home top banner

Blog

অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনের সহায়ক কিছু পদক্ষেপ
02 April,13
Category: Autism
View in English

 ২০১১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক অটিজম সম্মেলনের পর শিশুদের অটিজম বিষয়টি দেশব্যাপি বেশ গুরুত্ব লাভ করে। আমরা জানি অটিজমে আক্রান্ত শিশু ও তার পরিবার কঠিন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সমাজে বসবাস করে। তাদেরকে লজ্জা-অপমান, বৈষম্যের শিকার হতে হয়। এমনকি একঘরে থাকতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু যেসব প্রাপ্তবয়স্ক লোক অটিজমে আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রে অবস্থা আরো শোচনীয় আরো ভয়াবহ রুপ ধারন করে। তারা প্রায়শঃই পাগল বলে চিহ্নিত হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে নিগ্রহের শিকার হয়। তা্রা কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং সামাজিক কোন কর্মকান্ডেও তাদের কোন ভূমিকায় রাখা হয় না।

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারন কিছু সমস্যায় ভোগেন যার মধ্যে আছে যোগাযোগ ও সামাজিক আচার-ব্যবহার। সঠিক যোগাযোগ ও সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার কারনে তাদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিঃসহ। কোন ব্যক্তির সামাজিক ‘যোগাযোগ দক্ষতা, সমাজের সাথে বোঝাপড়া, চিন্তা-চেতনার স্বাভাবিকতা’ লক্ষণসমূহ দেখে সে অটিজমে আক্রান্ত কি না তা সনাক্ত করা যায়।

তীব্র অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সার্বক্ষনিক আবাসিক সেবা দেয়ার প্রয়োজন হয়।  অটিজমে আক্রান্ত গুটিকয়েক ব্যক্তি হয়তো নিজেরা স্বাধীনভাবে বাস করতে পারে কিন্তু বেশিরভাগ আক্রান্ত ব্যক্তিই তাদের ব্যক্তিগত অর্থ লেন-দেন, সংরক্ষন অথবা বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী সেবা গ্রহনসহ প্রধান প্রধান সমস্যা সমাধানে অন্যের সহায়তার উপর নির্ভরশীল। পারিবারিক আবহই তাকে নিজের যত্ন নিজে নিতে শেখায়, ঘরগৃহস্থালী শেখায়, অবসর-বিনোদনে সহয়তা করে।

তবে কিছু কিছু কর্মসূচী বা প্রকল্প তাদের জীবনকে সহজ করে তুলতে পারে যা কি না সেবা প্রদানকারীদের কাছে মডেল হিসেবে বিবেচনার দাবী রাখে। যেমনঃ

গ্রুপে বসবাস বা সুপারভাইজড গ্রুপ লিভিং

আক্রান্ত ব্যক্তিরা গ্রুপ করে কোন বাসা-বাড়ীতে কিংবা কোন কক্ষে বাস করতে পারেন যেখানে তাদের ব্যক্তিগত ও মৌলিক চাহিদাগুলো দেখাশুনা করার জন্য দক্ষ ও অভিজ্ঞ  কর্মী থাকবেন। গ্রুপে তাদের নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগাভাগি করে নিতে পারবেন। যেমন কেউ খাবার তৈরীর কাজ করবে, কেউ ঘরদোর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজ করবে ইত্যাদি। যারা একটু বেশি কাজ করতে সক্ষম বা নিজেদের যত্ন নিজেরা নিতে সক্ষম তাদের জন্য সপ্তাহে হয়তো কিছু সময়ের জন্য কর্মীদের সহায়তার প্রয়োজন পড়তে পারে।

সরকারী নিরাপত্তা বলয়ে বসবাস

যাদের বাড়ীতে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তি আছে এবং যারা অস্বচ্ছল তাদের জন্য সরকারী আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। সরকারী সহায়তায় তাদের জন্য বা ঐসব পরিবারের অন্য সদস্যদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা, সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিবন্ধি ইনস্যুরেন্স, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য ভাতা ও সহায়তার ব্যবস্থা নিশ্চিতকরন। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় পরিষদে তথ্য সেবা কেন্দ্র চালু থাকা যাতে ঐসব কর্মসূচীর তথ্য সহজে পাওয়া যায়। স্থানীয় অফিসে যোগাযোগের মাধ্যমে ঐসব সেবা প্রদান-পাওয়া নিশ্চিত করা।

ইনস্টিটিউট এর মাধ্যমে সেবা

যদিও আজকাল অনেকেই আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কোন ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সেবা নিতে বা পেতে চান না তথাপি এই ধরনের ইনস্টিটিউটগুলো অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা প্রতিবন্ধি ব্যক্তিদের জন্য নিবিড় সেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ইনস্টিটিউটগুলো এইসব ব্যক্তিদের জীবন সহজ করার জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও উপযুক্ত বিনোদন সুবিধাসহ তাদের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

দিবা যত্ন কেন্দ্র

দিবা যত্ন কর্মসূচী ঐসব অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য যারা নিজেদের প্রয়োজনগুলো নিজেরা মেটাতে পারে না, যাদের নিবিড় যত্ন দরকার। এ কাজের জন্য নিবন্ধণকৃত নার্স, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, স্পীচ, অকুপেশনাল ও ফিজিও থেরাপিস্ট নিয়োগ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে ব্যাপক সেবা কার্যক্রম হাতে নেয়া প্রয়োজন যেমন, তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানো, হাটাচলা করানো, স্বতন্ত্র বসবাস, শিক্ষা গ্রহন এবং নিজেকে পরিচালনা করার দক্ষতা উন্নয়ন। এইসব সেবা কার্যক্রমের আওতায় বিশেষায়িত সিনিয়র নাগরিক বা অটিজমে আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিদেরকেও অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে।

দিবা পূনর্বাসন

দিবা পূনর্বাসন কর্মসূচীর উদ্দেশ্য হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বতন্ত্র চলাফেরায় সক্ষমতা বাড়ানো, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো, সমন্বয় বাড়ানো। এই সেবা কার্যক্রম বাসাবাড়ি থেকে একটু দূরে সামাজিক কোন অবস্থানে যেমন পার্ক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি মুদি দোকানেও হতে পারে। এগুলো ব্যক্তি পর্যায় কিংবা গ্রুপেও দেয়া যেতে পারে। দিবা সেবা কেন্দ্র কোন স্থাপনা ছাড়াও হতে পারে। আবার ভবনকেন্দ্রিক সেবা হতে পারে সুনিয়ন্ত্রিত ও কাঠামোভিত্তিক। এই সেবার আওতায় ব্যক্তিগত পরিপাটি যেমন বাথরুম ব্যবহার, গোসল, শেভিং ইত্যাদি করানো-শেখানো, ঘরদোর গোছানো, খাবার তৈরী, টাকা-পয়সার হিসাব-নিকাশ, বাজার-সওদা করা, সামাজিক দক্ষতা, অবসর কাটানো, সড়ক নিরাপত্তা ইত্যাদি প্রাধান্য পায়। সেবা গ্রহিতারা পূর্ব নির্ধারিত যেকোন স্থানে মিলিত হতে পারে।

বৃত্তিমূলক সেবা

পরামর্শ, মূল্যায়ন, পেশা নির্বাচন, পুনঃনবায়নকৃত সেবা, চাকরীর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দূর, কাজের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা অর্জন, সঠিক চাকরীতে নিয়োগ, নিয়োগ পরবর্তি মূল্যায়ন ইত্যাদি বৃত্তিমূলক সেবা আওতায় পড়ে।

দিবা প্রশিক্ষণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচী

দিবা প্রশিক্ষণ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচীর আওতায় অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আচরনের ইতিবাচক পরিবর্তনমূলক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে। যাতে তারা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, শিক্ষাগত ও বৃত্তিপূর্ব কর্মসূচীতে সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারে।

দিবা প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে ‘কাজ’ বলতে ঐসব উৎপাদনমূলক কাজ বোঝায় যাতে কিছু অর্থ আয় হয় আবার আনন্দ লাভ করাও যায়। এতে প্রতি ১০ জনের বিপরীতে একজন দক্ষ কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। যাতে আক্রান্ত ব্যক্তি যারা কর্মী হিসাবে কাজ করছে তাদের ব্যক্তিগত পরিপাটি থেকে শুরু করে আচরন নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত সহজ হয়।

অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মসূচীতে কর্মবান্ধব পরিবেশে এমন সব উৎপাদনমূলক কাজের ব্যবস্থা থাকে যাতে কাজের বিনিময়ে অল্প হলেও বেতন/ভাতার ব্যবস্থা থাকে। এতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু উদ্দেশ্য থাকে যা কি না অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবন-যাপনে সহায়ক ও উৎপাদনমুখি দক্ষতার উৎকর্ষ সাধিত হয়।

দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের মধ্যে আছে অটোমোবাইল প্রশিক্ষণ, দারোয়ান, আয়া, খাবার পরিবেশনকারী, কারনীক ইত্যাদি বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি রক্ষনাবেক্ষনকারী ও ব্যবহার ইত্যাদি। সেই সাথে সাথে অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, কাজের ধরন ও চাহিদার সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।

সহযোগীতামূলক কর্মসংস্থান

এই কর্মসূচীর আওতায় অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরকে অন্যান্য প্রতিযোগীতামূলক চাকরীতে যোগদানের পূর্বে বা পরে ঐ চাকরীতে টিকে থাকার যোগ্য করে গড়ে তোলা হয়। পূর্নকালীন বা খন্ডকালীন হিসাবে (সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫ ঘন্টা) তাদের অন্যান্য সুস্থ-স্বাভাবিক সহকর্মীদের সাথে কাজে জড়িত রাখা হয় যাতে তারা নিয়মিত চাকরীতে গিয়ে সমস্যায় না পড়ে।

 

অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তির সঠিক পরিচর্যা ও তার পরিবারকে মানসিক যন্ত্রণামুক্ত রাখতে সর্বপরি অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি সুন্দর, সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য সহযোগীতার কোন বিকল্প নেই। এই বিষয়গুলি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সকল পর্যায়েই গুরুত্বের দাবী রাখে।

0 comment

No Comments has been posted yet.

Leave a comment