.jpg)
সাকিবের বয়স ১২। নামী একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। বছর দুয়েক ধরে বাসায় থাকলে তার মেজাজ খানিকটা তিরিক্ষি হয়ে থাকে। বাবা-মায়ের যে কোনো কথাতেই সে ঝাঁজিয়ে ওঠে। তাঁদের প্রায় সব কথাতেই সে খারাপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। মুখে মুখে তর্ক করে এবং কিছু করতে বলা হলে সেটির উল্টোটা করতে চায়। তাঁদের ধমকায় পর্যন্ত! কখনো বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে। আবার কখনো তাঁদের দিকে তেড়ে যায়! বাবা-মা চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমন দুশ্চিন্তায় অনেকেই পড়তে পারেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় সাকিবের এই সমস্যাটিকে বলা হয় অপজিশনাল ডেফিয়েন্ট ডিজঅর্ডার, অর্থাৎ অবাধ্য আচরণ জনিত সমস্যা। এ সমস্যা শিশুর নয়-দশ বছর বয়সের দিক থেকে শুরু হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক গবেষণা উদ্ধৃত করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী বলেন, বিশ্বে প্রায় ১০ শতাংশ শিশুর মধ্যে এ ধরনের আচরণের সমস্যা রয়েছে। ছেলে শিশুদের মধ্যে এ সমস্যা হওয়ার প্রবণতা কিছুটা বেশি। এদের মা-বাবাদের মূল অভিযোগ, সন্তান মোটেই কথা শোনে না। সময় মতো ব্যবস্থা না নিলে এ সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর মধ্যে পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিত্বের সমস্যা, আবেগজনিত গুরুতর মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর সে নেশায় আসক্ত হতে পারে।
যা দেখে বোঝা যায়
অভিভাবকের বেশির ভাগ অনুরোধ বা নির্দেশের বিরোধিতা করা, সেগুলো অমান্য করা, কারণে-অকারণে তর্ক করা।
ইচ্ছা করে এমন আচরণ করা যাতে অন্যরা, বিশেষত বাবা-মা বিরক্ত হন।
তুচ্ছ কারণে রেগে যাওয়া এবং অন্যের প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো।
নিজের অপকর্মের জন্য অপরকে দায়ী করা। প্রতিশোধ নেওয়া বা নেওয়ার চেষ্টা করা। অল্পতেই বিরক্ত হওয়া।
অশালীন ভাষার ব্যবহার বা কদর্য অঙ্গভঙ্গি করে বাবা-মা ও অন্যদের অগ্রাহ্য বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা। সহজেই হতাশা গ্রস্ত হওয়া।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী বলেন, ‘কমপক্ষে ছয় মাস ধরে এ ধরনের আচরণ তার মধ্যে থাকলেই তবে একে অবাধ্য আচরণ জনিত সমস্যা বলা যাবে এবং এদের মধ্যে মাদকাসক্তি, বিষণ্নতা ও অতিচঞ্চলতা থাকতে পারে।’
কেন হয়
কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ নেই। তবে যে সব বিষয় এই আচরণগত সমস্যা হওয়ার জন্য দায়ী বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সেগুলো হচ্ছে:
শিশুর বেড়ে ওঠার সময় অতি কঠোর বা অতি শিথিল বা অসংগতি পূর্ণ পারিবারিক অনুশাসন।
পরিবারের মধ্যে নিয়ম শৃঙ্খলার অভাব, অসংগঠিত বা ভেঙে যাওয়া পরিবার।
বাবা-মা বা পরিবারের কোনো সদস্যের মধ্যে আচরণ জনিত সমস্যা বা ব্যক্তিত্বের সমস্যা থাকা — যেমন শিশুর সামনেই যদি তার বাবা প্রায়ই অপরের সঙ্গে তর্ক ও বিবাদে জড়িয়ে পড়েন।
পরিবারের যে কোনো সদস্যের নেশা গ্রস্ত হওয়া।
শিশুকে শারীরিক ভাবে পীড়ন, মৌখিক ভাবে তিরস্কার ও তাচ্ছিল্য করা, উত্ত্যক্ত করা।
প্রতিকার যেভাবে
শিশুর মধ্যে এই সমস্যা দেখা দিলে ধৈর্য ধরে তার আচরণ পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে হবে, রাগ করে তাকে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করা যাবে না, আবার ‘যা ইচ্ছা করুক’ বলে হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অধ্যাপক মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরীর মতে, বাবা-মায়ের আচরণের পরিবর্তন ছাড়া শিশুর অবাধ্য আচরণের পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কেবল পেশাগত উন্নতি আর বৈভবের পেছনে ছুটলেই চলবে না বরং সন্তানকে দিতে হবে গুণগত সময়। পাশাপাশি এ বিষয়ে বাবা-মায়েদের সচেতন হওয়া আর সন্তানের আচরণকে লুকিয়ে না রেখে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসার ওপর ও জোর দেন তিনি।
‘কথা না শোনা’ সন্তান ও তার পরিবারের জন্য পরামর্শ
অভিভাবকদের যেসব আচরণের প্রতিক্রিয়ায় শিশুর মধ্যে অবাধ্যতা দেখা যায়, সেগুলো পরিবর্তন করার চেষ্টা। শিশুর আচরণ পরিশীলিত করার জন্য বিহেভিয়ার থেরাপির মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত আচরণকে উৎসাহিত করা। শিশুর ভালো কাজের প্রশংসা করা, পুরস্কৃত করা আর অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্য পুরস্কার প্রত্যাহার করা। শিশুর জন্য একটি রুটিন তৈরি করা পারিবারিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, পরিবারের সবার আচরণ ও চিন্তার সমন্বয় ঘটানো। শিশুকে কোনো মানসিক চাপের মুখে ঠেলে না দেওয়া। অতিচঞ্চলতা, বিষণ্নতা বাআবেগ জনিত কোনো সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ গ্রহণ। লেখক: মনোরোগচিকিৎসক
সূত্র- প্রথমআলো

