আমাদের দেশে বছরে লক্ষাধিক মানুষ কুকুরে কামড়ের শিকার হন। ১০ হাজারের বেশিমানুষ জলাতঙ্ক প্রাণ হারান বলে বিভিন্ন মাধ্যমে হতে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়।প্রশ্ন জাগে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক থাকা সত্ত্বেও কেন এত মৃত্যু? মানুষের অজ্ঞতা ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ঠিক সময়ে প্রতিষেধক না পাওয়াই এ মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কুকুর কামড়ালে ভ্রান্ত ধারণা বশত মানুষ কেউ কেউ চিকিৎসকের পরিবর্তে ওঝা-গুণীন, কবিরাজ, হাতুড়েদের কাছে গিয়ে তুকতাক ওঝাড়-ফুঁক করান। কিন্তু যে কুকুরটি কামড়েছে সে মানুষটির যদি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়, তবে এত সব কিছুর ফল মৃত্যু। কারণ জলাতঙ্কের কোনো চিকিৎসা নেই।একবার হয়ে গেলে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত মৃত্যু। বৈজ্ঞানিক প্রতিষেধকই একমাত্র প্রতিকার। জানা যাক জলাতঙ্ক রোগটি কী ধরনের? কুকুরের কামড়ের সাথে এর কিইবা সম্পর্ক? কখন ভ্যাকসিন নেয়ার প্রয়োজন নেই? এবং আনুষঙ্গিক কিছু ভ্রান্ত ধারণার সঠিক উত্তর।জলাতঙ্ক (হাইড্রোফোবিয়া বা রেবিস) একটি ভাইরাস ঘটিত রোগ। র্যা বডো ভাইরাস এ রোগের কারণ। জলাতঙ্ক কেন্দ্রীয় স্নায়ু তন্ত্রকে আক্রমণ করে এর ফলে মৃত্যু হয়। সাধারণত কুকুর, বিড়াল, শেয়াল, নেকড়ে, বেজি ইত্যাদির কামড়ের মাধ্যমে রেবিস সংক্রমিত হয়ে থাকে।
আমাদের এ অঞ্চলে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে রেবিস কুকুরের কামড়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে।এখানে একটি কথা জেনে রাখা প্রয়োজন যে সুস্থ কুকুর বা প্রাণী কামড়ালে রেবিস হয় না। রেবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুর (পাগলা কুকুর) কামড়ালে বা ক্ষত স্থানে চেটে দিলে সে ব্যক্তি রেবিসে আক্রান্ত হন। র্যাাবডো ভাইরাস শরীরে ঢুকলে ১০দিন থেকে এক বছর পরও রোগ লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। তবে সাধারণত ২০ থেকে ৯০দিনের মধ্যেই জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।মস্তিষ্কে রেবিস ভাইরাস যখন ছড়িয়ে পড়ে তখনই রেবিসের লক্ষণগুলো দেখা দিতে থাকে। প্রথম দু-তিন দিনের মধ্যে পা ম্যাজ ম্যাজ করা, মাথা ব্যথা, অবসাদ, বমিভাব, খিদের অভাব, জ্বর ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দংশনস্থানে চুলকায়, ব্যথা করে, ঝিন ঝিন করে। এর পরের পর্যায়ে রোগী শব্দ, ঠাণ্ডা বাতাস সহ্য করতে পারে না। রোগী কোনো প্রকার তরল পদার্থ গিলতে পারে না।রোগীর মানসিক অস্থিরতা এবং কখনো কখনো ঝিমিয়ে পড়ার ভাব দেখা যায়।
লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে তীব্র খিচুনি ও পক্ষাঘাতে রোগীর মৃত্যু হয়।জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে গেলে সে রোগীকে বাঁচানোর কোনো টিকা বা ওষুধ চিকিৎসা বিজ্ঞানের জানা নেই। কিন্তু এ রোগ প্রতিরোধের টিকা (Anti-rabies vaccine-ARV) মানুষের করায়ত্ত। কুকুর বা বন্যপ্রাণী কামড়ালে (যে ক্ষেত্রেসম্ভব) জেনে নিতে হবে প্রাণীটি রেবিস আক্রান্ত ছিল কি না? রেবিস আক্রান্ত হলে দ্রুত ভ্যাকসিন নিতে হবে। আর প্রাণীটি রেবিস আক্রান্ত কি না জানা সম্ভবনা হলে (রাস্তার কুকুর বা বন্যপ্রাণী কামড়ালে) অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ভ্যাকসিন নিতে হবে। কোন কুকুরটি রেবিসে আক্রান্ত তা জানার জন্যরেবিস আক্রান্ত কুকুরের রোগ লক্ষণ জানা জরুরি।
রেবিস আক্রান্ত কুকুরের দ্ইু ধরনের লক্ষণ : উন্মত্ত আচরণ-অস্বাভাবিক ভাবভঙ্গি, উদ্দেশ্য ছাড়াই ছুটে বেড়ানো, বিকৃত ুধা, বিকৃত আওয়াজ করা, শরীরে কাঁপুনি, বিনা প্ররোচণায় কামড়ানো, মুখ দিয়ে অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, ডাককর্কশ হওয়া, পক্ষাঘাতে পায়ের ভারসাম্য হারানো, অবশেষে শ্বাসকষ্ট হয়ে মৃত্যু।মৌন আচরণ : নিস্তেজ হয়ে ঝিমোতে থাকা, বিকৃত স্বরে ধীরে ধীরে ডাকা, মানুষের চোখের আড়ালে থাকা, শরীরে কাঁপুনি ও পক্ষাঘাত দেখা দেয়া এবং সবশেষে মুত্যৃ।সাধারণত রোগ লক্ষণ প্রকাশের সাত দিনের মধ্যেই কুকুরটি মারা যায়। যদি কামড়ানোর ১০ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশিত না হয়, তবে কুকুরটি রেবিসে আক্রান্ত নয় বলে মনে করতে হবে। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই এবং ভ্যাকসিনও নিতে হবে না। কিন্তু যদি কামড়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বেশি হয় অথবা হাত, মাথা, মুখ ওঘাড়ে কামড়ায় তবে সাথে সাথে ভ্যাকসিন নেয়া শুরু করে ১০ দিন পর কুকুরটি সুস্থ থাকলে ভ্যাকসিন বন্ধ করা যেতে পারে।জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন প্রথম আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর।
বর্তমানে আমাদের দেশে জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য তিন ধরনের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়
১.নার্ভ- টিস্যু ভ্যাকসিন (NTV)- প্রতিদিন একটি করে পেটের চামড়ার নিচে মোট১৪টি ইঞ্জেকশন নিতে হয়। সব সরকারি হাসপাতালে এ ভ্যাকসিন বিনা মূল্যে পাওয়াযায়। তবে এ ভ্যাকসিন গর্ভবতী মহিলাদের জন্য নিরাপদ নয়।
২. মিউম্যান ডিপ্লয়েড সেল ভ্যাকসিন (HDCV)- নির্দিষ্ট দিনের ব্যবধানে হাতেমোট ছয়টি ইঞ্জেকশন নিতে হয়।
৩. পিউরিফায়েড চিক- এমব্রায়ো সেল ভ্যাকসিন (PCECV)- হাতে ছয়টি ইঞ্জেকশন নিতে হয়।
ভ্যাকসিন চলাকালে অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাদ্য, উত্তেজক পানীয় না খাওয়া, অতিরিক্ত পরিশ্রম না করা, রাত না জাগা, স্টেরয়েড বা অন্য ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ না করা, গর্ভবতী মায়েদের বিশ্রাম নেয়া ইত্যাদি মেনে চলা উচিত। ভ্যাকসিন চলাকালে যেন জ্বর না হয়, সর্দি-কাশি না থাকে সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। না জেনে জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছাগল ও গরুর অসিদ্ধ গোশত বা না ফোটানো দুধ (নৈবেদ্য) খেলে ভ্যাকসিন নেয়া উচিত। জলাতঙ্কে আক্রান্ত রোগীর এঁটো খাবার খেয়ে ফেললে বা রোগীর লালা শরীরের কোনো ক্ষতস্থানের সংস্পর্শে এলে ভ্যাকসিন নেয়া উচিত।তন্ত্রমন্ত্র, ঝাড়-ফুঁক, তুকতাক, তাবিজ-কবচের বিশ্বাসে আচ্ছন্ন রয়েছে অনেক মানুষ। বাহুত লাল-কালো সুতোয় হাফ ডজন শিকড়-তাবিজ বাঁধা গণ্যমান্য ব্যক্তির সংখ্যা নেহাত কম নয় এ দেশে।
অন্যান্য রোগের মতো কুকুরে কামড়ানোর ক্ষেত্রেও নুন পড়া, বাতাস পড়া, তেল পড়া, পানি পড়া, গুড় পড়া, পিঠে থালা বসানো এ রকম অজস্র আজগুবি পদ্ধতিতে চিকিৎসা করেন ওঝা গুণীজনেরা। এর সাথে আছে বিচিত্র সবমন্ত্র। আসলে কুকুরটি যদি বেরিসে আক্রান্ত কুকুর কামড়ায়। সোজা কথা, মৃত্যুকে যদি আলিঙ্গন না করতে চান তবে ওই সব বুজরুকির আশ্রয় নেবেন না, অন্যকে নিতে দেবেন না।
সূত্র - নয়া দিগন্ত

