সামাজিক রীতিনীতি, কিভাবে আচরন করতে হবে বা কী করতে হবে-এগুলো জানা এবং বোঝাটা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা পিছিয়ে পড়া শিশুদের (Children with Special Needs) ক্ষেত্রে অতটা সহজ নয়। এক্ষেত্রে এসব শিশুদের বাবা-মাদের দায়িত্বপূর্ন আচরনই পারে এদেরকে সামাজিক করে তুলতে। এখানে এরকম ১২টি কাজের কথা উল্লেখ করা হল যা এসব শিশুদের সামাজিক দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা করবে।

চোখে চোখ রেখে যোগাযোগ বা আই কনটাক্ট পর্ব
ভালভাবে আর সোজাসুজি চোখে চোখ রেখে কথা বলাতে একে অপরের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। সেই সাথে উভয়ের প্রতি উভয়ের আস্থা বাড়ে। ফলে একজন অন্যজনের কথা মনযোগ সহকারে শোনে। তাইঃ
১। চোখ বড় বড় করে তাকানো
দ্রুততম সময়ে আপনার বাচ্চার মনযোগ আকর্ষন কিংবা তাকে আপনার দিকে ফেরাতে বা আপনার কথা শোনাতে তার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকান। তবে অবশ্যই সে চাহনিতে যেন ভয়ের ছাপ না থাকে।
২। চোখ কপালে তুলে তাকানো
সাধারন ক্ষেত্রে চোখ কপালে তোলা বিস্ময়সূচক হলেও এখানে পজিটিভ অর্থে অর্থাৎ আপনার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর দৃষ্টি কোন একটি নির্দিষ্ট দিকে ফেরাতে বা দেখাতে চোখ দিয়ে ইশারা করাকে বুঝায়। যেমন উপরে রক্ষিত কোন স্টিকারের দিকে তাকাতে তাকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে চোখ উপরে তুলে তাকে সেটা দেখিয়ে দেয়া। এটার মানে এই নয় যে আপনার চোখে তাকানো, বরং এটা অনেকটা মজা আর ভয় নয় এমনভাবে সঠিক জিনিসের প্রতি বা সঠিক দিকে তাকানোর প্রশিক্ষনও বটে।
৩। চোখ ঘোরানো
খেলার ছলে চোখে চোখ রেখে চোখ ঘুরিয়ে কাছে ডাকা বা নিজের পায়ে হেঁটে কাছে আসতে বলা। এতে তার সেন্সরি ইনপুট তাকে আপনার প্রতি আরো মনযোগী হতে উৎসাহী করবে। চোখে চোখ রেখে তার এই ব্যাপারটা বোঝার বা বুঝে নেয়ার জন্য প্রশংসা করা যেতে পারে।

ইডিয়ম বা বিশেষ অর্থবোধক শব্দ বোঝার পর্ব
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের বেলায় ইডিয়ম অনেক সময় খুবই কনফিউজিং হতে পারে। অটিজম স্পেকট্রাম ডিজ অর্ডারে আক্রান্ত শিশুরা এধরনের শব্দে আরো বেশি খেপাটে হয়ে উঠতে পারে।
৪। ইডিয়ম সম্পর্কিত বই
ইডিয়ম সম্পর্কিত অনেক ভাল ভাল বই পাওয়া যায় যাতে সেগুলোর চিত্রসহ ব্যাখ্যা দেয়া থাকে। এতে অনেক সময় ইডিয়মের কাব্যিক কিংবা সাহিত্যিক ব্যাখ্যা দেয়া থাকে সাথে ঐগুলোর উৎপত্তি ও ইতিহাস বিবৃত থাকে।
৫। অন-লাইন
আজকাল অনেক ওয়েবসাইটে ইডিয়মের লিস্ট পাওয়া যায় এবং এগুলো বোঝার জন্য থাকে মজার মজার গেইম।
৬। ম্যাচিং গেইম
একসেট কার্ড নিন, তাতে ইডিয়ম লিখুন। আরেক সেট নিন, তাতে আগের কার্ডে লিখিত ইডিয়মগুলোর অর্থ লিখুন। এবার আপনার বাচ্চাকে এলোমেলো করা কার্ডগুলো দিয়ে জোড়া মিলাতে বলুন। ইচ্ছে করলে আপনি অর্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ন ছবি বা কার্টুন ব্যবহার করতে পারেন, যাতে সে বাস্তবতার ছোঁয়া পেতে পারে।

পড়ার পর্ব (আবেগ/অনুভূতির ব্যাখ্যা)
এই পর্বটি সর্বত্র খুবই গুরুত্বপূর্ন বিশেষ করে বাড়িতে, স্কুলে কিংবা খেলার মাঠে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুরা অন্যের আবেগ/অনুভূতি সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। ফলে সৃষ্টি হয় ভুল বুঝাবুঝি। অনেকসময় অর্থ গুলিয়ে ফেলে বিভ্রান্ত হয়। চাহনি বা ইশারা কিংবা বিশেষ শব্দের অর্থ সঠিকভাবে না বুঝে বা ভুল বুঝে হতাশ হয়, মনে করে কেউ হয়তো তার প্রতি রেগে আছে কিংবা তাকে ভয় দেখাচ্ছে ইত্যাদি। আবার অনেক সময় মজার কোন জিনিসেও সে বিচলিত হয়ে পড়তে পারে, না বোঝার কারনে।
৭। ইঙ্গিতবাহী অভিনয় (আবেগ নিয়ে)
এরুপ ক্ষেত্রে কোন বিশেষ প্রানী, মজার মজার সিনেমার নাম কিংবা প্রচলিত কিছু শব্দ ব্যবহার না করে আবেগ দিয়ে অভিনয় করে তার অর্থটা এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা যাতে সে সহজেই সঠিক অর্থ বা ব্যাপারটা বুঝে নিতে পারে। কিংবা তাকে লিখিত শব্দ বা শব্দমালা অনুযায়ী অভিনয় করে দেখাতে বলা। আবার অন্যভাবেও এটা করা যেতে পারে যেমন কয়েক টুকরা কাগজে আপনি যা ভাবছেন বা অনুভুতি প্রকাশক শব্দগুলো লিখে বা প্রিন্ট করে সেগুলোকে স্লিপের মত করে রাখুন। এরপর স্লিপগুলোর মধ্যে থেকে যেকোনটি তুলে নিয়ে লিখিত শব্দ অনুযায়ী অভিনয় করে দেখাতে পারেন, তাকে ঐ অনুযায়ী অভিনয় করতে বলতে পারেন। এছাড়া বিকল্প হিসাবে ইমোশনের ছবি সম্বলিত কাগজ ব্যবহার করতে পারেন। এধরনের খেলাকে একটু কঠিন করার জন্য ইচ্ছে করলে আপনি কিছু নিয়ম বেঁধে দিতে পারেন। যেমন সময় নির্দিষ্ট করে দেয়া, চেহারা ব্যবহার না করে অন্যান্য বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করা কিংবা অবস্থাটা ফুটিয়ে তুলতে বলা যেমন কোন দুঃখ, রাগ, অভিমান কিংবা ঝমঝম বৃষ্টি বাইরে ছোটাছুটি ইত্যাদি।
৮। চেহারা নিয়ে খেলা (ফেইস গেইম)
বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধির আরেকটি উপায় হচ্ছে ফেইস গেইম। চেহারা নিয়ে এমন কিছু করা যা খুবই মজার। ঠিক অভিনয় ক্লাসের মত। যেমন জিহবা দিয়ে নাকের ডগা স্পর্শ করা, জিহবা বের করে নানান ভঙ্গি করা, চোখের পাতা উলটানোসহ নানা ভঙ্গি। এগুলোতে তারা যেমন আনন্দ পাবে তেমনি নিজেরাও অনুকরন করার চেষ্টা করবে। যেসব শিশুদের সামাজিক দক্ষতায় ঘাটতি আছে, তাদের ক্ষেত্রে এধরনের এক্টিভিটিজগুলো ঐ বিশেষ মূহুর্তে বা অবস্থায় তাকে নার্ভাস না করে বরং সহজ করে তুলবে।
৯। ম্যাচিং গেইম/বিংগো
এক্ষেত্রে আপনি বিঙ্গো বোর্ডে বিভিন্নধরনের ছবির খেলা দিতে পারেন। ছবিগুলো কেটে টুকরো টুকরো করে সেগুলো জোড়া দিতে বলা বা ম্যাচিং করতে বলা। আবার মেমরি কার্ড গেইমও খেলাতে পারেন।

আলোচনার বিষয় হুট করে পরিবর্তন না করা
যখন মানুষ কথা বলে, তখন নিশ্চয়ই কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করে যতক্ষন না বিষয়টি নিয়ে কোন ঐক্যমত তৈরী হয় বা আলোচনাটা শেষ হয়। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের বেলায় আলোচ্য বিষয়ে স্থির থাকা বা শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। বিষয়ের উপরে থাকা বা আলোচনা চালিয়ে নেয়ার দক্ষতা উন্নয়নে কিছু বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
১০। বিষয়ভিত্তিক গেইম
যেমন বর্ন নিয়ে কিছু খেলা আছে যাতে শব্দের প্রথম অক্ষর সবসময়ে কোন নির্দিষ্ট অর্থবোধক হয়। হতে পারে সেটা প্রানি বিষয়ক, ফল কিংবা সবজী বিষয়ে। ধরুন A … Apple, B … Banana, C … Carrot ইত্যাদি।
১১। কথোপকথনের স্তর বা পর্যায়
এটা আসলে একধরনের লার্নিং টুল যা অটিজমে আক্রান্ত বাচ্চা, যারা নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থাকতে পছন্দ করে-এদের পারস্পরিক কথোপকথনকে বুঝতে সহায়তা করে।
১২। উপস্থিত গল্প বলা
এধরনের গেইম খেলার জন্য পৃথক পৃথক ইমোশনের ছবি সম্বলিত কার্ড বা কাগজ টেবিলে উপর সাজিয়ে রাখুন। এরপর তাকে তার পছন্দ মত ছবি নিয়ে গল্প বলতে বলা যাতে ঐ চিত্রটি গল্পের মধ্যে আসে। যেমন একটি শেয়াল, একটি কাক, এক টুকরো মাংস। লক্ষ্য হচ্ছে বাচ্চাদের মাঝে বিস্তৃত করে বর্ননা করার দক্ষতা বাড়ানো, একে অপরের আইডিয়া এক পয়েন্টে বা একত্রিত করা। এরুপ ক্ষেত্রে যেকোন বক্তা তার গল্প যেকোন দিকে ঘোরাতে পারে। এতে সময় বেঁধে দেয়া যেতে পারে যেমন এক বা দুই মিনিট হয়ে গেলে অন্যজন আগের জনের যেখানে শেষ ছিল সেখান থেকে শুরু করবে। এইভাবে যতক্ষন ঐ গল্পে সব ছবিগুলো ব্যবহৃত না হয় এবং একটা সন্তোষজনক উপসংহারে না পৌঁছে, ততক্ষন গল্পটি চলতে থাকবে।

1 comments