
মাশরুম পুষ্টিকর, সুস্বাদু ও ঔষধি গুণ সম্পন্ন সবজি। কোরআন শরিফে এর ইঙ্গিত দেয়া আছে (সুরা বাকারা, আয়াত ৫৭) এবং হাদীস শরীফে একে বেহেস্তী খাবারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫-৩৫% প্রোটিন আছে যা খুবই উন্নত ও নির্দোষ। এতে উপকারী শর্করা ও চর্বি আছে, যে কারণে মাশরুম বিভিন্ন জটিল রোগের প্রতিরোধক ও প্রতিষেধক হিসেবে অত্যন্ত কার্যকরী হয়ে থাকে। বিশ্বে ডায়বেটিস রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, বাড়ছে রোগের জটিলতাও। বাংলাদেশও তার ব্যাতিক্রম নয়। এখন পর্যন্ত এটাও সত্য যে, ডায়বেটিস কোন নিরাময়যোগ্য রোগ নয়, তাই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখাই চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য। ডায়বেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য স্বাস্থবিধির বেশ কিছু নিয়ম কানুনের সাথে বর্তমানে মাশরুম খাওয়ার কথাও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে এবং ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু তাই নয় চিকিৎসকরাও এখন ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য মাশরুম খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
মানবদেহে দৈনিক ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা এবং ১০০ গ্রাম শুকনা মাশরুমে এদের উপস্থিতির পরিমাণ নিম্নরূপঃ
|
প্রধান ভিটামিন ও মিনারেলের নাম |
দৈনিক চাহিদা |
মাশরুমে প্রাপ্তি |
|
থায়ামিন বি-১ |
১.৪ মিলি গ্রাম |
৪.৮-৮.৯ মিলি গ্রাম |
|
রিবোফ্লাভিন বি-২ |
১.৫ মিলি গ্রাম |
৩.৭-৪.৭ মিলি গ্রাম |
|
নায়াসিন |
১৮.২ মিলি গ্রাম |
৪২-১০৮ মিলি গ্রাম |
|
ফসফরাস |
৪৫০ মিলি গ্রাম |
৭০৮- ১৩৪৮ মিলি গ্রাম |
|
লৌহ |
৯ মিলি গ্রাম |
১৫-১৭ মিলি গ্রাম |
|
ক্যালসিয়াম |
৪৫০ মিলি গ্রাম |
৩৩-১৯৯ মিলি গ্রাম |
|
কপার |
২ মিলি গ্রাম |
১২-২২ মিলি গ্রাম |
মাশরুমে পুষ্টিগুণের পাশাপাশি যে সব ঔষধিগুণ পাওয়া যায় তা হলঃ
১. মাশরুমে আমিষ, শর্করা, চর্বি, ভিটামিন ও মিনারেলের এমন সমন্বয় আছে যা শরীরে ‘ইমুন সিস্টেম’ কে উন্নত করে। ফলে গর্ভবতী মা ও শিশুরা নিয়মিত মাশরুম খেলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি হয়।
০২. মাশরুমে চর্বি ও শর্করা কম এবং আঁশ বেশি থাকায় এটি ডায়বেটিস রোগীদের আদর্শ খাবার।
৩. মাশরুমে আছে শরীরের কোলেস্টেরল কমানোর অন্যতম উপাদান ইরিটাডেনিন, লোভাস্টটিন এবং এন্টাডেনিন। তাই নিয়মিত মাশরুম খেলে হৃদরোগ ও উচ্চরক্তচাপ নিরাময় হয়।
৪. মাশরুমে আছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও ভিটামিন-ডি, যা শিশুদের দাঁত ও হাড় গঠনে অত্যন্ত কার্যকরী।
৫. মাশরুমে আছে প্রচুর পরিমাণে ফলিক এসিড ও লৌহ। ফলে মাশরুম খেলে রক্ত শূন্যতা দূর হয়। এছাড়া লিংকজাই-৮ পদার্থ থাকায় এটি হেপাটাইটিস-বি জন্ডিসের প্রতিরোধক।
৬. মাশরুমে আছে B-D গ্লুকেন, ল্যাম্পট্রোল, টারপিনওয়েড ও বেনজোপাইরিন, যা ক্যান্সার ও টিউমার প্রতিরোধ করে।
৭. মাশরুমে টাইটারপিন থাকাতে, বর্তমানে এটি বিশ্বে এইডস প্রতিরোধক হিসেবে ব্যাবহৃত হচ্ছে।
৮. মাশরুমে ইলুডিন এম এবং এস থাকাতে আমাশয়ের উপকারী।
৯. মাশরুমে প্রচুর পরিমাণে গ্লাইকোজেন থাকাতে শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। তাই যৌন অক্ষম রোগীদের জন্য এটি একটি মহৌষধ।
১০. মাশরুমে এডিনোসিন থাকায় এটি ডেঙ্গু জ্বরের প্রতিরোধক।
১১. মাশরুমে স্ফিংলিপিড এবং ভিটামিন বি-১২ বেশী থাকায় স্নায়ুতন্ত্র ও স্পাইনাল কর্ড সুস্থ রাখে, তাই মাশরুম খেলে হাইপারটেনশন দূর হয় এবন মেরুদন্ড দৃঢ় করে।
১২. মাশরুমে আছে প্রচুর পরিমাণে এনজাইম, যা হজমে সহায়ক, রুচি বর্ধক পেটের পীড়া নিরাময় কারক।
১৩. মাশরুমে নিউক্লিক এসিড এবং এন্টি-এলার্জেন থাকায় তা কিডনি রোগ ও এলার্জি প্রতিরোধক।
১৪. মাশরুমে প্রচুর পরিমাণে সালফার সরবরাহকারী এমাইনো এসিড থাকায় এটা নিয়মিত খেলে চুল পড়া ও চূল পাকা প্রতিরোধ করে।
“উন্নত বিশ্বে মাশরুম ‘ঔষধ, টনিক ও খাদ্য’ একের ভিতরে তিন হিসেবে পরিচিত।“
মাশরুম কিভাবে খাবেন?
মাশরুম তাজা, শুকনা, পাউডার সব রকমেই ব্যবহার করা যায়। এমনকি পানি, দুধ, চা, কফি ইত্যাদির সাথে মাশরুম পাউডার মিশিয়েও পান করা যায়। এ মাশরুমকে ব্যবহার করে রুচিকর রকমারি খাবার তৈরি করা সম্ভব। মাশরুমের রকমারি খাবারের মধ্যে ভর্তা, সবজি, ভাজি, পোলাও ও বিরিয়ানি, মাশরুম ফ্রায়েড রাইস ইত্যাদি প্রসিদ্ধ।
ফাস্ট ফুড আইটেম বা নাস্তা হিসেবে মাশরুমী, মাশরুম চাপ, সমুচা, রোল, স্যান্ডউইচ, পিজা, পেটিস, সিঙ্গারা, নুডুলস, বার্গার, চটপটি ও মোগলাই প্রভৃতি খাবারে মাশরুম ব্যবহার করা যায়।
গরু ও খাসির মাংসের সাথে মাশরুম দিয়ে রান্না করলে মাংসের চর্বি ভেঙ্গে এর ক্ষতিকর দিক গুলি দূর করে হজমে সহায়ক হয় এবং যারা চর্বির ভয়ে মাংস খেতে নারাজ তারা অনায়াসে মাশরুম দিয়ে মাংস রান্না করে খেতে পারেন।
তবে নিয়মিত পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিত করতে দৈনন্দিন রান্নায় অন্যান্য সাধারণ মসলা যেমনঃ হলুদ, মরিচ, জিরা, ইত্যাদির সাথে নিয়মিত ভাবে অন্তত দুই চামচ মাশরুম পাউডার ব্যবহার করার অভ্যাস করলে খাবারের স্বাদ যেমন বহুলাংশে বর্ধিত হয় তেমনি সমগ্র পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত হয়।
স্বাস্থ্য সচেতন মানুষেরা ভেজাল আর কীটনাশকের ভিড়ে (মাশরুমের উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা বিপণন এর কোন পর্যায়েই সার, কীটনাশক বা কোনরূপ কেমিক্যাল ব্যবহারের একেবারেই প্রয়োজন পরে না) স্বাস্থ্যসম্মত নির্ভেজাল খাদ্য খুঁজতে যখন হয়রান তখন মাশরুম সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ।

