মাউথওয়াশের ব্যবহার
22 April,14
Viewed#: 258
মাউথওয়াশ একটি ওষুধসমৃদ্ধ এন্টিসেপটিক দ্রবণ, যা কুলি করার জন্য ব্যবহৃত হয়। মুখ ও মুখগহ্বরের সংক্রমণ রোধে মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। দাঁত ব্রাশ করা যখন সম্ভব হয় না তখন এটি ব্যবহার করা যায়। অপারেশনের পর যখন কোনো রোগী পূর্ণ বিশ্রামে থাকেন, সে সময় মাউথওয়াশ দাঁত ব্রাশের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
এন্টিসেপটিক বা অ্যান্টিপ্ল্যাক মাউথওয়াশ মুখের সেসব জীবাণু ধ্বংস করে যার কারণে মুখের ভেতরে প্ল্যাক, মাড়ির প্রদাহ বা মুখের দুর্গন্ধ হতে পারে। এন্টিক্যাভিটি মাউথওয়াশ সাধারণত ফ্লোরাইড সমৃদ্ধ হয়ে থাকে, যা দাঁতকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে। মাউথওয়াশ ব্যবহারের অর্থ এই নয় যে এটি ব্যবহার করলে দাঁত ব্রাশ করা লাগবে না বা ডেন্টাল ফ্লস (দাঁত পরিষ্কার করার এক ধরনের সুতা) ব্যবহার করতে হবে না।
ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আমেরিকা (এফডিএ) মাউথওয়াশকে প্রধান তিন ভাগে ভাগ করেছে :
(১) কসমেটিক মাউথওয়াশ
(২) থেরাপিউটিক মাউথওয়াশ ও
(৩) কসমেটিক এবং থেরাপিউটিক সমন্বিত মাউথওয়াশ।
কসমেটিক মাউথওয়াশ দাঁত ব্রাশের আগে বা পরে ব্যবহার করা যায়। কসমেটিক মাউথওয়াশ খাদ্যকণা পরিষ্কার করে এবং মুখের দুর্গন্ধ সাময়িকভাবে দূর করতে সাহায্য করে। মুখের সজীবতা কিছুক্ষণের জন্য ফিরিয়ে আনে। মাউথওয়াশ অন্তত ১০ মিনিটের জন্য কাজ করে। দুই ঘণ্টা পরে আর কাজ করে না।
থেরাপিউটিক মাউথওয়াশকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় :
(১) অ্যান্টিপ্ল্যাক বা মাড়ির প্রদাহবিরোধী মাউথওয়াশ ও
(২) অ্যান্টিক্যাভিটি বা দন্তক্ষয়বিরোধী ফ্লোরাইড মাউথওয়াশ।
কীভাবে ব্যবহার করবেন : মাউথওয়াশ ব্যবহারের আগে দাঁত ব্রাশ ও দাঁত ফ্লসিং করে নেয়া ভালো। মাউথওয়াশ দুই চামচ পরিমাণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে অথবা চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারিত পরিমাণে ব্যবহার করতে হয়। মাউথওয়াশ ৩০ সেকেন্ডের জন্য মুখের অভ্যন্তরে রেখে কুলি করতে হয়। ফ্লোরাইডযুক্ত মাউথওয়াশের ক্ষেত্রে এক মিনিট কুলকুচি করতে হয়। মাউথওয়াশ ব্যবহারের ৩০ মিনিটের মধ্যে খাবার খাওয়া যাবে না। অন্যথায় মাউথওয়াশের কার্যকারিতা অনেকাংশে কমে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়।
মাউথওয়াশ সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে যেসব সমস্যা হতে পারে : * মুখের স্বাদে পরিবর্তন আসতে পারে। মুখের স্বাদের এ পরিবর্তন তিন থেকে চার ঘণ্টার জন্য হতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। * দাঁতে দাগ পড়তে পারে। * মুখের ভেতর শুষ্কভাব বিরাজ করতে পারে। * মুখের অভ্যন্তরে জ্বালাপোড়া বা প্রদাহজনিত অনুভূতির সৃষ্টি হতে পারে। * অতিরিক্ত ব্যবহারে মুখে ঘা বা আলসার দেখা দিতে পারে।
কী ধরনের মাউথওয়াশ ব্যবহার করবেন : বাংলাদেশে তৈরি যেসব মাউথওয়াশ রয়েছে, সেগুলোর মূল উপাদান হল অ্যাসেনশিয়াল অয়েল, পোভিডন আয়োডিন ও ক্লোরোহেক্সিডিন। অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথওয়াশ মুখের প্রদাহজনিত সমস্যায় এক সপ্তাহের জন্য ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে মাউথওয়াশ সমপরিমাণ পানির সঙ্গে মিশিয়ে নিতে হবে। এই মাউথওয়াশে থাকা মেনথলের স্বল্পমাত্রায় প্রদাহ বিনাশকারী কার্যকারিতা রয়েছে। এর অন্য উপাদান থাইমল অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথওয়াশ মাড়ির রোগ ও প্ল্যাকের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এতে রয়েছে ইউক্যালিপটল যৌগ, যা ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। ইউক্যালিপটাস অয়েল বিভিন্ন ওষুধে ব্যবহৃত হয় এবং ইউক্যালিপটল যৌগ থাকায় এটি মাউখওয়াশে ব্যবহৃত হয়। অ্যাসেনশিয়াল অয়েলের গুণ হল, এটি মুখের যে কোনো জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর।
এ কারণেই অ্যাসেনশিয়াল অয়েল শুধু মাউথওয়াশ নয়, শরীরের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয়। যারা পান সেবনে অভ্যস্ত তাদের দাঁত ও মুখে বেশি ময়লা জমে থাকে। সেক্ষেত্রে অ্যাসেনশিয়াল অয়েল মাউথওয়াশের মিথাইল স্যালিসাইলেট কার্যকর ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে ক্লোরোহেক্সিডিন গ্লুকোনেট ০.২ শতাংশ মাড়ির রোগে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পোভিডন আয়োডিন ০.১ শতাংশ মাউথওয়াশও আমাদের দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। গর্ভবতী ও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন- এমন মায়েদের পোভিডন আয়োডিন নিয়মিত ব্যবহার করা ঠিক নয়। এক্ষেত্রে শোষিত আয়োডিন প্লসেন্টা বা নাভিফুল অতিক্রম করতে পারে এবং তা মায়ের দুধে নিঃসৃত হয়। থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা পরীক্ষার সময় পোভিডন আয়োডিন মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যায় না। কারণ এর আয়োডিন শোষণের কারণে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা পরীক্ষায় বাধার সৃষ্টি হতে পারে। আয়োডিনের প্রতি সংবেদনশীলতা থাকলে পোভিডন আয়োডিন মাউথওয়াশের বিকল্প মাউথওয়াশ ব্যবহার করা উচিত। কসমেটিক মাউথওয়াশের বিকল্প মাউথওয়াশ বাড়িতেও বানানো যায়।
স্বাভাবিক মাত্রার মাউথওয়াশ : আধা চা চামচ লবণ চার আউন্স পানির সঙ্গে মিশিয়ে স্বাভাবিক মাত্রার মাউথওয়াশ তৈরি করা যায়।
শক্তিশালী মাউথওয়াশ : আধা চা চামচ লবণ চার আউন্স পানির সঙ্গে মিশিয়ে মাউথওয়াশ তৈরি করা যায়। আধা চা চামচ বেকিং সোডা আট আউন্স পানির সঙ্গে মিশিয়ে মাউথওয়াশ তৈরি করা যায়।
বিশেষ ক্ষেত্রে চিকিৎসক মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে বলেন ঠিকই কিন্তু মাউথওয়াশ অতিরিক্ত ব্যবহার করলে মুখে আলসার দেখা দিতে পারে। মুখের আলসারজনিত অবস্থায় অতিরিক্ত বা ভুল মাউথওয়াশ ব্যবহারের কারণে ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা সৃষ্টি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। ১২ বছর বয়সের নিচে কোনো মাউথওয়াশ ব্যবহার করা ঠিক নয়। একান্ত প্রয়োজন হলে বাসায় তৈরি কসমেটিক মাউথওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ব্যবহার করতে হবে পরিমাণমতো এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। মুখের সার্বিক অবস্থা, ত্বকের ধরন, রোগের গুরুত্ব বুঝেই মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হয়।
সূত্র - দৈনিক যুগান্তর