‘সৃজনী তার রুমের একপাশে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে। রাতে খাবারটা দেওয়া হয়েছে সেই কবে। বুয়া বার বার খেতে বলার
পরও সে কোনো ভাবেই খাবার টেবিলে যাচ্ছে না। স্কুল থেকে একটুদেরিতে বাসায় ফেরার কারণে মায়ের ছোট্ট
একটি তীর্যক মন্তব্যে সৃজনী দারুন আঘাত পেয়েছে।’
আমরা অনেকেই মনে করতে পারি, মা-বাবার এমন আচরণ খুবই স্বাভাবিক এবং এর প্রয়োজনও আছে। কিন্তু
শিশুমনে এর অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মানব মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় যাকে অভিভাবকীয়
অভিব্যক্তি বা Parental Attitude বলে। মা-বাবা সন্তানকে বড় ও মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে সচারাচার
যে মনোভাব পোষণ করেন বা যে আচরণ করেন তাকেই বলা হয় অভিভাবকীয় অভিব্যক্তি বা Parental
Attitude।
খুব যৌক্তিক ভাবে মনোরোগবিদরা ত্রুটিপূর্ণ মনোভাব (Unhealthy Parental Attitude) এর দিকে
সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। কেননা গোলমালটা বাধে যখন সন্তানের প্রতি জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে বাবা
মায়েরা ত্রুটিপূর্ণ আচরণ বা মনোভাব প্রকাশ করেন। ত্রুটিপূর্ণ মনোভাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
অতিমাত্রায় যত্নশীলতা, অপর্যাপ্ত দেখভাল, অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনোভাব, শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব,
কর্তৃত্বপরায়ন মনোভাব ইত্যাদি। ঠিক তার উল্টোপিঠে আছে সঠিক মনোভাব বা Healthy Parental
Attitude। এক্ষেত্রে স্নেহপূর্ণ মনোভাব (Loving attitude), স্বাধীনচেতা মনোভাব(Autonomous
attitude) উল্লেখযোগ্য।
অতিমাত্রায় যত্নশীল বা রক্ষণশীল(Overprotective attitude) বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে বাচ্চাকে সবসময়
সবকিছুতেই বাধা দানের কিংবা খোকা-খুকি বানিয়ে রাখার একটা প্রচেষ্টা থাকে। এক্ষেত্রে অবিভাবকরা
সবসময় নিজেদের পছন্দমতো কর্মকাণ্ডেই তাকে নিয়োজিত রাখতে চান। ছোট্ট কোনো বিষয়ে তাকে
নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ না দেওয়া, বয়সের তুলনায় কম বয়সীদের কাপড় পড়ানো,
ছোটখাট বাড়ির কাজে অংশ নিতে না দেওয়া কিংবা বয়স বাড়ার পরও তার সঙ্গে ঘুমোতে যাওয়া, কি করছে না
করছে তা বার বার খুটিয়ে খুটিয়ে দেখা ইত্যাদি ত্রুটিপূর্ণ আচরণ বাবা মায়েরা করে থাকেন। ফলস্বরূপ শিশুযখন
বেড়ে ওঠে তার মাঝে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, সংশয়বাদী, নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পারা, অতিমাত্রায়
নির্ভরশীলতা, অন্যদের সাথে মেলামেশা বা খেলাধুলায় অনাগ্রহ, স্বাধীনভাবে নিজের চেষ্টায় কাজ করতে না পারা
ইত্যাদি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়।
আবার সন্তানের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে একেবারে উদাসীনতাও ( Inadequate parental supervision /
অপর্যাপ্ত তদারকি) অনেক পরিবারে দেখা যায়। সন্তান কখন বাইরে থেকে বাড়িতে আসবে, বাইরে কি করছে,
কোথায় যাচ্ছে, কাদের সাথে তার অবসর সময় কাটাচ্ছে, তার বন্ধুদের বাড়ি কোথায়, বন্ধুর নামটিই বা কি
এসব তথ্য ও অনেক ক্ষেত্রে বাবা মা জানেন না বা জানা প্রয়োজনীয় মনে করেন না। বাসায় বাবা মায়ের
উদাসীনতা যেমন- বাচ্চার সাথে কথা না বলা, প্রত্যাহিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে নীরব থাকা, বাচ্চার ইচ্ছা
অনুযায়ী সবক্ষেত্রে সম্মতি প্রদান, বাচ্চার নেতিবাচক আচরণে সংশোধনী প্রদানে বিরত থাকা কিংবা
সংশোধনী প্রদানে কোনো ধারাবাহিকতা না থাকা। আর এসবের কারণে বাচ্চা হয়ে পরে উশৃঙ্খল, বেপরোয়া।
নিয়ম মেনে না চলার প্রবণতা তার মধ্য দৃঢ় হতে থাকে। শেষ পর্যায়ে এসে নানাবিধ মাদকাসক্তি, অসামাজিক
কার্যকলাপ ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ে।
শিশুর কাজে প্রশংসা/উৎসাহ প্রদান না করা, তার কোনো সাফল্যকে মূল্য না দেওয়া, বাঁকা উক্তি করা, অতিথি
বা অন্য কারো সামনে তার সমবয়সীদের সাথে তুলনা করে কিছুবলা, শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিগৃহীত
করা ইত্যাদি আচরণকে শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব বা Hostile parental attitude বলে। এর ফলে বাবা মায়র
সঙ্গে সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, স্কুলের কর্মকাণ্ডে আশানুরুপ ফল না পাওয়া,
যেকোনো চাপ মোকাবেলা করতে না পারা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
ত্রুটিপূর্ণ মনোভাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরেকটি ধরন হচ্ছে বাবা মায়ের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাব
(Authoritarian attitude )। এর মধ্যে- বাচ্চার ওপর কোনো নিয়ম জোর করে চাপিয়ে দেওয়া, নিয়মের
প্রাসঙ্গিকতা বা যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা না করা, নিয়ম পালনে বাধ্য করা, নিজেদের ভুল ভ্রান্তিমূলক
আচরণ স্বীকার না করা, বাচ্চার ইচ্ছার ব্যাপারে উদাসীন থেকে সর্বক্ষেত্রে ‘না’ বলার মানসিকতা ইত্যাদি
উল্লেখযোগ্য। যার ফলে শিশুভীরু, চাপা স্বভাবের হয়। পরবর্তীতে তার আত্মবিশ্বাসী ও সৃজনশীল মনোভাব
গড়ে ওঠে না।
স্নেহময় মনোভাব বা Loving attitude এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- তাকে যথোপযুক্ত স্নেহ উষ্ণতা
প্রদান, তার যেকোন প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া, চাপ মোকাবেলা করতে দেওয়া ও চাপের মুখে সাহস দেওয়া,
তার সাফল্যে প্রশংসা ও উৎসাহ প্রদান ।
আর স্বাধীনচেতা মনোভাব বা Autonomous attitude এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বয়স অনুযায়ী কাজে
তার মতো করে করতে দেওয়া, কোনো সমস্যা হলে তা নিয়ে আলাপ করা আর কিভাবে সমাধান করা যায় তার
দিকনির্দেশনা দেওয়া। ভুল থেকে তাদের শেখার সুযোগ দেওয়া, নিজস্ব মতামত প্রদানে উৎসাহ প্রদান করা,
তাদের বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া ইত্যাদি।
সন্তানের ভালো চান না এমন নিষ্ঠুর বাবা-মা হয়তো এ পৃথিবীতে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারা তাদের
সমস্ত মেধা মনন আর হৃদয়ের নির্যাস নিংড়ে সন্তানকে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তোলেন। কিছুটা অজ্ঞতা আর দ্রুত
লয়ের এ সময়ের যাপিত জীবনে সন্তানের প্রতি অনেক ক্ষেত্রে সঠিক আচরণ করা হয় না। ফলস্বরূপ সন্তান ও
বাবা-মায়ের মধ্যে সৃষ্টি হয় অদৃশ্য দূরত্ব। ধীরে ধীরে একই সঙ্গে একই ঘরে থেকেও সবাই বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন
করেন। শেষ পর্যায়ে দীর্ঘদিনে ক্ষয়িত ঠুনকো সামাজিক বন্ধন ঘিরে সৃষ্টি হতে থাকে নানা ধরনের ব্যক্তিগত,
পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যা।
আমরা সবাই জানি, প্রাকৃতিক নিয়মে রোদে জলেই প্রাণের সজীবতা। ভাবুন আপনার সন্তান ছোট্ট একটা সবুজ
চারা, তার জন্য আপনার অর্থ উপার্জন বা নানান প্রচেষ্টা শেকড়ে জল ঢালার মতন। আর চারা গাছটার সহজাত
বৃদ্ধির জন্য আপনার সঠিক মনোভাব বা আচরণ সূর্যের আলোর সমার্থক। তাই প্রতিদিনকার জল ঢালার
সাথে সাথে রোদটাও কিন্তুচাই।
সূত্র - বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

