়লার দুটি দেশে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করলে ওই আমদানি খরচ সাশ্রয় হবে। এ ছাড়া নতুন জাতগুলোর রোগবালাই ও মৃত্যুহার কম হওয়ায় দেশি লালনপালন ব্যববস্থাপনায় কম খরচে বিদেশে সিনথেটিক ব্রয়লারের মতোই উৎপাদন পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. আশরাফ আলী ও ড. বজলুর রহমান মোল্লা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) এসপিজিআর প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পরিচালিত 'দেশে প্রাপ্ত মুরগির জার্মপ্লাজম ব্যবহার করে ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক উদ্ভাবন' শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে চার বছর গবেষণা শেষে 'বাউ-ব্রো-হোয়াইট' ও 'বাউ-ব্রো-কালার' নামে ব্রয়লারের জাত দুটি উদ্ভাবনে সাফল্য পান গবেষকরা। নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলোর এক দিনের বাচ্চার ওজন, খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা, ৩৫ দিনে ওজন (১.৫ কেজি) বাজারে প্রচলিত ব্রয়লারের মতোই। অন্যদিকে মৃত্যুর হার কম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং লালনপালন ব্যবস্থাপনা প্রচলিত ব্রয়লারের চেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী। এ গবেষণাকাজে সহযোগিতা করেন পিএইচডি শিক্ষার্থী গোলাম আজম।
উদ্ভাবিত ব্রয়লার সম্পর্কে গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. আশরাফ আলী বলেন, 'আমাদের দেশে বাণিজ্যিক হ্যাচারিগুলো ব্রয়লার উৎপাদনের জন্য প্রতিবছর কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক বাইরের দেশ থেকে আমদানি করে বাচ্চা উৎপাদন করে। অন্যদিকে বাইরে থেকে আমদানি করা প্যারেন্ট ব্রয়লার শীতপ্রধান দেশের উপযোগী করে তৈরি হওয়ায় এ দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যা হয়। ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ওই সব প্যারেন্ট স্টক লালনপালন করায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে বাচ্চার দাম তুলনামূলক বেশি পড়ে। অন্যদিকে ওই সব স্টক দেশের বাইরে থেকে আনার ফলে বিভিন্ন রোগের জীবাণু দেশে ছড়িয়ে পড়ে, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (বার্ড ফ্লু)। এ ছাড়া বাজারে প্রচলিত ওই সব ব্রয়লারের মাংস অত্যধিক নরম ও দেশি মুরগির মতো সুস্বাদু না হওয়ায় অনেকে পছন্দ করে না। এসব বিষয় মাথায় রেখে আমাদের নিজস্ব ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে চার বছর দেশি মুরগির জার্মপ্লাজম ও প্রচলিত উন্নত জাতের সিনথেটিক ব্রয়লারের মোরগ-মুরগি থেকে ক্রমে গুণগত বাছাই ও প্রজননের মাধ্যমে নতুন দুটি ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক অর্থাৎ জাত উদ্ভাবনে সফল হয়েছি। যার উৎপাদন ক্ষমতা আমদানি করা অন্যান্য উন্নত মানের ব্রয়লার প্যারেন্টের সমকক্ষ। মজার ব্যাপার হলো, উদ্ভাবিত প্যারেন্ট স্টকগুলো দেশে প্রচলিত মুরগির ঘরেই লালনপালন করে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যাবে। কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজন নেই কোনো ব্যয়বহুল টিকাদান কর্মসূচির। অন্যদিকে প্রচলিত ব্রয়লারের মতোই আমাদের উদ্ভাবিত ব্রয়লার পাঁচ সপ্তাহে দেড় কেজি ওজনের হয়ে থাকে।'
গবেষণার সহযোগী গবেষক ড. বজলুর রহমান মোল্লা বলেন, 'আমাদের দেশে বেশির ভাগ ভোক্তাই বাজারে গিয়ে রঙিন মুরগি অর্থাৎ দেশি মুরগি খোঁজে। বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা দুই ধরনের মাংস উৎপাদনকারী (ব্রয়লার) মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছি। দেশি মুরগি ও বাজারে প্রচলিত উন্নত মানের সিনথেটিক ব্রয়লারের সঙ্গে মিল রেখেই জাত দুটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। বাউ-ব্রো-কালার মুরগির মাংস অনেকটা দেশি মুরগির মতো স্বাদ ও শক্ত প্রকৃতির। অন্যদিকে বাউ-ব্রো-হোয়াইটেরও মাংস প্রচলিত ব্রয়লারের মাংস থেকে তুলনামূলক শক্ত ও সুস্বাদু। তবে নতুন উদ্ভাবিত ব্রয়লার ও প্রচলিত ব্রয়লারের মাংসের পুষ্টিমানের কোনো পার্থক্য নেই। বর্তমানে ব্রয়লারের জাত দুটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত।' বাজারে প্রচলিত ব্রয়লারের বাচ্চার চেয়ে কম দামে উদ্ভাবিত ব্রয়লারের বাচ্চা খামারিদের হাতে শিগগিরই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
ড. বজলুর রহমান জানান, বর্তমানে জাত দুটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লক্ষ্যে জেনেটিক্সের মলিকুলার পর্যায়ে কিছু কাজ করা হচ্ছে। মূলত উদ্ভাবিত জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম অটুট থাকবে কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তবে অর্থায়নের অভাবে কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশের খ্যাতনামা খামারি ও হ্যাচারি মালিকরা যদি আমাদের গবেষণায় অর্থায়নে এগিয়ে আসেন, তাহলে উদ্ভাবিত ব্রয়লার জাতগুলোর মাধ্যমে দেশের আমদানিনির্ভর ব্রয়লার শিল্পকে রপ্তানি শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।
সূত্র - দৈনিক কালের কণ্ঠ

